সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: উত্তর ২৪ পরগনার হালিশহরের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এ বার খাস কলকাতায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Mamata Banerjee) ঘিরে ‘চোর চোর’ স্লোগান ওঠার অভিযোগ ঘিরে উত্তেজনা ছড়াল। মঙ্গলবার শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর (Netaji Subhas Chandra Bose) মূর্তির পাদদেশে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন মমতা। তাঁর হাতে ছিল বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর (Khudiram Bose) ছবি। নেতাজীর মূর্তিতে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা জানানোর পরেই তাঁকে লক্ষ্য করে একদল মানুষ স্লোগান দিতে শুরু করেন বলে অভিযোগ। ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মরণে শ্যামবাজারে যান মমতা। ক্ষুদিরাম বসুর ছবি হাতে নিয়ে তিনি নেতাজির মূর্তিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন। শ্রদ্ধা জানানোর পর সেখানে উপস্থিত মানুষের একাংশের সঙ্গে তাঁর বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়। সেই সময়ই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে ‘চোর চোর’ স্লোগান ওঠে বলে অভিযোগ। ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি ঘিরে কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনা তৈরি হয়।
তৃণমূলের পক্ষ থেকে এই ঘটনার পিছনে বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের দায়ী করা হয়েছে। বেলেঘাটা কেন্দ্রের তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh) অভিযোগ করেন, ঘটনাটি আচমকা ঘটেনি। তাঁর দাবি, পরিকল্পিত ভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করেই স্লোগান দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে গিয়ে একজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে এভাবে হেনস্থা করার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তৃণমূলের। কিন্তু, মমতার বক্তব্যে এদিনের ঘটনায় কোনও দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। নেতাজীর মূর্তিতে শ্রদ্ধা জানানোর পর তিনি দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিপ্লবী ও জাতীয় নেতাদের স্মরণ করেন। ক্ষুদিরাম বসুর পাশাপাশি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধী (Mahatma Gandhi) এবং মাতঙ্গিনী হাজরার (Matangini Hazra) নামও উল্লেখ করেন তিনি। মমতার বক্তব্য, ‘এই সংগ্রামীদের আমরা কোনও দিন ভুলব না।’ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মরণ করার ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে তাঁদের আদর্শ ও আত্মত্যাগকে মনে রাখার উপর গুরুত্ব দেন তিনি।
শ্যামবাজারের এই ঘটনার আগে রবিবার উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচরাপাড়ায় একই ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়েছিলেন মমতা। পুলিশি হেফাজতে এক তৃণমূল কর্মীর মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। সেই সময় তাঁর গাড়িকে ঘিরে বিক্ষোভ দেখানো হয় বলে অভিযোগ। বিক্ষোভকারীদের একাংশের বিরুদ্ধে কাদা ও চটি ছোড়ার অভিযোগও ওঠে। পাশাপাশি ‘চোর চোর’ স্লোগান দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। কাঁচরাপাড়ার ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করেও রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) ওই ঘটনা নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে জনবিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে বলে মন্তব্য করেন শুভেন্দু।
পর পর দু’টি ঘটনায় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তৃণমূলের অভিযোগ, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি ইচ্ছাকৃত ভাবে পরিবেশ উত্তপ্ত করার চেষ্টা করছে। অন্য দিকে বিরোধী শিবিরের দাবি, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ থেকেই বিক্ষোভ ও স্লোগানের মতো ঘটনা সামনে আসছে। ফলে মমতার সাম্প্রতিক কর্মসূচিকে ঘিরে বিক্ষোভের ঘটনাগুলি আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতিতে আরও বড় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। এর মধ্যেই নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে উত্তরবঙ্গের বিজেপি সাংসদ নগেন রায় ওরফে অনন্ত মহারাজের (Ananta Maharaj) মন্তব্য নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের নেতা তথা বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজ রবিবার রাতে ফুলবাড়ির জাবরাভিটায় সংগঠনের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। সেখানে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতাজীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
অনন্ত মহারাজের বক্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ভারত স্বাধীন করার ক্ষেত্রে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর কোনও ভূমিকা ছিল না। তাঁর বক্তব্যে নেতাজির আজাদ হিন্দ বাহিনী এবং ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রাম নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এমনকি নেতাজিকে ‘দেশদ্রোহী’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি বলে অভিযোগ। অনন্ত মহারাজের বক্তব্যের একটি অংশে দাবি করা হয়, কোচবিহারের মানুষের আন্দোলন ও কোচবিহারের মহারাজা জগদীপেন্দ্রনারায়ণের (Maharaja Jagaddipendranarayan) নেতৃত্বেই স্বাধীনতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়া হয়েছিল। নেতাজি কোথায় গিয়েছিলেন, কী উদ্দেশ্যে কাজ করেছিলেন এবং ভারতের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা কতটা ছিল, তিনি এই ধরনের একাধিক প্রশ্নও তোলেন।
নেতাজীকে নিয়ে এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর উত্তরবঙ্গের পাশাপাশি রাজ্যের অন্যত্রও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। নেতাজীর ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অভিযোগে শিলিগুড়িতে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে নেতাজি বাহিনী। সংগঠনের সদস্যেরা শিলিগুড়ি সাইবার ক্রাইম থানার পাশাপাশি শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটের কাছেও অভিযোগ জমা দিয়েছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকাশ্য সভায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে যে মন্তব্য করা হয়েছে, তার তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তাঁদের বক্তব্য, দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। সেই কারণেই তাঁরা পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছেন।
নেতাজী বাহিনীর শিলিগুড়ি শাখার সদস্য অভিজিৎ সান্যাল (Abhijit Sanyal) জানান, শুধু অনন্ত মহারাজের বিরুদ্ধেই নয়, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) ও অনন্ত মহারাজের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ জানানো হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘শুধুমাত্র অনন্ত মহারাজ নন, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এবং অনন্ত মহারাজের যে বাহিনী রয়েছে, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।’
নেতাজীকে নিয়ে মন্তব্যের ঘটনায় বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের নাম জড়ানো নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ঘটনার তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পুলিশ অভিযোগ গ্রহণের পর বিষয়টি কী ভাবে এগিয়ে নিয়ে যায়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।
এক দিকে শ্যামবাজারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে ‘চোর চোর’ স্লোগানের অভিযোগ, অন্য দিকে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে অনন্ত মহারাজের মন্তব্য এবং তার পর থানায় অভিযোগ, পর পর ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ ফের উত্তপ্ত। তৃণমূলের অভিযোগ, বিরোধীরা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা অতিক্রম করছে। বিরোধীদের পাল্টা দাবি, মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
শ্যামবাজারের ঘটনা নিয়ে এখনও পর্যন্ত স্লোগানদাতাদের পরিচয় বা তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও নির্দিষ্ট আইনি পদক্ষেপের কথা জানা যায়নি। একই ভাবে নেতাজিকে নিয়ে অনন্ত মহারাজের মন্তব্যের পর দায়ের হওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ কী পদক্ষেপ করে, তা-ও পরবর্তী তদন্তের উপর নির্ভর করছে। তবে দু’টি ঘটনাই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিসরে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক কর্মসূচিকে ঘিরে পর পর বিক্ষোভ ও নেতাজীকে নিয়ে মন্তব্যের জেরে তৈরি হওয়া বিতর্ক আগামী দিনে রাজনৈতিক মঞ্চে আরও জোরালো হতে পারে। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মরণ করতে গিয়ে শ্যামবাজারে মমতার উপস্থিতি যেমন রাজনৈতিক স্লোগানের মুখে পড়ল, তেমনই সেই দিনেই নেতাজির ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন নতুন করে জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari Keshpur news | ‘ওদের জেলে দেখতে চাই’, কেশপুরে পুলিশকে কড়া নির্দেশ শুভেন্দুর, ক্ষুদিরামের স্মৃতিভূমির উন্নয়নে ৫ কোটি




