Kolkata hotel fire 2026, New Market hotel fire : জানলা পেরিয়ে তিনতলার কার্নিসে, মোবাইলের আলোয় প্রাণভিক্ষা! হোটেলের ১০ আবাসিকের মধ্যে ৮ জনের মৃত্যু, বেঁচে ফিরলেন বাংলাদেশি দম্পতি

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা ১৯ আগস্ট : গভীর রাতে হঠাৎ দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কা। ঘুম ভেঙে দরজা খুলতেই চোখে-মুখে ধোঁয়া। বারান্দা দিয়ে বেরোনোর উপায় নেই। চার দিকে আগুন আর ধোঁয়ার আতঙ্ক। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল বাংলাদেশি দম্পতি সোমাইয়া আখতার ও রেজাউল ইসলামকে। দরজা দিয়ে বেরোনোর চেষ্টা না করে জানলা দিয়ে নেমে তিনতলার কার্নিসে তাঁরা আশ্রয় নেন। প্রায় আধ ঘণ্টা সেই সরু কার্নিসে দাঁড়িয়ে মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে নিচের পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত মই নিয়ে পৌঁছে দমকলকর্মীরা উদ্ধার করেন দু’জনকে। আর তাঁদের ঘিরে থাকা হোটেলের অন্য আবাসিকদের মধ্যে আট জনই প্রাণ হারিয়েছেন। কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ নামে একটি হোটেলের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এই বেঁচে ফেরার ঘটনা সামনে এসেছে।

আরও পড়ুন : Rishabh Pant 100 Sixes, Rishabh Pant Test Record | পন্থের বিশ্বরেকর্ড! টেস্টে দ্রুততম ১০০ ছক্কা, গিলক্রিস্ট-স্টোকসদের পিছনে ফেললেন ভারতীয় তারকা

সপ্তাহখানেক আগে বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় এসেছিলেন সোমাইয়া ও তাঁর স্বামী রেজাউল। শহরে ঘোরাঘুরি করার পর দু’দিন আগে নিউ মার্কেট সংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই হোটেলে তাঁরা ঘর নেন। মঙ্গলবার গভীর রাতে যখন অন্য আবাসিকেরা ঘুমিয়ে ছিলেন, তখনই বিপদ নেমে আসে। রাত প্রায় ১টা ৫০ মিনিট নাগাদ তাঁদের ঘরের দরজায় পরপর জোরে ধাক্কার শব্দে ঘুম ভাঙে রেজাউলের। সোমাইয়া তখন জেগেই ছিলেন। দরজা খুলে তাঁরা যা দেখেন, তাতেই বুঝে যান পরিস্থিতি ভয়াবহ। সোমাইয়ার কথায়, ‘দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা হচ্ছিল। ধাক্কার শব্দে আমার স্বামীর ঘুম ভেঙে যায়। দু’জনে উঠে দরজা খুলতেই দেখি বারান্দা ধোঁয়ায় ভরে গিয়েছে।’ সেই মুহূর্তে বাইরে বেরোনোর রাস্তাও প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আগুনের সঙ্গে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল ধোঁয়া। এমন পরিস্থিতিতে ঘর থেকে বেরোনোর চেষ্টা করলে তাঁদেরও বিপদ হতে পারত। রেজাউল তখন স্ত্রীকে নিয়ে দ্রুত অন্য পথ খোঁজেন। আতঙ্কের মধ্যেও দরজা দিয়ে বেরোনোর বদলে তিনি জানলা ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন। জানলা খুলে দু’জনে কোনও রকমে বাইরে বেরিয়ে তিনতলার কার্নিসে নেমে পড়েন। নিচে তখন রাতের কলকাতা। উপরে আগুন ও ধোঁয়া। মাঝখানে মাত্র কয়েক ইঞ্চি বা সামান্য বেশি জায়গার সেই কার্নিসই হয়ে ওঠে তাঁদের আশ্রয়।

কার্নিসে দাঁড়িয়েই সোমাইয়া সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে থাকেন। তাঁর কথায়, ‘হেল্প, হেল্প, আগুন, আগুন’ বলে তাঁরা নিচের লোকজনকে ডাকছিলেন। কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। তিনতলার কার্নিস থেকে রাস্তার দিকে তাকালে সবটা ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিল না। আবার নীচ দিয়ে যাঁরা যাচ্ছিলেন, তাঁরাও উপর দিকে তাকিয়ে সহজে বুঝতে পারছিলেন না যে, আগুনের মধ্যে কোনও মানুষ কার্নিসে আটকে রয়েছেন। তখনই বাঁচার আর একটি চেষ্টা করেন দম্পতি। মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে নিচের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকেন তাঁরা। অন্ধকার রাতের মধ্যে ছোট্ট মোবাইলের আলোই তাঁদের কাছে হয়ে ওঠে উদ্ধারের আশার সংকেত। পথচারীদের উদ্দেশে চিৎকার করে বিপদের কথা জানাতে থাকেন সোমাইয়া ও রেজাউল। প্রায় আধ ঘণ্টা সেই অবস্থায় কার্নিসে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তাঁদের।

অবশেষে দমকলের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। আগুন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শুরু হয় উদ্ধারকাজ। তিনতলার কার্নিসে আটকে থাকা দম্পতিকে দেখতে পেয়ে তাঁদের কাছে মই পৌঁছে দেওয়া হয়। মই বেয়ে নিরাপদে নীচে নামিয়ে আনা হয় সোমাইয়া ও রেজাউলকে। উদ্ধার হওয়ার পরও তাঁদের শরীরের আতঙ্ক কাটেনি। কয়েক ঘণ্টা পরেও বারবার ফিরে আসছিল সেই রাতের দৃশ্য, দরজা খুলতেই ধোঁয়া, বাইরে আগুন, জানলা দিয়ে বেরিয়ে কার্নিসে দাঁড়ানো এবং নিচে তাকিয়ে সাহায্যের অপেক্ষা। এই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ন’জন। তাঁদের মধ্যে আট জন বাংলাদেশের নাগরিক ও একজন ভারতীয় বলে উল্লেখ। মৃতদের মধ্যে মহিলা ও শিশুও রয়েছে। অধিকাংশের মৃত্যুর কারণ হিসেবে ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা উঠে এসেছে।

নিউ মার্কেট ও মির্জা গালিব স্ট্রিটের এই এলাকা কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক অঞ্চল। বহু বাংলাদেশি নাগরিক চিকিৎসা, ব্যবসা কিংবা পর্যটনের কাজে এই অঞ্চলে হোটেল ও অতিথিশালায় থাকেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় ওই ভবনের বিভিন্ন হোটেলেও বাংলাদেশ থেকে আসা একাধিক নাগরিক ছিলেন। ফলে ঘটনার পর বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল ভবনের গঠন আর বেরোনোর সীমিত সুযোগ নিয়ে ওঠা প্রশ্ন। একটি পাঁচতলা ভবনে একাধিক হোটেল চলছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আগুন লাগার পর ধোঁয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় আবাসিকদের বেরিয়ে আসতে সমস্যা হয়। উদ্ধারকারীদেরও কাজ করতে হয়েছে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে।

প্রাথমিক তদন্তে আগুন লাগার কারণ নিয়ে নানা সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শর্ট সার্কিটের সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। একই সঙ্গে ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা, বেরোনোর পথ, বায়ু চলাচল এবং অন্যান্য ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুনের সঠিক কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়। ঘটনার পর কলকাতার হোটেল ও অতিথিশালাগুলির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পুরনো ভবনের ভিতরে একাধিক আবাসিক হোটেল পরিচালনার ক্ষেত্রে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বেরোনোর ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অতীতে কলকাতার বিভিন্ন অগ্নিকাণ্ডের পরও অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। নিউ মার্কেটের এই ঘটনার পর সেই বিতর্ক ফের সামনে এসেছে।

এই ঘটনায় প্রশাসনের তরফে তদন্তের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘটনার পর পাঁচ সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট (SIT) গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন বলে উল্লেখ। আগুনের উৎস, উদ্ধারকাজ, ভবনের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও কোনও ধরনের গাফিলতি ছিল কি না সহ একাধিক বিষয় খতিয়ে দেখার কথা রয়েছে। তবে তদন্তের ফল সামনে আসার আগেই সোমাইয়া ও রেজাউলের বেঁচে ফেরার ঘটনাটি অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতার অন্য একটি ছবি তুলে ধরেছে। একই ভবনে থাকা দশ জন আবাসিকের মধ্যে তাঁদের দু’জনই বেঁচে ফিরেছেন একটি জানলা, একটি সরু কার্নিস ও মোবাইল ফোনের সামান্য আলোকে ভরসা করে। আগুনের সামনে কয়েক মিনিটের সিদ্ধান্ত যে কখনও কখনও জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করে দিতে পারে, নিউ মার্কেটের এই রাত তারই এক মর্মান্তিক উদাহরণ হয়ে রইল। সোমাইয়া ও রেজাউলের কাছে সেই রাত হয়ত আর কোনও দিনই সাধারণ রাত হয়ে ফিরবে না। দরজায় ধাক্কার শব্দ, ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়া বারান্দা, জানলা দিয়ে কার্নিসে নামা, অন্ধকারে মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে সাহায্যের আবেদন, প্রতিটি মুহূর্ত তাঁদের স্মৃতিতে থেকে যাবে। আর তাঁদের কয়েক হাত দূরেই যে আগুন এতগুলি প্রাণ কেড়ে নিল, সেই ঘটনার পর কলকাতার হোটেলগুলির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও এখন নতুন করে জবাবদিহির দাবি উঠছে।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India paddy cultivation 2026, paddy cultivation area decline, ভারতে ধান চাষের জমি কমেছে ৩.৬৫ শতাংশ : তিন রাজ্যে বৃষ্টির ঘাটতিতে ধান চাষে বড় ধাক্কা

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন