মেধা পাল, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : কলকাতার একটি শান্ত ফ্ল্যাটে বসে জীবনের নতুন পর্বের কথা বললেন সুনীতা আহুজা (Sunita Ahuja)। চার দশকের দাম্পত্য, দুই সন্তান, স্বামী গোবিন্দা (Govinda) -এর সঙ্গে দীর্ঘ পথচলা, পারিবারিক টানাপোড়েন, আধ্যাত্মিকতার দিকে ঝোঁক ও ফের নিজের কর্মজীবনে ফিরতে চাওয়ার ইচ্ছা ইত্যাদি সব মিলিয়ে তাঁর কথায় উঠে এল একজন নারীর বদলে যাওয়ার গল্প। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মূলত ‘গোবিন্দার স্ত্রী’ পরিচয়েই পরিচিত ছিলেন। এখন তাঁর নিজের কথাতেই সেই পরিচয়ের বাইরে বেরিয়ে ‘সুনীতা’ হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা ধরা পড়ল একটি বিশেষ সংবাদমাধ্যম মাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে। দেড় বছর পর কলকাতার বাইপাস লাগোয়া নিজের ফ্ল্যাটে ফিরেছেন সুনীতা। দরজা খুলেছেন নিজেই। বাড়ির সাজসজ্জায় রয়েছে বাঙালিয়ানার ছোঁয়া, রয়েছে দুর্গার মূর্তি, সাইবাবার উপস্থিতি, সন্তানদের ছবি ও দাম্পত্য জীবনের নানা স্মৃতি। এই বাড়িটি মূলত তাঁর মায়ের জন্য কেনা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তিনি। কলকাতার সঙ্গে তাঁর পারিবারিক যোগও দীর্ঘদিনের। একসময় ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে তাঁদের পরিবারের বাড়ি ছিল। তাঁর বাবা চলচ্চিত্র পরিবেশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে মায়ের সঙ্গে মাসিও কলকাতায় থেকেছেন।

কলকাতা তাঁর কাছে শুধু একটি শহর নয়, মানসিক শান্তির জায়গা। মুম্বাইয়ের ব্যস্ততার মধ্যে ক্লান্ত হয়ে পড়লে এই শহরে এসে সময় কাটাতে ভালবাসেন বলে জানিয়েছেন সুনীতা। তাঁর কথায়, ‘মুম্বইয়ে যখনই ক্লান্ত হয়ে যাই, কলকাতায় এসে আরাম করি। এখানকার মানুষ খুব মিষ্টি। কলকাতা মা কালীর শহর, আর আমি নিজে মা কালীর ভক্ত।’ মাসি আর নেই, কিন্তু তাঁর স্মৃতি ধরে রেখেই ফ্ল্যাটটি রেখে দিয়েছেন সুনীতা। এই বাড়ির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলির একটি তাঁর ছোট্ট মন্দির। আধ্যাত্মিকতা এখন তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাইবাবা এবং দুর্গার মূর্তি রাখা রয়েছে সেখানে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ঈশ্বরবিশ্বাস আরও গভীর হয়েছে বলে জানান তিনি। সুনীতার কথায়, ‘সোনা, হিরে, মোতির থেকেও ঈশ্বর আমার কাছে বেশি। একটা বয়সের পরে আধ্যাত্মিকতা খুব জরুরি।’
প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন তিনি। তাঁর দাবি, সকাল চারটে নাগাদ উঠে ধ্যান করেন। সূর্যোদয়ের আগের সময়টিকে তিনি আধ্যাত্মিক চর্চার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। জীবনের নানা ওঠাপড়ার মধ্যেও ঈশ্বরের উপর ভরসা রাখাই তাঁর মানসিক শক্তির অন্যতম জায়গা। তাঁর কথায়, মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজের কাজের হিসাব নিয়েই ঈশ্বরের কাছে ফিরে যায়। তবে আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি এখন নিজের জীবন নিয়েও নতুন করে ভাবছেন সুনীতা। দীর্ঘ বিরতির পরে ফের অভিনয় এবং বিনোদন জগতে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তিনি। শুধু মুম্বই নয়, কলকাতা, হায়দরাবাদ, তামিল এবং তেলুগু বিনোদন জগতেও কাজ করতে চান তিনি। এর আগে ‘লক আপ’ (Lock Upp)-এর মতো অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মুম্বইয়েও কাজ করেছেন। এবার কাজের পরিধি আরও বাড়াতে চান। সুনীতার এই নতুন করে কাজে ফেরার ইচ্ছার পিছনে রয়েছে তাঁর জীবনের পুরনো একটি দিক। খুব অল্প বয়সেই তাঁর বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। তাঁর কথায়, ১৫ বছর বয়সে গোবিন্দার সঙ্গে আংটি বদল হয় এবং ১৮ বছর বয়সে বিয়ে। ফলে পড়াশোনা ও কর্মজীবন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাননি। সেই সময় পরিবারের পরামর্শেই সংসারকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।
তিনি জানান, গোবিন্দার সঙ্গে ‘তান বদন’ (Tan-Badan) ছবিতে কাজ করার প্রস্তাবও এসেছিল। কিন্তু সেই সময় তিনি অভিনয়ে আসেননি। কারণ তাঁর মা চেয়েছিলেন, তিনি সংসারে মন দিন। ছোটবেলা থেকে মাকে সংসার করতে দেখেই বড় হয়েছেন সুনীতা। তাই সেই জীবনকেই স্বাভাবিক পথ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। এখন অবশ্য সন্তানরা বড় হয়ে গিয়েছেন। ফলে নিজের ইচ্ছার দিকে তাকানোর সময় এসেছে বলেই তিনি মনে করছেন। সুনীতার কথায়, ‘বয়স তো শুধু একটা সংখ্যা। এখন আমার ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে। তাই নিজের জন্যও কিছু করতে চাই।’ তাঁর এই বক্তব্যে দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের পরে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করার ইচ্ছা প্রকাশ পেয়েছে। নারীদের উদ্দেশ্যেও তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তাঁর মতে, জীবনে নিজের পায়ে দাঁড়ানো প্রত্যেক নারীর জন্য জরুরি। শুধু স্বামী বা কোনও পুরুষের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে থাকা উচিত নয়। নিজের প্রতি ভালবাসা ও নিজের পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর কথায়, ‘নিজেকে ভালবাসুন। নিজের পায়ে দাঁড়ান। পুরুষের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হবেন না।’
নিজের জীবন প্রসঙ্গে সুনীতা বলেন, বহু বছর ধরে তিনি গোবিন্দের স্ত্রী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। এখন তিনি নিজের নাম ও পরিচয় নিয়েও ভাবছেন। তাঁর কথায়, ‘আমি এত বছর পরে গোবিন্দের স্ত্রী থেকে সুনীতা হয়েছি।’ এই একটি বাক্যেই যেন তাঁর বর্তমান মানসিক অবস্থার অনেকটা ছবি ধরা পড়ে। খাবারের ক্ষেত্রেও কলকাতার সঙ্গে তাঁর বিশেষ টান রয়েছে। কলকাতায় এসে ফুচকা খাওয়া থেকে শুরু করে বাঙালি রান্নার প্রতি তাঁর ভালবাসার কথাও তিনি জানিয়েছেন। সেদিন তাঁর জন্য তৈরি হচ্ছিল সর্ষে মাছ, ভাপা ইলিশ, পুঁইশাক-ঝিঙের তরকারি। সঙ্গে ছিল সন্দেশ, রসগোল্লা এবং মিষ্টি দই। একসময় স্বামীর জন্য নিজেও রান্না করতেন বলে জানিয়েছেন সুনীতা। গানও তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভজন শুনতে ভালবাসেন তিনি। লতা মঙ্গেশকর (Lata Mangeshkar) এবং আশা ভোঁসলে (Asha Bhosle) -এর গান তাঁর পছন্দের তালিকায় রয়েছে। গানের পাশাপাশি জপ এবং ধ্যান তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অংশ। জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতেও হাসিমুখে থাকার চেষ্টা করেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই কথার সুর বদলে যায়। গোবিন্দা তাঁর বান্ধবী কোমল রানিকে (Komal Rani) ঘিরে যে আলোচনা চলছে, সেই বিষয়ে সরাসরি কোনও মন্তব্য করতে চাননি সুনীতা। তিনি জানান, স্বামীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তিনি কথা বলতে চান না। বরং নিজের অনুভূতি নিয়েই কথা বলতে চান। তাঁর বক্তব্য, ‘আমার গোবিন্দাকে নিয়ে কিছু বলার নেই। ওঁর জীবন নিয়েও কিছু বলার নেই। আমি শুধু সুনীতার বিষয়ে কথা বলব।’ তবে এরপরই নিজের কষ্টের কথা তিনি জানান। তাঁর অভিযোগ, কেউ তাঁকে কাঁদালে বা তাঁর সংসার ভাঙার পরিস্থিতি তৈরি করলে তিনি বিষয়টি ঈশ্বরের হাতে ছেড়ে দেন। তাঁর কথায়, ‘যিনি আমাকে কাঁদাচ্ছেন, যিনি আমার সংসার ভাঙছেন, ভগবান তাঁকে দেখে নেবেন।’
চার দশকের সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণও হয়ে পড়েন সুনীতা। ১৫ বছর বয়সে আংটি বদল, ১৮ বছরে বিয়ে এবং ১৯ বছর বয়সে মা হওয়ার কথা স্মরণ করেন তিনি। তাঁর দাবি, জীবনের কঠিন সময়গুলিতে গোবিন্দের সঙ্গে একসঙ্গেই লড়াই করেছেন। তাই বর্তমান পরিস্থিতি তাঁর কাছে সহজ নয়। তবে একই সঙ্গে স্বামীর জন্য শুভকামনাও জানিয়েছেন তিনি। সুনীতার কথায়, ‘এক হাতে তো তালি বাজে না।’ কোথায় কে সুখী, তা নিয়ে নিজের অবস্থান চাপিয়ে দিতে চান না তিনি। গোবিন্দা যেখানে ভাল থাকবেন, সেখানেই যেন ভাল থাকেন, এমন কথাই বলেছেন সুনীতা। একই সঙ্গে নিজের দীর্ঘ দাম্পত্যের স্মৃতির কথাও তিনি তুলে ধরেছেন। সন্তানদের প্রসঙ্গ উঠলে অবশ্য তাঁর আবেগ আরও বেড়ে যায়। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলের সঙ্গে সম্প্রতি একটি ছবিতে কাজ করেছেন সুনীতা। ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি যথেষ্ট আশাবাদী। বাবার সঙ্গে সন্তানদের সম্পর্ক নষ্ট হোক, এমনটা কখনও চান না বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ‘আমি বাচ্চাদের কখনও বলি না বাবাকে ছেড়ে দাও। ওদের বাবা গোবিন্দ।’
ছেলের সাফল্যের জন্য মায়ের প্রার্থনাও রয়েছে। ছেলে কঠোর পরিশ্রম করেছে বলে জানিয়েছেন সুনীতা। তাঁর আশা, ছেলের ছবি সফল হবে এবং অভিনয়জগতে সে নিজের জায়গা তৈরি করবে। সন্তানদের নিজেদের মতো করে জীবন বেছে নেওয়ার তিনি সুযোগ দিতে চান। সম্প্রতি তাঁকে আদালতের বাইরে দেখা যাওয়ার পর গোবিন্দকে বিচ্ছেদের আইনি নোটিস পাঠানোর খবর ছড়িয়েছিল। সেই প্রসঙ্গে সুনীতা বিরক্তি প্রকাশ করে জানান, আদালতে যাওয়া মানেই বিচ্ছেদের মামলা করা নয়। সম্পত্তি সন্তানদের নামে করার মতো বিষয়েও আদালতে যেতে হতে পারে। তাই তাঁকে ঘিরে ছড়ানো প্রতিটি খবরকে সত্যি ধরে নেওয়া ঠিক নয় বলেই তাঁর বক্তব্য। এত ব্যক্তিগত টানাপোড়েনের মধ্যেও নিজেকে হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করছেন সুনীতা। তাঁর বক্তব্য, জীবন একটাই। তাই যতটা সম্ভব নিজের জন্য বাঁচতে হবে, আনন্দ করতে হবে এবং নিজের পরিচয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে নিয়ে নানা মন্তব্য বা ট্রোলিং হলেও সেগুলিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে চান না।
নিজের বয়স নিয়েও তাঁর কোনও আক্ষেপ নেই। ৫৬ বছর বয়সেও কাজ করার ইচ্ছা তাঁর আগের মতোই রয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পরে এখনই নিজের জন্য নতুন করে কাজের জায়গা তৈরি করতে চান। তাঁর কথায়, ‘আমার মতো বয়সের অনেকেই ভাবেন, এখন আর কাজ করে কী হবে। কিন্তু আমি কাজ করতে চাই।’ সাক্ষাৎকারের শেষে নিজের প্রিয় শিল্পী মীনা কুমারীর (Meena Kumari) কথা বলেন সুনীতা। গোবিন্দকে কোনও গান উৎসর্গ করতে বলা হলে তিনি সরাসরি সেই পথে হাঁটেননি। বরং নিজের জন্য গান বেছে নেন। ‘পাকিজ়া’ (Pakeezah) -এর একটি গান গেয়ে তিনি শোনান। সেই মুহূর্তটিও যেন তাঁর বর্তমান জীবনের সঙ্গে মিশে গেল, দীর্ঘ সম্পর্কের স্মৃতি একদিকে, আর অন্যদিকে নিজের পরিচয়ে নতুন করে পথ চলার ইচ্ছা। চার দশকের সংসারের পর সুনীতার কথায় তাই শুধু দাম্পত্যের অভিমান নেই। রয়েছে নিজের জন্য নতুন করে দাঁড়ানোর সংকল্পও। স্বামীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তিনি যতটা সম্ভব নীরব থাকতে চাইছেন, ততটাই নিজের কাজ, সন্তান, আধ্যাত্মিকতা ও নিজের পরিচয় নিয়ে সামনে এগোতে চাইছেন। তাঁর বক্তব্যে বারবার ফিরে এসেছে একটি কথাই, জীবন থেমে থাকে না। আর ৫৬ বছর বয়সে দাঁড়িয়েও তিনি মনে করছেন, নিজের জন্য নতুন করে শুরু করার সময় এখনও শেষ হয়ে যায়নি।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India Asian Games 2026 | India Four Gold Medals, Asian Games Medal Tally: এশিয়ান গেমসে ভারতের সোনার সকাল, চিনকে হারিয়ে পুরুষদের তিরন্দাজিতেও সোনা




