সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বর্ষার ছন্দে সামান্য পরিবর্তনই কৃষির চিত্রে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। চলতি খরিফ মরশুমে দেশের ধান চাষের জমির পরিমাণ গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গিয়েছে। কৃষি মন্ত্রকের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশে ধান চাষ হয়েছে ৩৭৯.০৭ লক্ষ হেক্টর জমিতে। গত বছর একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৩৯৩.৪৪ লক্ষ হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ধান চাষের আওতাধীন জমি কমেছে প্রায় ১৪.৩৭ লক্ষ হেক্টর। শতাংশের হিসাবে এই পতন ৩.৬৫।
খরিফ মরশুমে দেশের খাদ্যশস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে ধানের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। বর্ষার জলের উপর নির্ভরশীল বহু এলাকার কৃষকের কাছে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়টি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চলতি মরশুমে বেশ কিছু অঞ্চলে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়া এবং কোথাও কোথাও বৃষ্টির সময়সূচিতে পরিবর্তনের কারণে ধান রোপণের কাজ প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। বিশেষ করে কর্ণাটক, ঝাড়খণ্ড ও মহারাষ্ট্রে ধান চাষের জমি কমে যাওয়ার পরিমাণ কৃষি মহলে নজর কেড়েছে। কৃষি মন্ত্রকের পরিসংখ্যান বলছে, সবচেয়ে বেশি জমি কমেছে কর্ণাটকে। গত বছরের তুলনায় এ বছর সেখানে প্রায় ২.৮৬ লক্ষ হেক্টর কম জমিতে ধান চাষ হয়েছে। ঝাড়খণ্ডে কমেছে ২.২৬ লক্ষ হেক্টর ও মহারাষ্ট্রে ২.২৫ লক্ষ হেক্টর। অর্থাৎ শুধুমাত্র এই তিন রাজ্যেই ধান চাষের জমি কমেছে ৭ লক্ষ হেক্টরের বেশি। এর পাশাপাশি ওড়িশায় প্রায় ২.০৯ লক্ষ হেক্টর, মধ্যপ্রদেশে ১.৬৪ লক্ষ হেক্টর, তেলঙ্গানায় ১.৪৯ লক্ষ হেক্টর এবং অন্ধ্রপ্রদেশে ১.১৪ লক্ষ হেক্টর জমিতে ধান চাষ কম হয়েছে।
ভারতের কৃষি অর্থনীতিতে বর্ষার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে এই পরিসংখ্যানে। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু সাধারণত জুন মাসে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় সক্রিয় হওয়ার পরে খরিফ ফসলের বপন ও রোপণের কাজ গতি পায়। ধানের ক্ষেত্রে জল এবং মাটির আর্দ্রতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বৃষ্টির ঘাটতির প্রভাব সরাসরি পড়ে চাষের সিদ্ধান্তে। কোনও এলাকায় সময়মতো জল না থাকলে কৃষক ধান রোপণ পিছিয়ে দিতে পারেন, আবার কোথাও বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকতে পারেন। তবে দেশের সব খরিফ ফসলের ছবি একই রকম নয়। ধানের তুলনায় ডালশস্যের চাষের পরিমাণ প্রায় গত বছরের কাছাকাছি রয়েছে। ১৪ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ডাল চাষ হয়েছে ১০৮.১৪ লক্ষ হেক্টর জমিতে। গত বছর একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ১০৮.৪৯ লক্ষ হেক্টর। অর্থাৎ ব্যবধান মাত্র ০.৩৫ লক্ষ হেক্টর। ফলে ডালশস্যের সামগ্রিক চাষে এখনও বড় পতনের ছবি নেই।
কিন্তু, ডালের বিভিন্ন প্রজাতির ক্ষেত্রে ওঠানামা রয়েছে। অড়হর ডালের চাষ গত বছরের ৪২.০১ লক্ষ হেক্টর থেকে কমে এ বছর হয়েছে ৪০.৩১ লক্ষ হেক্টর। মুগ ডালের ক্ষেত্রেও জমির পরিমাণ কমেছে। গত বছর ৩৩.৪২ লক্ষ হেক্টর জমিতে মুগ চাষ হয়েছিল। এ বছর সেই পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২.০৫ লক্ষ হেক্টরে। অন্য দিকে উড়দ ডালের চাষে বৃদ্ধি হয়েছে। গত বছরের ২০.৭৯ লক্ষ হেক্টরের তুলনায় এ বছর ২৩.৫২ লক্ষ হেক্টর জমিতে উড়দ চাষ হয়েছে। তৈলবীজের ক্ষেত্রেও এখনও বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। ১৪ আগস্ট পর্যন্ত দেশে তৈলবীজ চাষ হয়েছে ১৮৪.৪৬ লক্ষ হেক্টর জমিতে। গত বছর একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ১৮৫.৩৬ লক্ষ হেক্টর। অর্থাৎ ব্যবধান ১ লক্ষ হেক্টরেরও কম। ফলে ধানের তুলনায় তৈলবীজ চাষ আপাতত তুলনামূলক ভাবে স্থিতিশীল।
মোটা শস্যের চাষে অবশ্য কিছুটা পতন দেখা দিয়েছে। চলতি মরশুমে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১৭২.৯৬ লক্ষ হেক্টর জমিতে মোটা শস্য চাষ হয়েছে। গত বছর একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ১৭৭.১৩ লক্ষ হেক্টর। অর্থাৎ প্রায় ৪.১৭ লক্ষ হেক্টর জমি কমেছে। খরিফ মরশুমের সামগ্রিক কৃষিচিত্রে এই পতনও নজরে রাখার মতো। উল্লেখ্য, বাণিজ্যিক ফসলের ক্ষেত্রেও রয়েছে মিশ্র ছবি। আখ চাষের জমি গত বছরের ৫৮.৬২ লক্ষ হেক্টর থেকে সামান্য কমে এ বছর হয়েছে ৫৮.৩১ লক্ষ হেক্টর। তুলা চাষের ক্ষেত্রেও পতন হয়েছে। গত বছর ১০৮.২৬ লক্ষ হেক্টর জমিতে তুলা চাষ হয়েছিল। এ বছর তা কমে হয়েছে ১০৭.৩০ লক্ষ হেক্টর। তবে পাট ও মেস্তার ক্ষেত্রে সামান্য বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে। গত বছরের ৬.২৩ লক্ষ হেক্টরের তুলনায় এ বছর এই দুই ফসলের চাষ হয়েছে ৬.৩৪ লক্ষ হেক্টর জমিতে।
ধান চাষের জমি কমে যাওয়ার সঙ্গে আবহাওয়ার যোগসূত্রও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ১২ অগস্ট পর্যন্ত দেশে মৌসুমি বৃষ্টির ঘাটতি ছিল ১২ শতাংশ। দেশের সব অঞ্চল অবশ্য একই পরিস্থিতির মধ্যে নেই। পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে বৃষ্টির ঘাটতি ছিল ২৬ শতাংশ। দক্ষিণ উপদ্বীপীয় অঞ্চলে ঘাটতি ১৯ শতাংশ এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতে ১১ শতাংশ। ফলে যে সব অঞ্চলে ধান চাষের জন্য বর্ষার জলের উপর নির্ভরতা বেশি, সেখানে কৃষিকাজের গতিতে তার প্রভাব পড়েছে। ধানের চাষের জমি কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে দেশের ধান উৎপাদন একই অনুপাতে কমে যাবে। কারণ ইতিমধ্যে যে জমিতে ধান রোপণ হয়েছে, সেখানে ফসলের বৃদ্ধি কেমন হচ্ছে, পর্যাপ্ত বৃষ্টি ও সেচ পাওয়া যাচ্ছে কি না এবং শেষ পর্যন্ত প্রতি হেক্টরে ফলন কত হচ্ছে, তার উপর মোট উৎপাদন নির্ভর করবে। একই সঙ্গে আগামী কয়েক সপ্তাহের আবহাওয়াও কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কৃষিক্ষেত্রে জমির পরিমাণ এবং উৎপাদনের পরিমাণ এক বিষয় নয়। কোনও মরশুমে কম জমিতে চাষ হলেও ফলন ভাল হলে মোট উৎপাদনের ঘাটতি অনেকটাই সামলানো সম্ভব। আবার জমির পরিমাণ প্রায় একই থাকলেও জলাভাব, রোগ-পোকার আক্রমণ কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ফলন কমে যেতে পারে। তাই চলতি খরিফ মরশুমের পূর্ণ ছবি পেতে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। তবে ১৪ অগস্ট পর্যন্ত পাওয়া পরিসংখ্যান দেশের কৃষি পরিকল্পনার সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, বর্ষার ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ধান-সহ জলনির্ভর ফসলের চাষ কতটা প্রভাবিত হবে? বিশেষ করে কর্ণাটক, ঝাড়খণ্ড, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ এবং তেলঙ্গানার মতো রাজ্যে ইতিমধ্যেই যে জমি ধান চাষের আওতার বাইরে চলে গিয়েছে, সেখানে পরবর্তী সময়ে চাষের পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়, তা নজরে থাকবে। উল্লেখ্য, ধান দেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ফলে চাষের জমির এই পতন শুধু কৃষকের আয় বা একটি মরশুমের ফলনের সঙ্গে যুক্ত নয়, এর সঙ্গে বাজারে চালের জোগান, কৃষিপণ্যের দাম ও গ্রামীণ অর্থনীতিরও সম্পর্ক রয়েছে। আগামী দিনে বর্ষার বাকি সময়ের বৃষ্টিপাত, জলাধারে জলের পরিমাণ, সেচের সুযোগ এবং মাঠে থাকা ধানের বৃদ্ধিই ঠিক করবে চলতি খরিফ মরশুমের শেষ হিসাব কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Haldia Phenol Plant, 6000 crore Haldia project | বাংলায় শিল্পের বড় বিনিয়োগ! হলদিয়ায় ৬০০০ কোটির ফেনল-অ্যাসিটোন কমপ্লেক্স, বদলাতে পারে পূর্ব ভারতের পেট্রোকেমিক্যাল মানচিত্র




