Colombia Earthquake News, 7.4 Magnitude Earthquake Colombia | ২১ বার কেঁপে উঠল মাটি! ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপ কলম্বিয়া, শতাধিক মৃত, নিখোঁজ ২০০০-এর বেশি

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বোগোতা: সোমবার সকাল। ঘড়ির কাঁটা তখন স্থানীয় সময় সাড়ে ৭টা ছুঁইছুঁই। আচমকাই কেঁপে উঠল মাটি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দুলতে শুরু করল বাড়িঘর, ভেঙে পড়ল একের পর এক বহুতল, আতঙ্কে রাস্তায় ছুটে এলেন মানুষ। পশ্চিম কলম্বিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে নেমে এল ভয়াবহ বিপর্যয়। রিখটার স্কেলে ৭.৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে এখনও পর্যন্ত অন্তত ১৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন ও সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে। আহতের সংখ্যা ৫৭০ ছাড়িয়েছে। কিন্তু উদ্ধারকাজ যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে নিখোঁজ মানুষের হিসাব। প্রশাসনের কাছে এখনও ২০০০-এর বেশি মানুষের সন্ধান নেই বলে খবর। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভূমিকম্পের পর পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে একের পর এক আফটারশক। মূল কম্পনের পরে অন্তত ২১ বার মাটি কেঁপেছে বলে জানিয়েছে কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক সংস্থার তথ্য উদ্ধৃত করে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম। ফলে উদ্ধারকারী দলগুলিকেও অত্যন্ত সতর্ক হয়ে কাজ করতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে যেসব বাড়ি বা সরকারি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেখানে নতুন করে কম্পন হলে ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনের তরফে বাসিন্দাদের ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে ফিরে না যাওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।

আরও পড়ুন : PM Narendra Modi | মোদীর পর কে? ২০৩৪-এর ভারত, বিজেপির উত্তরসূরি নিয়ে জল্পনা, যুব নেতৃত্ব বনাম অভিজ্ঞতার লড়াই

সবচেয়ে ভয়াবহ ছবি সামনে এসেছে পেরেইরা (Pereira), ক্যালি (Cali), মানিজালেস (Manizales) ও চোকো (Chocó) অঞ্চলে। পেরেইরায় বহু বাড়ি ও ভবন ভেঙে পড়েছে। ক্যালিতেও একাধিক ভবন ধসে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপের নীচে এখনও কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখছেন উদ্ধারকারীরা। ধ্বংসস্তূপ সরাতে ভারী যন্ত্র ব্যবহার করা হলেও অনেক জায়গায় স্থানীয় মানুষও উদ্ধারকাজে হাত লাগিয়েছেন। ক্যালির হাসপাতালগুলির পরিস্থিতি বিশেষ উদ্বেগ তৈরি করেছে। একটি হাসপাতালের অংশ ধসে পড়ায় সেখানে থাকা রোগীদের অনেকে ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে পড়েছেন বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর। চিকিৎসা পরিষেবাও মারাত্মক ভাবে ব্যাহত হয়েছে। শহরের একাধিক হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আহতদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা সচল রাখতে প্রশাসন ও স্বাস্থ্যকর্মীরা একযোগে কাজ করছেন।

শুধু হাসপাতাল নয়, ভূমিকম্পের অভিঘাতে স্কুল, সরকারি দফতর, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও বহু বসতবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পেরেইরায় অন্তত ৬৫টি ভবন ধসে পড়ার খবর পাওয়া গিয়েছে। ক্যালিতেও বহু কাঠামো ভেঙে পড়েছে। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কিছু অংশে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, যাতে উদ্ধারকাজে সমস্যা না হয়। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা (Abelardo de la Espriella) জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। প্রশাসনের তরফে উদ্ধার ও ত্রাণকাজে অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে থাকা মানুষদের দ্রুত খুঁজে বার করাই এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। গৃহহীন মানুষদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

ভূমিকম্পের তীব্রতা এতটাই ছিল যে পশ্চিম কলম্বিয়ার বাইরেও কম্পন অনুভূত হয়েছে। রাজধানী বোগোতা (Bogotá) -সহ দেশের একাধিক এলাকায় মানুষ বাড়িঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসেন। প্রতিবেশী দেশগুলির কিছু অংশেও কম্পন অনুভূত হয়েছে বলে খবর। বড় শহরগুলিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই নিরাপত্তার কারণে খোলা জায়গায় রাত কাটান। ভূমিকম্পের কারণে বিমান পরিষেবাতেও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। পশ্চিম কলম্বিয়ার একাধিক বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উড়ান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। কিছু বিমানবন্দরে পরিষেবা সাময়িক ভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। ফলে উদ্ধারকারী দল, ত্রাণসামগ্রী ও জরুরি সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছে দিতে প্রশাসনকে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। প্রকৃতির এই ভয়াবহ আঘাত কলম্বিয়ার জন্য নতুন নয়। দেশটির পাহাড়ি অঞ্চলগুলিতে ভূমিকম্পের ঝুঁকি দীর্ঘদিনের। কলম্বিয়ার জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের পাহাড়ি ও আন্দীয় অঞ্চলের বিস্তীর্ণ অংশ উচ্চ বা মাঝারি ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার মধ্যে পড়ে। অতীতেও বড় ভূমিকম্পে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির ক্ষতি হয়েছে।

এবারও ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল পশ্চিম কলম্বিয়ার চোকো অঞ্চলের কাছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সান হোসে দেল পালমার (San José del Palmar) এলাকার কাছে ভূমিকম্পের উৎস ছিল। ভূপৃষ্ঠের বেশ গভীরে কম্পনের উৎপত্তি হলেও তার শক্তি এতটাই বেশি ছিল যে বহু দূরের শহরেও তার অভিঘাত পৌঁছে যায়। উদ্ধারকারীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে পর পর আফটারশক। একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পরে ভবনগুলি ইতিমধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়ে। তার পর নতুন কম্পন হলে ধসের আশঙ্কা বাড়ে। ফলে উদ্ধারকারীদের প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিতে হচ্ছে। কোথাও জীবিত মানুষের উপস্থিতির সামান্য ইঙ্গিত পেলেই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

প্রশাসনের তরফে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলির তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। কোন বাড়িতে মানুষ আটকে রয়েছেন, কোথায় সম্পূর্ণ ধস নেমেছে এবং কোথায় শুধু কাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে, সেগুলিও চিহ্নিত করা হচ্ছে। উদ্ধারকাজের পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ হিসাব তৈরি করাও শুরু হয়েছে। তবে প্রত্যন্ত এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ জানতে আরও সময় লাগতে পারে।

আন্তর্জাতিক স্তরেও কলম্বিয়ার পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জরুরি সহায়তার জন্য অর্থ দেওয়ার কথা জানিয়েছে। উদ্ধারকাজ এবং ত্রাণ পৌঁছে দিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ নিখোঁজ ২০০০-এর বেশি মানুষকে ঘিরে। তাঁদের কত জন ধ্বংসস্তূপের নীচে রয়েছেন, কত জন নিরাপদে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন এবং কত জনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, তা এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। ফলে উদ্ধারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা নিয়ে চূড়ান্ত হিসাব দেওয়া সম্ভব নয়।

একই সঙ্গে ২১টি আফটারশক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। উদ্ধারকারীরা এক দিকে ধ্বংসস্তূপে প্রাণের সন্ধান চালাচ্ছেন, অন্য দিকে নতুন কম্পনের আশঙ্কায় নিজেদের নিরাপত্তার কথাও মাথায় রাখছেন। হাসপাতালগুলিতে আহতদের চাপ বাড়ছে, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলিতে ঢোকা নিয়ে রয়েছে ঝুঁকি, বহু পরিবার রাত কাটাচ্ছেন খোলা আকাশের নিচে। উল্লেখ্য, সোমবারের ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্প তাই শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের জন্য বড় মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, ততই প্রকাশ্যে আসবে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির ছবি। এখন প্রশাসনের সামনে একটাই লক্ষ্য, ধ্বংসস্তূপের নীচে যদি কেউ জীবিত থাকেন, তাঁকে যত দ্রুত সম্ভব উদ্ধার করা এবং বিপর্যস্ত মানুষদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Russia to India rail route, India Russia train corridor | রাশিয়া থেকে সরাসরি ট্রেনে ভারত! নতুন রেলপথে কূটনীতি ও বাণিজ্যে বড় চাল, মস্কোর প্রস্তাবে আন্তর্জাতিক মহলে চাঞ্চল্য

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন