সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : ২০২৭ সালের এক দিনের বিশ্বকাপের (ICC Men’s Cricket World Cup 2027) সূচী প্রকাশ হতেই ভারতীয় ক্রিকেটে শুরু হয়েছে নতুন করে হিসাব-নিকাশ। দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবোয়ে ও নামিবিয়ায় হতে চলা এই এই আয়োজনকে ঘিরে ইতিমধ্যেই প্রস্তুতির আবহ তৈরি হয়েছে। ২ অক্টোবর শুরু হবে বিশ্বকাপের মূল আয়োজন এবং ২১ নভেম্বর জোহানেসবার্গে হবে ফাইনাল। ভারতের প্রথম ম্যাচ ৭ অক্টোবর, কেপ টাউনে গত বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে।

এই সূচী প্রকাশের পরই ২০২৭ বিশ্বকাপ নিয়ে নিজের ভাবনার কথা জানিয়েছেন ভারতীয় এক দিনের দলের অধিনায়ক শুভমন গিল (Shubman Gill)। তাঁর কথায় উঠে এসেছে ২০২৩ সালের বিশ্বকাপের স্মৃতি। সেবার ঘরের মাঠে দুর্দান্ত ক্রিকেট খেলেও ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হারতে হয়েছিল ভারতকে। গোটা প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পর শেষ ম্যাচে ট্রফি হাতছাড়া হওয়ায় যে আক্ষেপ তৈরি হয়েছিল, তা এখনও ভারতীয় শিবিরে রয়েছে। সেই অসমাপ্ত কাজই এবার শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে এগোতে চান শুভমন। ভারতীয় দলের নেতৃত্ব এখন তাঁর হাতে। ফলে আগামী বিশ্বকাপে শুধু ব্যাটার হিসেবে নয়, অধিনায়ক হিসাবেও শুভমনের উপর থাকবে বড় দায়িত্ব। তবে সেই দায়িত্বকে চাপ হিসাবে তিনি দেখতে নারাজ। তাঁর কাছে অধিনায়কত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আর দেশের জন্য নেতৃত্ব দেওয়ার বড় সম্মান। ছোটবেলায় ভারতের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখলেও অধিনায়ক হওয়ার কথা আলাদা করে ভাবেননি বলে জানিয়েছেন শুভমন। তাঁর কাছে দেশের হয়ে মাঠে নেমে দলকে জেতানোই ছিল সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। সেই ভাবনা থেকেই শুভম নেতৃত্বের দায়িত্বও সামলাতে চান।

২০২৩ সালের বিশ্বকাপে ভারত শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দুর্দান্ত ছন্দে ছিল। লিগ পর্বে একের পর এক ম্যাচ জিতে সেমিফাইনালে নিউজ়িল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছেছিল রোহিত শর্মা (Rohit Sharma) -এর দল। কিন্তু আহমেদাবাদের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে পরাজয় আসে। এবার সেই অভিজ্ঞতাই কাজে লাগাতে চান শুভমন। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম, বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতায় দীর্ঘ সময় ভাল খেললেও শেষ ম্যাচের ফলই শেষ পর্যন্ত ট্রফি নির্ধারণ করে। তাই এবার প্রস্তুতির লক্ষ্য শুধু ভাল ক্রিকেট খেলা নয়, শেষ পর্যন্ত কাজ সম্পূর্ণ করা। শুভমনের কাছে আগামী বিশ্বকাপ আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নিজেই এই দলের অধিনায়ক। ফলে আগের বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা, দলের সিনিয়র ক্রিকেটারদের পরামর্শ আর নিজের নেতৃত্ব এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে কাজে লাগাতে চান। বিশেষ করে বিরাট কোহলি (Virat Kohli) এবং রোহিত শর্মার মতো দুই অভিজ্ঞ ক্রিকেটারকে দলে পাওয়া তাঁর কাছে বড় সুবিধা। কোহলি ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, ২০২৭ সালের বিশ্বকাপই ভারতের হয়ে তাঁর শেষ বিশ্বকাপ হতে চলেছে। একই সঙ্গে আগামী বিশ্বকাপে দেশের হয়ে সাফল্য পাওয়ার লক্ষ্যও তিনি জানিয়েছেন।
শুভমন মনে করেন, কোহলি ও রোহিতের মতো ক্রিকেটারের গভীর আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দলের তরুণদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বড় ম্যাচের চাপ, বিশ্বকাপের পরিবেশ, কঠিন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা ম্যাচের গতিপথ বোঝার ক্ষেত্রে তাঁদের অভিজ্ঞতা অধিনায়ক হিসাবেও তিনি কাজে লাগাতে চান। এর আগে আইসিসিকেও শুভমন জানিয়েছিলেন, দলের দুই সিনিয়র ক্রিকেটারের অভিজ্ঞতা ভারতীয় দলের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। বর্তমানে আইসিসি পুরুষদের ওয়ান ডে ব্যাটিং ক্রমতালিকায় শীর্ষে রয়েছেন শুভমন। ৩০ সেপ্টেম্বরের আপডেটে তাঁর রেটিং ৮১৬। তাঁর ঠিক পিছনেই উঠে এসেছেন বিরাট কোহলি, তাঁর রেটিং ৭৯৬। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে প্রথম ওয়ান ডে-তে শুভমনের শতরান ও কোহলির অপরাজিত ১৩৯ রানের ইনিংসের পর দু’জনের মধ্যে ব্যবধান আরও কমেছে। একই তালিকায় রোহিতও প্রথম চারজনের মধ্যে রয়েছেন। ব্যক্তিগত ক্রমতালিকায় শীর্ষস্থান ধরে রাখাকে এখন আর নিজের প্রধান লক্ষ্য হিসাবে দেখছেন না শুভমন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একটা সময় এক দিনের ক্রিকেটে বিশ্বের এক নম্বর ব্যাটার হওয়ার ইচ্ছা ছিল। প্রথম বার শীর্ষে ওঠার পর স্বাভাবিক ভাবেই ভাল লেগেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁর ভাবনায় পরিবর্তন এসেছে। এখন ব্যক্তিগত অবস্থানের চেয়ে দলের প্রয়োজনে রান করা এবং ভারতকে ম্যাচ জেতানো তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গিই আগামী বিশ্বকাপের আগে শুভমনের ভাবনায় বড় ভূমিকা নিতে পারে। অধিনায়ক হিসাবে তাঁর কাছে ব্যক্তিগত রেকর্ডের চেয়ে দলের সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৭ বিশ্বকাপে ভারত কত দূর যাবে, তা নির্ভর করবে দীর্ঘ প্রতিযোগিতায় দল হিসাবে পারফরম্যান্সের উপর। আর সেই জায়গাতেই নিজের দায়িত্বকে সামনে রাখছেন ভারতীয় অধিনায়ক। শুধু কোহলি ও রোহিতের কাছ থেকেই যে পরামর্শ নেন, তা নয়। দলের অন্য ক্রিকেটারদের মতামতও গুরুত্ব দিয়ে শোনেন শুভমন। লোকেশ রাহুল (KL Rahul), শ্রেয়াস আয়ার (Shreyas Iyer)-সহ সতীর্থদের সঙ্গেও প্রয়োজন অনুযায়ী আলোচনা করেন শুভমন বলে সূত্রের খবর। অধিনায়ক হিসাবে নিজের সিদ্ধান্তই সব সময় চূড়ান্ত হবে এমন মানসিকতা তাঁর নেই। দলের প্রত্যেক ক্রিকেটারের ভাবনা শোনার মধ্যে দিয়ে নতুন কিছু শেখার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন ভারতের তরুণ অধিনায়ক।
আরও পড়ুন : Amir Khan : কিরণ রাওয়ের সঙ্গে বিচ্ছেদ নিয়ে মুখ খুললেন আমির খান
শুভমনের এই অবস্থান ভারতীয় দলের নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের সঙ্গে অভিজ্ঞদের সমন্বয় করে তিনি এগোনোর চেষ্টা করছেন। এক দিকে কোহলি-রোহিতের মতো দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার, অন্য দিকে দলের তরুণ মুখ, এই দুই প্রজন্মকে একসঙ্গে নিয়ে ২০২৭ বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নেওয়াই এখন ভারতীয় দলের সামনে বড় কাজ। এদিকে ২০২৭ বিশ্বকাপের কাঠামোও আগের সংস্করণের তুলনায় বদলেছে। ১৪টি দল নিয়ে হবে এই প্রতিযোগিতা। প্রথমে তিন দলের সুপার সিরিজের মাধ্যমে গ্রুপ পর্বের শেষ দল নির্ধারিত হবে। এরপর ১২টি দল দুই গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলবে। দুই গ্রুপের সেরা তিন দল ও দুই গ্রুপের চতুর্থ স্থানে থাকা দলগুলির মধ্যে ভাল ফল করা একটি দল যাবে সুপার সেভেন পর্বে। সেখান থেকে সেরা চার দল সেমিফাইনালে উঠবে।
ভারতের গ্রুপে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, জ়িম্বাবোয়ে ও একটি কোয়ালিফায়ার দল। ৭ অক্টোবর কেপ টাউনে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে ভারতের গ্রুপ পর্বের অভিযান শুরু হবে। এরপর ১০ অক্টোবর জোহানেসবার্গে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলবে ভারত। ১৪ অক্টোবর আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ও ১৭ অক্টোবর একটি কোয়ালিফায়ার দলের বিরুদ্ধে তারা মাঠে নামবে। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ২৪ অক্টোবর ভিক্টোরিয়া ফলসের মসী-ওয়া-তুনিয়া স্টেডিয়ামে জিম্বাবোয়ের মুখোমুখি হবে ভারত। এই বিশ্বকাপ সূচী সামনে আসার পর ভারতীয় ক্রিকেটে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি আরও গতি পাবে। বিশেষ করে শুভমনের নেতৃত্বে দল কীভাবে নিজেদের পরিকল্পনা সাজায়, তা নিয়ে আগ্রহ থাকবে। তাঁর নিজের কথাতেই বোঝা যাচ্ছে, ২০২৩ সালের ফাইনালের অভিজ্ঞতা তিনি ভুলে যেতে চাইছেন না। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই পরবর্তী বিশ্বকাপের জন্য শিক্ষা নিতে চান।

কোহলি-রোহিতের অভিজ্ঞতা এবং শুভমনের নেতৃত্ব এই সমন্বয়ই আগামী বিশ্বকাপের আগে ভারতীয় দলের অন্যতম আলোচনার বিষয়। কোহলি ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, ২০২৭ বিশ্বকাপ তাঁর শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে। ফলে তাঁর পাশাপাশি রোহিতের অভিজ্ঞতাকেও কাজে লাগিয়ে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব শুভমনের কাঁধে। বিশ্বকাপের এখনও সময় রয়েছে। তার আগে এক দিনের ক্রিকেটে একাধিক সিরিজ খেলবে ভারত। সেই ম্যাচগুলিই দলের সমন্বয়, ক্রিকেটারদের ভূমিকা আর নেতৃত্বের পরিকল্পনা আরও গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেবে। শুভমনের সামনে তাই শুধু অধিনায়ক হিসাবে নিজের জায়গা তৈরি করার বিষয় নেই, একইভাবে ২০২৭ বিশ্বকাপের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ দলকে প্রস্তুত করার দায়িত্বও রয়েছে। তেমনি নিজের র্যাঙ্কিং নিয়ে না ভেবে দলকে জেতানোর উপর জোর দেওয়ার কথা বলেছেন শুভমন। তাঁর সামনে তাই ব্যক্তিগত মাইলফলকের পাশাপাশি আরও বড় লক্ষ্য, বিশ্বকাপের মঞ্চে ভারতকে সাফল্য এনে দেওয়া। ২০২৩ সালের ফাইনালে যে ট্রফি হাতছাড়া হয়েছিল, এবার দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবোয়ে ও নামিবিয়ার মাটিতে সেই আক্ষেপ কাটানোর সুযোগ পাবে ভারত। আর সেই অভিযানের নেতৃত্ব দেবেন ভারতের তরুণ অধিনায়ক শুভমন গিল।
সব ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Rohit Sharma 12000 ODI runs, India vs West Indies ODI | ১২ হাজারের মাইলস্টোন ছুঁয়ে রোহিতের নতুন লক্ষ্য, ২০২৭ বিশ্বকাপ নিয়ে কী বললেন ‘হিটম্যান’?




