Kolkata New Market hotel fire | Bangladeshi journalist killed in Kolkata hotel fire : শিশুপুত্র ও শ্বশুরের চিকিৎসা করাতে কলকাতায়, নিউ মার্কেটের আগুনে সপরিবারে মৃত্যু বাংলাদেশের সাংবাদিকের

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা ১৯ আগস্ট : চিকিৎসার জন্য ভারত সফর। বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসা করিয়ে কলকাতায় ফিরে পরিবারের সঙ্গে দেশে ফেরার প্রস্তুতি। কিন্তু সেই ফেরাই আর হল না। নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে (Kolkata New Market hotel) সপরিবারে প্রাণ হারালেন বাংলাদেশের সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত। তাঁর সঙ্গে মৃত্যু হয়েছে স্ত্রী আফসানা শারমীন, তিন বছরের শিশুপুত্র শর্ণশীষ দত্ত এবং শ্বশুর মহম্মদ আকরামের। একই ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ঢাকার সাভারের বাসিন্দা বাবু আহমেদও। এখনও পর্যন্ত এই অগ্নিকাণ্ডে মৃত ন’জনের মধ্যে ছ’জনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। দেবাশীষ দত্ত বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার বাসিন্দা। পেশায় সাংবাদিক তিনি বাংলাদেশের সংবাদপত্র ‘আজকের পত্রিকা’-র কুষ্টিয়া জেলা সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করতেন। কাজের সূত্রে সংবাদ সংগ্রহ, জেলার বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন লেখা এবং সাধারণ মানুষের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরাই ছিল তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অংশ। কিন্তু কলকাতায় একটি পারিবারিক চিকিৎসা সফর তাঁর ও তাঁর পরিবারের জীবনের শেষ পর্ব হয়ে দাঁড়াবে, তা কেউ ভাবতে পারেননি। পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্য গত ৩ আগস্ট ভারতে এসেছিলেন দেবাশীষ। তাঁর তিন বছরের পুত্র শর্ণশীষ এবং শ্বশুর মহম্মদ আকরামের চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল। সেই কারণে প্রথমে তাঁরা বেঙ্গালুরু যান। সেখানে একটি হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর পর ১৮ আগস্ট বিমানে কলকাতায় ফেরেন তাঁরা। পরিকল্পনা ছিল, কলকাতা থেকে বাংলাদেশে ফিরে যাবেন। কিন্তু দেশে ফেরার আগেই নিউ মার্কেটের একটি হোটেলে আগুনের মধ্যে আটকে পড়ে গোটা পরিবার।

আরও পড়ুন : India paddy cultivation 2026, paddy cultivation area decline, ভারতে ধান চাষের জমি কমেছে ৩.৬৫ শতাংশ : তিন রাজ্যে বৃষ্টির ঘাটতিতে ধান চাষে বড় ধাক্কা

মঙ্গলবার গভীর রাতে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে আগুন লাগে। ওই ভবনে একটি মাত্র হোটেল ছিল না। একই বহুতলে আরও কয়েকটি হোটেল চলত বলে জানা গিয়েছে। আগুন লাগার পর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ধোঁয়া। একাধিক হোটেলের ঘরেও ধোঁয়া ঢুকে যায়। রাতের সময়ে অধিকাংশ আবাসিক ঘুমিয়ে থাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে একের পর এক মানুষের মৃত্যু হয়। দেবাশীষদের পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশে থাকায় প্রথম দিকে তাঁদের কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। অগ্নিকাণ্ডের খবর পৌঁছনোর পর থেকেই কুষ্টিয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়। পরিবারের লোকজন কলকাতায় থাকা আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত বুধবার দুপুরের দিকে তাঁদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়।

দেবাশীষের এক সহকর্মী তামিম আদনান জানিয়েছেন, তাঁর আরও একটি আট বছরের কন্যাসন্তান রয়েছে। বাংলাদেশে দেবাশীষের বাবা-মাও জীবিত। অগ্নিকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁরাও ছেলের পরিবারের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। বহুক্ষণ ধরে খোঁজখবর চলছিল। পরে দুপুর আড়াইটে নাগাদ কলকাতা থেকে বাংলাদেশের একটি সূত্রের মাধ্যমে তাঁরা নিশ্চিত হন যে, দেবাশীষ, তাঁর স্ত্রী, শিশুপুত্র ও শ্বশুর আর বেঁচে নেই। উল্লেখ্য যে, একজন সাংবাদিকের এভাবে পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে প্রাণ হারানোর ঘটনায় কুষ্টিয়ায়ও শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। সহকর্মীদের কাছে দেবাশীষ শুধু সংবাদকর্মী ছিলেন না, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের পরিচিত মুখও ছিলেন। কর্মজীবনে জেলার বিভিন্ন ঘটনা পাঠকদের সামনে তিনি তুলে ধরেছেন। চিকিৎসার জন্য ভারতে আসা ও ফেরার পথে কলকাতায় হোটেলে ওঠার সিদ্ধান্তই যে এমন পরিণতি ডেকে আনবে, তা ভাবতে পারছেন না তাঁর সহকর্মীরা।

দেবাশীষের পরিবারের দেহ শনাক্তকরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন তাঁর আত্মীয় কৃষ্ণ নন্দী। মালদহের বাসিন্দা কৃষ্ণ ঘটনাচক্রে বুধবার ব্যবসার কাজে কলকাতায় ছিলেন। বাংলাদেশ ডেপুটি হাই কমিশনের (Bangladesh Deputy High Commission) তরফে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিউ মার্কেট থানায় যান। পরে কলকাতা পুলিশের মর্গে গিয়ে তিনি মৃতদেহ শনাক্ত করেন। পরিবারের হয়ে এই কঠিন দায়িত্ব তাঁকেই পালন করতে হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের পর বাংলাদেশ ডেপুটি হাই কমিশনের প্রতিনিধিরাও সক্রিয় হয়েছেন। তাঁদের প্রতিনিধিরা নিউ মার্কেট থানা ও কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছেন বলে সূত্রের খবর। বাংলাদেশি নাগরিকদের শনাক্তকরণ, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ও পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।

এই ঘটনায় বাংলাদেশের আরও এক নাগরিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। তিনি ঢাকার সাভারের বাসিন্দা বাবু আহমেদ। তাঁকেও শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। ফলে এখনও পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া ছ’জন মৃতের মধ্যে পাঁচ জনই বাংলাদেশের নাগরিক। বাকি তিন জনের পরিচয় জানার জন্য শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া চলছে। নিউ মার্কেটের এই অগ্নিকাণ্ডে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ধোঁয়া। আগুন যেখানে লেগেছিল, তার পাশাপাশি লাগোয়া হোটেলগুলিতেও ধোঁয়া ঢুকে পড়ে। ফলে প্রত্যেক আবাসিকের পক্ষে দ্রুত নিরাপদ জায়গায় পৌঁছনো সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে রাতের সময়ে ঘরের ভিতর আটকে থাকা মানুষের কাছে ধোঁয়া দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। দমকলকর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আটকে পড়া আবাসিকদের উদ্ধারে অভিযান চালান।

এই ঘটনার পর কলকাতার হোটেলগুলির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ঘনবসতিপূর্ণ নিউ মার্কেট এলাকার পুরনো ভবনগুলিতে একাধিক হোটেল পরিচালিত হলে জরুরি পরিস্থিতিতে আবাসিকদের বেরোনোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন পথ এবং ভবনের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে প্রশাসনিক পর্যায়ে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে। দেবাশীষদের পরিবারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হল, তাঁরা কলকাতায় এসেছিলেন চিকিৎসার জন্য। তিন বছরের শিশুকে নিয়ে এক শহর থেকে অন্য শহরে ছুটে বেড়ানো পরিবারের কাছে গন্তব্য হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশ। বেঙ্গালুরুর চিকিৎসা পর্ব শেষ করে কলকাতায় ফিরে তাঁরা দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু যাত্রার শেষ ধাপেই ঘটে যায় বিপর্যয়। বাংলাদেশে এখন দেবাশীষের আট বছরের কন্যাসন্তান আর তাঁর বাবা-মা অপেক্ষা করছেন পরিবারের সদস্যদের শেষবার দেখার জন্য। একমাত্র কন্যার কাছে তাঁর বাবা আর ফিরবেন না। যে শিশুটির চিকিৎসার জন্য বাবা বিদেশে এসেছিলেন, সেই শিশুটিও আগুনের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে। পরিবারের কাছে এই ক্ষতি তাই শুধু চারটি প্রাণ হারানোর ঘটনা নয়, একটি পরিবারের ভবিষ্যৎই যেন এক রাতের অগ্নিকাণ্ডে থেমে গেল।

নিউ মার্কেটের এই অগ্নিকাণ্ডে মৃতের সংখ্যা ও পরিচয় নিয়ে এখনও কাজ চলছে। ইতিমধ্যে ন’জনের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে। তাঁদের মধ্যে ছ’জনকে শনাক্ত করা গেলেও আরও তিন জনের পরিচয় নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া চলছে। অগ্নিকাণ্ডের কারণ, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং ভবনের পরিস্থিতি নিয়েও তদন্ত চলছে। উল্লেখ্য, চিকিৎসার প্রয়োজনে কলকাতায় আসা দেবাশীষ দত্তের পরিবারের শেষ যাত্রা যে এ শহরের একটি হোটেলের অগ্নিকাণ্ডে শেষ হবে, তা তাঁদের স্বজনদের কাছে এখনও বিশ্বাস করা কঠিন। কুষ্টিয়ার সাংবাদিক হিসেবে যিনি মানুষের খবর লিখতেন, শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের মৃত্যুর খবরই এখন সহকর্মী ও স্বজনদের কাছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক সংবাদ হয়ে ফিরে এসেছে।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee, Shyambazar Protest | হালিশহরের পর খাস কলকাতায় মমতাকে ঘিরে ‘চোর চোর’ স্লোগান! শ্যামবাজারে ফের উত্তপ্ত রাজনীতি, নেতাজীকে নিয়েও নতুন বিতর্ক

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন