Kisan Credit Card Scheme India | কৃষকদের আর্থিক শক্তি বাড়াতে ‘কিষাণ ক্রেডিট কার্ড’ বিপ্লব, ৭.৭২ কোটির বেশি কৃষক পাচ্ছেন সস্তা ঋণ, কৃষি উন্নয়নে বড় ভরসা KCC

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ★ নতুন দিল্লি : ভারতের কৃষি অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এবং কৃষকদের সহজে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দিতে ‘কিষাণ ক্রেডিট কার্ড (Kisan Credit Card বা KCC)’ প্রকল্প এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে উঠে এসেছে। কৃষকদের দ্রুত ও সুলভ ঋণ পাওয়ার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে মজবুত করার ক্ষেত্রেও এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশজুড়ে ৭.৭২ কোটিরও বেশি কিষাণ ক্রেডিট কার্ড সক্রিয় রয়েছে এবং এর আওতায় মোট প্রায় ১০.২ লক্ষ কোটি টাকার ঋণ বকেয়া রয়েছে। ভারতের অর্থনীতিতে কৃষি খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৬.১ শতাংশ মানুষ জীবিকার জন্য কৃষি এবং কৃষি-সংক্রান্ত কার্যকলাপের উপর নির্ভরশীল। ফলে কৃষকদের আর্থিক নিরাপত্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সহজ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সরকারগুলির অন্যতম প্রধান নীতিগত লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। এই লক্ষ্য পূরণের জন্যই ১৯৯৮ সালে চালু হয় ‘কিষাণ ক্রেডিট কার্ড (Kisan Credit Card বা KCC)’ প্রকল্প। এর উদ্দেশ্য ছিল কৃষকদের দ্রুত ও সহজভাবে স্বল্পমেয়াদি কৃষি ঋণ প্রদান করা, যাতে তারা ফসল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে পারেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রকল্পের পরিধি বাড়ানো হয়েছে এবং বর্তমানে এটি কৃষি ছাড়াও বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী উল্লেখ, কিষাণ ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা শুধু ফসল চাষের জন্য নয়, বরং ফসল কাটার পরবর্তী কাজ, বিপণন খরচ, কৃষি যন্ত্রপাতি কেনা, খামারের রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য কৃষি-সংক্রান্ত বিনিয়োগের জন্যও ঋণ পেতে পারেন। পাশাপাশি দুগ্ধচাষ, মৎস্যচাষ, হাঁস-মুরগি পালন এবং মৌমাছি চাষের মতো সংশ্লিষ্ট কার্যকলাপের ক্ষেত্রেও এই ঋণ ব্যবহার করা যায়। কৃষকদের সুলভ সুদে ঋণ দেওয়ার জন্য ২০০৬-০৭ সালে চালু করা হয় ‘মডিফায়েড ইন্টারেস্ট সাবভেনশন স্কিম (Modified Interest Subvention Scheme বা MISS)’। এই প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকরা কম সুদের হারে ঋণ পাওয়ার সুযোগ পান। বর্তমানে তিন লক্ষ টাকা পর্যন্ত স্বল্পমেয়াদী কৃষি ঋণের সুদের হার নির্ধারিত হয়েছে ৭ শতাংশ। তবে সময়মতো ঋণ পরিশোধ করলে অতিরিক্ত ৩ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়, ফলে কার্যত সুদের হার নেমে আসে মাত্র ৪ শতাংশে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সরকার কিষাণ ক্রেডিট কার্ড প্রকল্পকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলেছে। ২০২০ সালে সংশোধিত KCC স্কিম চালু করা হয়, যার মাধ্যমে কৃষকদের জন্য একটি একক প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আরও পড়ুন : MSP procurement Telangana | তেলেঙ্গানার কৃষকদের জন্য বড় সুখবর, এমএসপি-তে ৮৯৪ কোটি টাকার ফসল কেনার অনুমোদন দিল কেন্দ্র, ঘোষণা শিবরাজ সিং চৌহানের

এই নতুন ব্যবস্থায় কৃষকদের একটি ‘রুপে-সক্ষম কার্ড (RuPay Enabled Card)’ দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে কৃষকরা সহজে টাকা তুলতে পারেন, ডিজিটাল লেনদেন করতে পারেন এবং বিভিন্ন আর্থিক পরিষেবা ব্যবহার করতে পারেন। এতে ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়েছে। কৃষকদের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও এই প্রকল্প বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে। শুধু জমির মালিক কৃষকই নয়, বরং ভাড়াটে কৃষক, মৌখিক চুক্তির চাষি এবং বর্গাদাররাও এই প্রকল্পের সুবিধা পেতে পারেন। এছাড়া ‘স্বয়ং সহায়তা গোষ্ঠী (Self Help Group বা SHG)’ এবং ‘যৌথ দায়বদ্ধতা গোষ্ঠী (Joint Liability Group বা JLG)’ -এর মাধ্যমেও কৃষকরা এই প্রকল্পের আওতায় ঋণ পেতে পারেন। কৃষকদের আবেদন প্রক্রিয়াকে সহজ করতে সরকার একটি সরল একপাতার আবেদনপত্র চালু করেছে। এই আবেদনপত্রে অনেক তথ্য আগে থেকেই ‘প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি (PM-KISAN)’ প্রকল্পের রেকর্ড থেকে পূরণ করা থাকে। ফলে কৃষকদের আলাদা করে অনেক তথ্য দিতে হয় না। এছাড়াও আবেদনপত্র জাতীয় সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচার করা হয়েছে এবং বিভিন্ন সরকারি ওয়েবসাইটে ডাউনলোডের জন্য উপলব্ধ রাখা হয়েছে। ‘কমন সার্ভিস সেন্টারগুলি (Common Service Centre বা CSC)’ কৃষকদের আবেদন পূরণ এবং ব্যাঙ্কে ডিজিটালভাবে পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কৃষি ঋণ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চালু করা হয়েছে ‘কিষাণ ঋণ পোর্টাল (Kisan Rin Portal বা KRP)’। এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কৃষকদের প্রোফাইল, ঋণ বিতরণ তথ্য, সুদ ভর্তুকি এবং বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি একত্রে পর্যবেক্ষণ করা যায়।

এই পোর্টাল ব্যাংকগুলির কাজকেও সহজ করেছে। ব্যাংকগুলি এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুদ ভর্তুকি এবং দ্রুত ঋণ পরিশোধ প্রণোদনার দাবি জমা দিতে পারে। এর ফলে ঋণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা অনেক বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে সরকার কিষাণ ক্রেডিট কার্ডের ঋণ সীমাও বাড়িয়েছে। ‘মডিফায়েড ইন্টারেস্ট সাবভেনশন স্কিম (MISS)’ -এর অধীনে ফসল ঋণের সীমা তিন লক্ষ টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ লক্ষ টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি মৎস্যচাষ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কার্যকলাপের জন্যও ঋণের সীমা দুই লক্ষ টাকা থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা করা হয়েছে। এছাড়াও ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে জামানত ছাড়াই ঋণ পাওয়ার সীমা ১.৬ লক্ষ টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই লক্ষ টাকা করা হয়েছে। এতে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা বেশি সুবিধা পাবেন।

সরকারি সূত্রে উল্লেখ, বর্তমানে এই প্রকল্পে মোট ৪৫৭টি ব্যাংক যুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংক, ৪৬টি আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাংক এবং ৩৭৪টি সমবায় ব্যাংক রয়েছে। এই বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকদের কাছে সহজে ঋণ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিষাণ ক্রেডিট কার্ড প্রকল্প কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কারণ সহজ ঋণ পাওয়ার ফলে কৃষকরা উন্নত বীজ, সার এবং আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ করতে পারছেন। এতে কৃষি উৎপাদন এবং কৃষকদের আয় দুটোই বাড়ছে। সরকারি তথ্য বলছে, ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরাই এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। মোট কৃষি ঋণ অ্যাকাউন্টের প্রায় ৭৬ শতাংশই এই শ্রেণির কৃষকদের। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বাজারের অনিশ্চয়তার সময়ে কৃষকদের আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কিষাণ ক্রেডিট কার্ড প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভবিষ্যতেও এই প্রকল্পের সম্প্রসারণ ভারতের কৃষি উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Gujarat dairy sector development, Amul cooperative success | গুজরাটের দুগ্ধ বিপ্লব: প্রতিটি ফোঁটা দুধে বদলাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি, সমৃদ্ধির পথে পশুপালক সমাজ

Sasraya News
Author: Sasraya News