সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কেশপুর: ‘নরেন্দ্র মোদী জিন্দাবাদ’ বলার কারণে বিজেপির কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া পুরনো মামলা নিয়ে এ বার কড়া অবস্থান নিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুরের মোহবনিতে বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর (Khudiram Bose) মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গিয়ে জেলার পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানাকে (Papia Sultana) পুরনো মামলাগুলি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন তিনি। পাশাপাশি ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় কেশপুরে তাঁর সভা ঘিরে যে মামলা হয়েছিল, সেটিও ফের সামনে আনার কথা বলেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, যাঁদের বিরুদ্ধে অন্যায় ভাবে মামলা করা হয়েছিল, তাঁদের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে; আবার যাঁরা আইনভঙ্গের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
মঙ্গলবার কেশপুরের মোহবনিতে ক্ষুদিরাম বসুর জন্মভিটেতে ‘আত্মবলিদান দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শুভেন্দু। তাঁর সঙ্গে ছিলেন পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলাশাসক বিজিন কৃষ্ণা (Bizin Krishna) ও পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা। পূর্ব মেদিনীপুর থেকে হেলিকপ্টারে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও আবহাওয়ার প্রতিকূলতার কারণে শেষ পর্যন্ত কোলাঘাট থেকে সড়কপথে তিনি কেশপুরে পৌঁছন। অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেই কেশপুরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং গত কয়েক বছরের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে মুখ খোলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর অভিযোগ, বিজেপির বহু কর্মীকে রাজনৈতিক কারণে মামলায় জড়ানো হয়েছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের জন্য পুলিশ প্রশাসনের কাছে আবেদন জানান তিনি। পুলিশ সুপারকে উদ্দেশ করে শুভেন্দু বলেন, ‘যাঁরা মোদীজি জিন্দাবাদ বলার জন্য অত্যাচার সহ্য করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলি প্রত্যাহারের বিষয়টি দেখুন।’
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রসঙ্গও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। কেশপুরে তাঁর নির্বাচনী সভায় বাধা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন শুভেন্দু। তিনি জানান, সভায় যাওয়ার পরেও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ছিল না। সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত মামলা ফের খতিয়ে দেখার জন্য পুলিশকে বলেন তিনি। মঞ্চ থেকে শুভেন্দুর মন্তব্য, ‘ওই মামলাটা বার করুন। যাঁরা জড়িত ছিলেন, তাঁদের আমি জেলে দেখতে চাই।’ তবে কেশপুর সফরের রাজনৈতিক বার্তার পাশাপাশি এ দিনের অনুষ্ঠানের বড় ঘোষণা ছিল ক্ষুদিরাম বসুর জন্মভিটে মোহবনির পরিকাঠামোগত উন্নয়ন। মোহবনি উন্নয়ন পর্ষদের জন্য প্রাথমিক ভাবে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানান শুভেন্দু। ক্ষুদিরামের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে এলাকায় সংগ্রহশালা, গ্যালারি, লেজ়ার শো এবং অতিথি আবাস তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান।
শুভেন্দুর বক্তব্য অনুযায়ী, মোহবনি উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান তথা জেলাশাসকের কাছ থেকে পাওয়া পরিকল্পনা এবং প্রস্তাবের ভিত্তিতেই উন্নয়ন প্রকল্পের কাঠামো তৈরি করা হবে। তার আগে তৈরি হবে বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন বা ডিটেলড প্রোজেক্ট রিপোর্ট (Detailed Project Report)। বর্ষার মধ্যেই দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ করে অক্টোবর থেকে নির্মাণকাজ পুরোদমে শুরু করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। ক্ষুদিরামের জন্মভিটের উন্নয়ন নিয়ে বলতে গিয়ে শুভেন্দু আরও জানান, ৫ কোটি টাকা প্রাথমিক বরাদ্দ হলেও পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরও অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। তাঁর কথায়, ‘পরিকল্পনাটি বড়। পাঁচ কোটি টাকায় সব কাজ শেষ হবে না। প্রয়োজনে আরও অর্থ দেওয়া হবে।’ অর্থের অভাবে প্রকল্পের কাজ আটকে থাকবে না বলেও তিনি জানান।
এদিনের অনুষ্ঠানে ক্ষুদিরাম বসুর ঐতিহাসিক ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে কেশপুরের মোহবনির গুরুত্ব রয়েছে। অথচ দীর্ঘ সময় ধরে এই জায়গার যথাযথ সংরক্ষণ এবং প্রচারের অভাব ছিল। ক্ষুদিরামের স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে স্মৃতিসৌধের পাশাপাশি সংগ্রহশালা ও গ্যালারির মতো পরিকাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন বলে জানান তিনি। শুভেন্দুর দাবি, রাজ্যে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলগুলি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের যথাযথ মর্যাদা দেয়নি। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সম্মান দেওয়া এবং দেশের ইতিহাসকে মানুষের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।’ তাঁর বক্তব্যে বাম আমল থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনকাল, দুই পর্যায়ের রাজনৈতিক প্রশাসনেরই সমালোচনা উঠে আসে।
কেশপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিজের সঙ্গে অবিভক্ত মেদিনীপুরের সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন শুভেন্দু। ক্ষুদিরাম বসুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ১১ অগস্টের মতো একটি দিনে অতীতে কোনও মুখ্যমন্ত্রী এখানে এসেছিলেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস এবং বর্তমান রাজনীতিকে একই পরিসরে নিয়ে আসার চেষ্টা দেখা যায়। অন্য দিকে, ক্ষুদিরামের জন্মভিটে ঘিরে নতুন পর্যটন ও ঐতিহাসিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রাজনৈতিক মহলে গুরুত্ব পেয়েছে। সংগ্রহশালা ও গ্যালারি তৈরি হলে ক্ষুদিরামের জীবন, তাঁর বিপ্লবী কর্মকাণ্ড এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নানা তথ্য সেখানে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে। লেজ়ার শোয়ের পরিকল্পনার ফলে সন্ধ্যার পরেও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অতিথি আবাস তৈরি হলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের থাকার ব্যবস্থাও হতে পারে।
ক্ষুদিরামের স্মৃতিভূমির উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু করার উপর জোর দিয়েছেন শুভেন্দু। আগামী বছরের মধ্যে কাজের অগ্রগতি দেখতে চান বলেও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, ‘আগামী বছর এসে যেন দেখতে পাই, পরিকল্পিত কাজগুলি এগিয়ে গিয়েছে।’ ফলে প্রশাসনিক স্তরে দ্রুত ডিপিআর তৈরি এবং দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। একই অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক মামলা এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে শুভেন্দুর মন্তব্য নতুন করে কেশপুরের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আলোচনায় এনেছে। পুরনো মামলাগুলি ফের খতিয়ে দেখার নির্দেশ এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময়কার ঘটনাকে সামনে এনে শুভেন্দুর বক্তব্য আগামী দিনে বিজেপি-তৃণমূল সংঘাতের নতুন পর্ব তৈরি করতে পারে। উল্লেখ্য, এক দিকে ক্ষুদিরাম বসুর স্মৃতিভূমির উন্নয়নে ৫ কোটি টাকার প্রাথমিক বরাদ্দ, অন্য দিকে পুরনো রাজনৈতিক মামলা নিয়ে পুলিশ প্রশাসনের প্রতি কড়া নির্দেশ, দুই বিষয়কে কেন্দ্র করেই এ দিনের কেশপুর সফর তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মোহবনির ঐতিহাসিক গুরুত্বকে সামনে রেখে উন্নয়ন প্রকল্প কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, এখন সেটিই দেখার। পাশাপাশি শুভেন্দুর নির্দেশের পর পুরনো মামলাগুলি নিয়ে পশ্চিম মেদিনীপুর পুলিশ কী পদক্ষেপ করে, তার দিকেও নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Vande Mataram mandatory in schools, Suvendu Adhikari decision | স্কুলে বাধ্যতামূলক ‘বন্দে মাতরম’: সোমবার থেকেই নতুন নিয়ম, শুভেন্দু অধিকারী -এর ঘোষণায় জোর চর্চা রাজ্যে




