সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ক্রাইস্টচার্চ : নিউজিল্যান্ডের মাটিতে প্রথম বার খেলতে নেমেই ব্যাট হাতে রেকর্ড গড়লেন ভারতের তরুণ ওপেনার অভিষেক শর্মা (Abhishek Sharma)। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ইনিংসের প্রথম বলেই সবচেয়ে বেশি বার ছক্কা মারার কীর্তি এখন তাঁর দখলে। ক্রাইস্টচার্চে (Christchurch) নিউজিল্যান্ডের দেওয়া ২২৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে প্রথম বলেই ছক্কা হাঁকিয়ে ইনিংস শুরু করেন বাঁহাতি এই ব্যাটার। তাঁর সেই আক্রমণাত্মক শট শুধু ভারতীয় ইনিংসে ঝড়ের ইঙ্গিত দেয়নি, গড়ে দিয়েছে ব্যক্তিগত নজিরও। যদিও বড় রান করার আগেই তাঁকে সাজঘরে ফিরতে হয়, তবু তাঁর ঝোড়ো শুরু ভারতের রান তাড়া করার ভিত গড়ে দিতে সাহায্য করে। শেষ পর্যন্ত সঞ্জু স্যামসন (Sanju Samson), শ্রেয়াস আয়ার (Shreyas Iyer) ও নমন ধীরের (Naman Dhir) ব্যাটে ভর করে জয় তুলে নেয় ভারত।
২২৬ রানের লক্ষ্য টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সহজ নয়। শুরু থেকেই দ্রুত রান তোলার পাশাপাশি উইকেট ধরে রাখাও জরুরি হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে ওপেন করতে নেমে প্রথম বল থেকেই আক্রমণের পথ বেছে নেন অভিষেক। নিউজিল্যান্ডের পেসার ম্যাট হেনরির (Matt Henry) বল কভারের উপর দিয়ে তুলে তিনি সীমানার বাইরে পাঠিয়ে দেন। বলটি গ্যালারিতে গিয়ে পড়তেই ভারতীয় শিবিরে উচ্ছ্বাস দেখা যায়। তবে সেই ছক্কার গুরুত্ব শুধু ম্যাচের উত্তেজনায় সীমাবদ্ধ ছিল না। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ইনিংসের প্রথম বলে ছক্কা মারার নিরিখে একক ভাবে শীর্ষে উঠে যান অভিষেক। এত দিন এই তালিকায় অভিষেকের সঙ্গে যুগ্ম ভাবে শীর্ষে ছিলেন আফগানিস্তানের শফিকুল্লা শিনওয়ারি (Shafiqullah Shinwari)। দু’জনেই ছ’বার করে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ইনিংসের প্রথম বলে ছক্কা মেরেছিলেন। ক্রাইস্টচার্চে হেনরির বিরুদ্ধে প্রথম বলেই ছক্কা হাঁকিয়ে সেই সংখ্যা সাত করে ফেলেন ভারতীয় ওপেনার। ফলে শফিকুল্লাকে পিছনে ফেলে তালিকার শীর্ষে উঠে আসেন অভিষেক। এই তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছেন ভারতের টি-টোয়েন্টি দলের প্রাক্তন অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব (Suryakumar Yadav)। ইনিংসের প্রথম বলে পাঁচ বার ছক্কা মেরে এই তালিকায় নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন সূর্যকুমার।
অভিষেকের ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, শুরু থেকেই বোলারদের উপর চাপ তৈরি করার চেষ্টা। প্রথম বলেই ছক্কা মারার ঘটনা তাঁর ক্ষেত্রে নতুন নয়। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এমন কীর্তি বারবার করে দেখানো সহজ না। প্রতিপক্ষের বোলাররা সাধারণত ইনিংসের শুরুতে নতুন বল হাতে নিয়ে উইকেট পাওয়ার পরিকল্পনা করেন। সেই সময়ে প্রথম বল থেকেই বড় শট খেলার ঝুঁকি নেওয়া ব্যাটারের জন্য যেমন বিপজ্জনক, তেমনই সফল হলে তা বিপক্ষের পরিকল্পনায় ধাক্কা দিতে পারে। অভিষেকের এই আক্রমণাত্মক মানসিকতাই তাঁকে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। ক্রাইস্টচার্চের ম্যাচেও নিজের পরিচিত ছন্দে ব্যাটিং শুরু করেন ভারতীয় ওপেনার। অভিষেক মাত্র ১২ বলে ২৯ রান করেন। তাঁর ইনিংসে ছিল দু’টি চার ও তিনটি ছক্কা। দ্রুত রান তুলে ভারতকে প্রয়োজনীয় গতি এনে দেন অভিষেক। বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাওয়ার প্লে-তে রান তোলার গুরুত্ব অনেক। কারণ, শুরুতে দ্রুত রান উঠলে পরের ব্যাটারদের উপর চাপ কিছুটা কমে যায়। অভিষেকের ছোট কিন্তু আক্রমণাত্মক ইনিংস ভারতের রান তাড়ার শুরুটাকে গতিময় করে তোলে।
কিন্তু অভিষেকের ইনিংস দীর্ঘ হয়নি। পাওয়ার প্লে-র শেষ ওভারে নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক মাইকেল ব্রেসওয়েলের (Michael Bracewell) বলে আরও একটি ছক্কা মারতে গিয়ে আউট হন অভিষেক। ক্রিজে নিজের অবস্থান বদলে বড় শট খেলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বলটি ঠিকমতো ব্যাটে না লাগায় ক্যাচ তুলে দেন। ফলে ১২ বলেই থেমে যায় তাঁর ঝোড়ো ইনিংস। ব্যক্তিগত ভাবে বড় রান করার সুযোগ হাতছাড়া হলেও, তত ক্ষণে নিজের নামের পাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নজির যোগ করে ফেলেছেন তিন। অভিষেকের মাঠ ছাড়ার পর ভারতের রান তাড়া করার দায়িত্ব এসে পড়ে পরের ব্যাটারদের ওপর। বড় লক্ষ্য সামনে থাকায় প্রতিটি ওভারে রান তোলার গতি বজায় রাখা জরুরি ছিল। সেই পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়ে ব্যাট করেন সঞ্জু স্যামসন। তাঁর ৬৭ রানের ইনিংস ভারতের জয়ের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ইনিংসের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রয়োজন অনুযায়ী রান তুলে দলকে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান সঞ্জু। দ্রুত শুরু পাওয়ার পর সেই গতি ধরে রাখার জন্য স্যামসনের ইনিংস কার্যকর হয়ে ওঠে। সঞ্জুর পাশাপাশি অবদান রাখেন শ্রেয়স আয়ার ও নমন ধীরও। দু’জনেই ৪২ রান করে ভারতীয় ইনিংসকে এগিয়ে নিয়ে যান। একাধিক ব্যাটারের অবদানে রান তাড়া করার লড়াইয়ে ভারত প্রতিপক্ষকে পিছনে ফেলে দেয়।
টি-টোয়েন্টিতে বড় লক্ষ্য তাড়া করতে গেলে সাধারণত এক জন ব্যাটারের উপর পুরো দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া যায় না। শুরুতে দ্রুত রান, মাঝের ওভারে জুটি ও শেষ দিকে চাপ সামলে প্রয়োজনীয় রান তোলা, সব ক্ষেত্রেই সমন্বয় দরকার হয়। এই ম্যাচে ভারতের ব্যাটিংয়ে সেই সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রতিফলন দেখা যায়। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত লক্ষ্য থেকে মাত্র কয়েকটি বল বাকি থাকতে জয় পায় ভারত। ইনিংসের শেষ দুই বল হাতে রেখেই ২২৬ রানের লক্ষ্যে পৌঁছে যায় দল। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে এটিই ভারতের সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড বলে উল্লেখ। ফলে ম্যাচটি শুধু অভিষেকের ব্যক্তিগত রেকর্ডের জন্য নয়, ভারতের দলগত সাফল্যের কারণেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বড় রান তাড়া করার চাপ সামলে জয় তুলে নেওয়ায় ব্যাটিং বিভাগের একাধিক খেলোয়াড়ের অবদান সামনে এসেছে।
অভিষেকের ইনিংসের দৈর্ঘ্য কম হলেও তাঁর প্রথম বলের ছক্কাটি ম্যাচের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে প্রথম বলে ছক্কা মারার তালিকায় একক ভাবে শীর্ষে ওঠা তাঁর আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতারই পরিচয় দেয়। তবে ব্যক্তিগত রেকর্ডের পাশাপাশি দলের জয়ই ছিল ম্যাচের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সঞ্জু স্যামসনের ৬৭, শ্রেয়স আয়ার ও নমন ধীরের ৪২ রান করে অবদান এবং অভিষেকের দ্রুত শুরু, এসব কিছুর সম্মিলিত ফলেই কঠিন লক্ষ্য পেরিয়ে যায় ভারত উল্লেখ্য যে, নিউজিল্যান্ডের মাটিতে প্রথমবার খেলতে নেমেই অভিষেক শর্মার এমন কীর্তি তাঁর আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি কেরিয়ারের আলোচনায় নতুন অধ্যায় যোগ করল। প্রথম বলেই ছক্কা মেরে নজির গড়া থেকে শুরু করে মাত্র ১২ বলে ২৯ রান, স্বল্প সময়ের উপস্থিতিতেই নিজের আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের পরিচয় দিয়েছেন তিনি। যদিও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি, ভারতের জয়ের পথে তাঁর দ্রুত শুরু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন চোখ থাকবে পরের ম্যাচগুলিতে এই ফর্ম ধরে রেখে দলের হয়ে আরও বড় অবদান রাখতে পারেন কি না, সেদিকে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Virat Kohli ODI Ranking, ICC ODI Rankings | শীর্ষস্থান থেকে মাত্র ২০ পয়েন্ট দূরে কোহলি, গিলের সঙ্গে জমে উঠল আইসিসি ওয়ান ডে র্যাঙ্কিংয়ের লড়াই



