সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে চাইছে দক্ষিণ কোরিয়া (South Korea)। আগামী কয়েক বছরে ভারতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সিওলের। অটোমোবাইল এবং ইলেকট্রনিক্সের মতো পরিচিত ক্ষেত্রের পাশাপাশি এ বার জাহাজ নির্মাণ, সেমিকন্ডাক্টর এবং সংশ্লিষ্ট সরবরাহ শৃঙ্খলকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আর সেই নতুন বিনিয়োগ পর্বে পশ্চিমবঙ্গের দিকে নজর পড়তে পারে বলে কলকাতায় দেওয়া এক বক্তব্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত লি সিয়ং-হো (Lee Seong-ho)।
ভারতীয় বাজারে দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্থাগুলির উপস্থিতি নতুন নয়। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হুন্ডাই (Hyundai), কিয়া (Kia), স্যামসাং (Samsung) এবং এলজি (LG)-এর মতো সংস্থা ভারতের বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছে। গাড়ি থেকে শুরু করে মোবাইল ফোন, ভোক্তা ইলেকট্রনিক্স এবং অন্যান্য উৎপাদন ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ ইতিমধ্যেই ভারতীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তবে সিওলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এ বার বিনিয়োগের পরিধি আরও কয়েকটি কৌশলগত শিল্পে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। কলকাতায় আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত লি সিয়ং-হো জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্থাগুলির জন্য পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক অবস্থান যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাঁর মতে, বন্দর, সড়ক ও রেল যোগাযোগ ও দক্ষ কর্মীবাহিনীকে কাজে লাগিয়ে পশ্চিমবঙ্গ পূর্ব ভারতের পাশাপাশি উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং প্রতিবেশী দেশগুলির বাজারে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। কোরিয়ান সংস্থাগুলিকে রাজ্যে বিনিয়োগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগের সম্ভাব্য ‘দ্বিতীয় ঢেউ’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে জাহাজ নির্মাণ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সমুদ্রপথের গুরুত্ব এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে পরিবর্তনের ফলে জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভারতেও এই ক্ষেত্রের সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা চলছে। দক্ষিণ কোরিয়ার জাহাজ নির্মাণ সংস্থাগুলির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পও এই নতুন পর্বের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চিপ উৎপাদন এবং সরবরাহকে ঘিরে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। বিভিন্ন দেশ নিজেদের সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ভারতও সেই দৌড়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য তাই ভারতীয় বাজারে সেমিকন্ডাক্টর সংক্রান্ত বিনিয়োগের সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই শিল্পের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল, শুধু একটি বড় কারখানা তৈরি হলেই গোটা ব্যবস্থাটি গড়ে ওঠে না। চিপ উৎপাদন, যন্ত্রাংশ, রাসায়নিক উপাদান, প্যাকেজিং, পরীক্ষা ও পরিবহণের সঙ্গে যুক্ত বহু সংস্থার প্রয়োজন হয়। ফলে বড় শিল্পের পাশাপাশি মাঝারি ও ছোট সংস্থাগুলির জন্যও নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প যদি এই ধরনের সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, তা হলে রাজ্যের শিল্পক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে।
ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ২০৩০ সালকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুই দেশ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে ৫৪ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে। একই সঙ্গে আগামী কয়েক বছরে ভারতে কোরিয়ার বিনিয়োগ দ্বিগুণ বা তিনগুণ করার পরিকল্পনার কথাও সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তনের সময়ে ভারতকে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবে দেখছে সিওল। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। রাজ্যের পূর্ব উপকূলের বন্দরগুলি ভারতের পূর্বাঞ্চলের বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে পণ্য পরিবহণের পরিকাঠামো রয়েছে। সড়ক ও রেলপথের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও রয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির বাজারে পৌঁছনোর ক্ষেত্রেও পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু ভারতের বাজার নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বাংলার অবস্থানকে কাজে লাগানো যেতে পারে। বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান-সহ প্রতিবেশী অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক সুবিধা রয়েছে। ফলে কোরিয়ান সংস্থাগুলি যদি রাজ্যে উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি করে, তা হলে বৃহত্তর পূর্বাঞ্চলীয় বাজারকে সামনে রেখে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু, বিনিয়োগ টানতে পরিকাঠামোর পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ এবং শিল্পবান্ধব পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। সেমিকন্ডাক্টর বা জাহাজ নির্মাণের মতো উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত কর্মীর প্রয়োজন হবে। স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং শিল্প সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা গেলে সেই প্রয়োজন মেটানোর সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় ছোট ও মাঝারি শিল্পকে বড় কোরিয়ান সংস্থার সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নিলে বিনিয়োগের সুফল আরও বিস্তৃত হতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ভারতের শিল্প সম্পর্কের প্রথম পর্যায়ে মূলত গাড়ি, ইলেকট্রনিক্স এবং উৎপাদন শিল্প বড় ভূমিকা নিয়েছিল। এ বার দ্বিতীয় পর্যায়ে সেই পরিধি আরও বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। জাহাজ নির্মাণ ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো শিল্পে বিনিয়োগ এলে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসতে পারে। রাষ্ট্রদূত লি সিয়ং-হোর বক্তব্যে পশ্চিমবঙ্গের সম্ভাবনার বিষয়টি উঠে আসায় রাজ্যের শিল্পমহলেও বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কলকাতাকে পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহার করে কোরিয়ান সংস্থাগুলি কতটা বিনিয়োগে এগিয়ে আসে, এখন সেদিকেই নজর। ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত-দক্ষিণ কোরিয়া বাণিজ্য ৫৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছনোর লক্ষ্যের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ কতটা যুক্ত হতে পারে, তার উপর নির্ভর করবে রাজ্যের শিল্পক্ষেত্রে এই নতুন সম্ভাবনা কতটা বাস্তব রূপ নেয়।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Russia to India rail route, India Russia train corridor | রাশিয়া থেকে সরাসরি ট্রেনে ভারত! নতুন রেলপথে কূটনীতি ও বাণিজ্যে বড় চাল, মস্কোর প্রস্তাবে আন্তর্জাতিক মহলে চাঞ্চল্য




