সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ২০২৭ সালের এক দিনের বিশ্বকাপ (ICC Cricket World Cup 2027) এখনও বেশ কিছুটা দূরে। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট দলের (Indian Cricket Team) পরিকল্পনায় ইতিমধ্যেই ঢুকে পড়েছে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি। আর সেই প্রস্তুতিতে আর বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জায়গা রাখতে চাইছেন না ভারতীয় এক দিনের দলের অধিনায়ক শুভমন গিল (Shubman Gill)। তাঁর লক্ষ্য এখন সম্ভাব্য সেরা দলকে যত দ্রুত সম্ভব একসঙ্গে মাঠে নামানো। বিশেষ করে জোরে বোলিং আক্রমণের প্রধান অস্ত্রদের একসঙ্গে পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে তাঁর। চোট এবং ঠাসা আন্তর্জাতিক সূচির কারণে সেই পরিকল্পনাই বার বার ধাক্কা খাচ্ছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের (West Indies) বিরুদ্ধে একদিনের সিরিজ শেষ হওয়ার পর দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মুখ খুলেছেন শুভমন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, বিশ্বকাপের মতো বড় প্রতিযোগিতার আগে দলের মূল কাঠামো তৈরি করে ফেলার প্রয়োজনীয়তা। তাঁর মতে, এখন আর প্রতিটি সিরিজ়ে নতুন নতুন ক্রিকেটারকে দেখে নেওয়ার সময় নেই। বরং যাঁদের নিয়ে বিশ্বকাপের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তাঁদেরই ধারাবাহিক ভাবে ম্যাচের পরিস্থিতির মধ্যে তৈরি করা দরকার।
চোটের সমস্যা ভারতীয় দলের জন্য নতুন নয়। গত কয়েকটি সিরিজ়েই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটারকে চোটের কারণে বাইরে থাকতে হয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সূচি। ফলে একসঙ্গে পছন্দের প্রথম একাদশ মাঠে নামানোর সুযোগ পাচ্ছে না ভারত। শুভমনের কাছে সবচেয়ে বড় সমস্যা অবশ্য জোরে বোলিং বিভাগ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেসারদের একই সময়ে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ বিশ্বকাপের আগে তাঁদের সঙ্গে নিয়ে ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতাই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তাই নতুন করে পরীক্ষা চালানোর প্রশ্ন উঠতেই সেই সম্ভাবনা কার্যত উড়িয়ে দিয়েছেন ভারত অধিনায়ক। তাঁর বক্তব্য, ‘সত্যি বলতে আমি আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পক্ষে নই। আমাদের হাতে সেই সময় নেই।’ শুভমনের পরিকল্পনা হল, যে ১১ জনকে নিয়ে বিশ্বকাপের ম্যাচে মাঠে নামার কথা ভাবা হচ্ছে, তাঁদের নিয়েই আগামী সিরিজ়গুলিতে ধারাবাহিক ভাবে খেলার চেষ্টা করা। তাঁর মতে, বিশ্বকাপের জন্য আলাদা করে শেষ মুহূর্তে দল গড়ার বদলে এখন থেকেই সম্ভাব্য মূল দলকে একসঙ্গে খেলার অভ্যাস করাতে হবে।
ভারতের পেস আক্রমণের দিকে তাকালে শুভমনের উদ্বেগের কারণও বোঝা যায়। জসপ্রীত বুমরাহ (Jasprit Bumrah), মহম্মদ শামি (Mohammed Shami) ও প্রসিদ্ধ কৃষ্ণকে (Prasidh Krishna) কেন্দ্র করে দলের পেস বোলিংয়ের পরিকল্পনা করা হলেও তিন জনকে সব সময় একসঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে না। চোট, বিশ্রাম ও সূচীর চাপের কারণে বোলিং কম্বিনেশন বার বার বদলাতে হচ্ছে। ফলে বিশ্বকাপের মতো দীর্ঘ প্রতিযোগিতার আগে মাঠে প্রয়োজনীয় বোঝাপড়া তৈরির সুযোগ কমছে। গত দু’টি বিশ্বকাপে ভারতের পেস আক্রমণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন মহম্মদ শামি ও ভুবনেশ্বর কুমার (Bhuvneshwar Kumar)। বর্তমান পরিকল্পনায় তাঁদের জায়গা নেই। ফলে নতুন প্রজন্মের বোলারদের উপরও দায়িত্ব বাড়ছে। কিন্তু তরুণ পেসারদের এখনও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিয়মিত বড় দায়িত্ব সামলানোর অভিজ্ঞতা তৈরি হয়নি। সেই জায়গাটিই ভারতীয় শিবিরের অন্যতম চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুভমনের উদ্বেগ শুধু খেলোয়াড় পাওয়ার সমস্যা নিয়ে নয়। মাঠে দলের বোলিংয়ের কার্যকারিতা নিয়েও তাঁর ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ইনিংসের শুরু ও শেষের দিকে ভারত প্রত্যাশা অনুযায়ী বোলিং করতে পারছে না বলে মনে করছেন অধিনায়ক। পাওয়ার প্লেতে দ্রুত উইকেট না এলে পরের দিকে ব্যাটিং দলকে চাপে রাখা কঠিন হয়ে যায়। আবার মাঝের ওভারগুলিতে উইকেট তুলে নিতে না পারলে রান আটকানোও কঠিন হয়ে পড়ে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ম্যাচে সেই সমস্যার উদাহরণও পাওয়া গিয়েছে। শুরুতেই ভারতীয় দল দু’টি উইকেট হারিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের ব্যাটাররা বড় জুটি তৈরি করে রান তুলেছেন। ভারতও পাল্টা ৩৫০-এর বেশি রান করেছিল। অর্থাৎ ব্যাটিং বিভাগ বড় রান করার ক্ষমতা দেখালেও বোলিংয়ে প্রয়োজনীয় সময় উইকেট তুলে নিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার জায়গায় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। শুভমনের মতে, এই সমস্যার সমাধান বিশ্বকাপের আগে করতেই হবে। এর পাশাপাশি ভারতীয় দলের আট নম্বর ব্যাটিং জায়গাটিও অধিনায়কের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এক দিনের ক্রিকেটে শেষের দিকে এমন একজন ক্রিকেটার প্রয়োজন, যিনি কার্যকর ভাবে কয়েক ওভার বল করার পাশাপাশি ব্যাট হাতেও দলের রান বাড়াতে পারবেন। এই জায়গায় অনশুল কম্বোজ (Anshul Kamboj) ও আকিব নবিকে (Aqib Nabi) নিয়ে ভাবছে ভারতীয় দল।
দুই ক্রিকেটারের মধ্যে কাউকে এখনই চূড়ান্ত করে ফেলতে চাইছেন না শুভমন। তাঁর মতে, দু’জনেরই আলাদা ধরনের দক্ষতা রয়েছে। অনশুল আট নম্বরে ব্যাট করতে পারেন ও বল হাতেও দলের কাজে লাগতে পারেন। অন্যদিকে আকিবের ব্যাটিং দক্ষতাও নজরে রাখার মতো। তাই শেষ পর্যন্ত কে বিশ্বকাপের পরিকল্পনায় জায়গা করে নেবেন, তা নির্ভর করবে চাপের পরিস্থিতিতে তাঁদের পারফরম্যান্সের উপর। সাম্প্রতিক ম্যাচগুলিতে দুই ক্রিকেটারের বোলিং নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রান দেওয়ার পরিমাণ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তরুণদের এখনই বাদ দেওয়ার পক্ষে নন ভারত অধিনায়ক। তাঁদের আরও সময় দেওয়ার পক্ষেই তিনি মত দিয়েছেন। শুভমনের বক্তব্য, ‘দলে এলাম আর দারুণ বল করলাম, এটা এতটাও সহজ নয়।’ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শুরুতেই প্রত্যাশা পূরণ করা কঠিন হতে পারে। তাই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী সুযোগে নিজেদের উন্নত করার সুযোগ তাঁদের দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করছেন।
বিশ্বকাপের কথা মাথায় রেখে ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে জোরে বোলিং বিভাগ। ২০২৭ সালের বিশ্বকাপের আয়োজক দেশগুলির মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা (South Africa) রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার পিচ ও পরিবেশে পেসারদের ভূমিকা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। নতুন বলের সুইং, অতিরিক্ত বাউন্স এবং গতি কাজে লাগাতে পারলে ম্যাচের শুরুতেই প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলা যায়। ফলে ভারতীয় দলের পেস আক্রমণের প্রধান ক্রিকেটারদের সুস্থ রাখা ও তাঁদের ধারাবাহিক ভাবে একসঙ্গে খেলানো এখন বড় লক্ষ্য। জসপ্রীত বুমরাহর মতো বিশ্বের অন্যতম সেরা পেসারকে নিয়ে তাই আলাদা করে পরিকল্পনা করতে হয়। তাঁর উপর অতিরিক্ত চাপ না দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একই ভাবে হার্দিক পাণ্ড্য (Hardik Pandya) -এর মতো অলরাউন্ডারের চোটও দলের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। হর্ষিত রানা (Harshit Rana)-সহ তরুণ পেসারদেরও ধীরে ধীরে বড় দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয়, বিশ্বকাপের আগে ভারত কতটা সময় পাবে নিজেদের প্রথম পছন্দের দলকে একসঙ্গে মাঠে নামানোর। একের পর এক সিরিজ়, খেলোয়াড়দের ওয়ার্কলোড, চোট এবং বিশ্রামের প্রয়োজন, সব কিছু সামলে সেই সুযোগ তৈরি করাই এখন চ্যালেঞ্জ। শুভমন তাই পরীক্ষা কমিয়ে মূল দলকে বেশি সময় দেওয়ার পক্ষে।
অধিনায়কের বক্তব্যে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে উঠেছে, বিশ্বকাপের প্রস্তুতি এখন আর দূরের পরিকল্পনা নয়। দলের সম্ভাব্য সেরা একাদশ নির্ধারণ করে তাঁদের ম্যাচের মধ্যে যত বেশি সম্ভব একসঙ্গে খেলানোই এখন লক্ষ্য। ব্যাটিং বিভাগে ভারতের গভীরতা থাকলেও বোলিং, বিশেষ করে পেস আক্রমণের ধারাবাহিকতা নিয়ে কাজ করতে হবে। চোটের সমস্যা কাটিয়ে বুমরাহ, শামি, প্রসিদ্ধদের মতো বোলারদের একসঙ্গে পাওয়া গেলে সেই ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হতে পারে। তবে তার জন্য অপেক্ষা না করে বিকল্প ক্রিকেটারদেরও প্রস্তুত রাখতে চাইছে ভারতীয় দল। অনশুল কম্বোজ, আকিব নবিদের মতো ক্রিকেটারদের সুযোগ দিয়ে চাপের পরিস্থিতিতে তাঁদের সামর্থ্য যাচাই করা হচ্ছে। শুভমনের কাছে এখন মূল প্রশ্ন হল, কারা বিশ্বকাপের মঞ্চে দায়িত্ব সামলানোর মতো প্রস্তুত হয়ে উঠতে পারবেন।
ফলে আগামী কয়েকটি সিরিজ ভারতীয় দলের জন্য শুধু দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট নয়, বিশ্বকাপের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। শুভমন গিলের নেতৃত্বে ভারত এখন সম্ভাব্য সেরা একাদশকে যত দ্রুত সম্ভব স্থির করতে চাইছে। আর সেই পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি বড় লক্ষ্য, চোটের ধাক্কা সামলে শক্তিশালী পেস আক্রমণ তৈরি করা এবং বিশ্বকাপের আগে দলকে যতটা সম্ভব স্থির কাঠামোয় নিয়ে যাওয়া।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Gobinda – Sunita Ahuja : গোবিন্দা ও সুনীতার চার দশকের দাম্পত্যে ফাটল!




