সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : এশিয়ান গেমসে (Asian Games) পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্রিকেট ফাইনালে জয় পেয়েছে ভারত (India)। হাতে উঠেছে সোনার পদক। কিন্তু সেই জয়কে একেবারে একতরফা লড়াই হিসেবে দেখছেন না ভারতীয় দলের ক্রিকেটার সঞ্জু স্যামসন (Sanju Samson)। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে ফাইনালে পাকিস্তানের কঠিন লড়াইয়ের কথা। ২১১ রান তোলার পরেও ভারতকে শেষ পর্যন্ত মাত্র ১৯ রানে জিততে হয়েছে। ফলে সঞ্জুর চোখে এই জয় এসেছে যথেষ্ট পরিশ্রম এবং চাপ সামলে। তাঁর এই মূল্যায়ন ভারতীয় বোর্ডের সভাপতি মিঠুনের মন্তব্যের সঙ্গে কার্যত ভিন্ন সুর তৈরি করেছে। এশিয়ান গেমসের পুরুষদের ক্রিকেটের ফাইনালে প্রথমে ব্যাট করে বড় রান তুলেছিল ভারত। ২০ ওভারের ক্রিকেটে ২১১ রান করার পরে অনেকেই মনে করেছিলেন, পাকিস্তানের সামনে লক্ষ্যটা যথেষ্ট কঠিন হবে। কিন্তু মাঠে নামার পরে পাকিস্তানের ব্যাটারেরা ভারতীয় বোলারদের বিরুদ্ধে পাল্টা লড়াই গড়ে তোলেন। শেষ পর্যন্ত ভারত জয় পেলেও ব্যবধান দাঁড়ায় ১৯ রান। অর্থাৎ, সোনার পদকের ম্যাচে শেষ পর্যন্ত লড়াই যথেষ্ট জমেছিল।
সঞ্জুর বক্তব্যে সেই লড়াইয়ের ছবিই উঠে এসেছে। তাঁর মতে, এশিয়ান গেমসের সোনা ভারতীয় ক্রিকেটারদের হাতে কেউ সহজে তুলে দেয়নি। প্রতিটি ধাপে তাঁদের কঠিন পরিশ্রম করতে হয়েছে। বিশেষ করে ফাইনালে পাকিস্তানের প্রতিরোধ জয়কে আরও মূল্যবান করে তুলেছে বলে মনে করেন তিনি। সঞ্জু বলেন, ‘কেউ থালায় সাজিয়ে সোনা এনে দেয়নি। আমাদের অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। ফাইনালে কঠিন লড়াই হয়েছিল। আর সেই কারণেই এই জয় আরও বেশি আনন্দ দিয়েছে।’ তাঁর কথায় বোঝা যায়, প্রতিপক্ষকে খাটো করে দেখার পরিবর্তে ম্যাচের প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকটিকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
এশিয়ান গেমসের জন্য ভারত যে দল পাঠিয়েছিল, তাতে বেশ কয়েক জন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার ছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘদিন খেলা ক্রিকেটারদের উপস্থিতি দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছিল বলেই মনে করেন সঞ্জু। তাঁর মতে, চাপের ম্যাচে অভিজ্ঞতার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি বোঝা যায়। ফাইনালের মতো পরিস্থিতিতে মাঠের বাইরের প্রস্তুতি এবং দলের অভ্যন্তরীণ মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সঞ্জুর কথায়, ‘আমাদের দলে অনেক অভিজ্ঞ ক্রিকেটার ছিলেন। এই ধরনের ম্যাচেই সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগে। আমরা নিজেদের সব সময় উজ্জীবিত রেখেছি। খেলা না থাকলেও অনুশীলনে কোনও খামতি রাখিনি। তার ফল আমরা পেয়েছি।’
ভারতের সেরা দল এশিয়ান গেমসে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও ইতিবাচক মত দিয়েছেন সঞ্জু। তাঁর মতে, বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অভিজ্ঞ এবং শক্তিশালী দল পাঠানোর সিদ্ধান্তের সুফল ফাইনালে দেখা গিয়েছে। পাকিস্তানের মতো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচে সেই সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা আরও ভালোভাবে বোঝা গিয়েছে বলে তাঁর মত। সঞ্জু বলেন, ‘সেরা দল নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত কাজে লেগেছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ফাইনালে কী হয়েছে, সবাই দেখেছে। ম্যাচটি খুব ভাল হয়েছে।’ তাঁর এই বক্তব্যে ভারতীয় দলের শক্তির পাশাপাশি প্রতিপক্ষের পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিও রয়েছে। উল্লেখ্য, ফাইনালের প্রথম ইনিংসে ভারতের ২০০-র বেশি রান দেখে দলের ক্রিকেটারদের একাংশও হয়তো ভেবেছিলেন, দ্বিতীয় ইনিংসে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। কিন্তু পাকিস্তানের ব্যাটিং সেই ধারণাকে অনেকটাই বদলে দেয়। ভারতীয় বোলারদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের ব্যাটারেরা রান তুলতে থাকেন এবং ম্যাচকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যান। সেই কারণে ১৯ রানের ব্যবধানে জয় এলেও ম্যাচের উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত বজায় ছিল।
এই প্রসঙ্গে সঞ্জুর বক্তব্য, ‘আমরা প্রথম ইনিংসে ২০০-র বেশি রান করেছিলাম। ভেবেছিলাম পাকিস্তানের ব্যাট করতে সমস্যা হবে। কিন্তু ওরা খুব ভাল ব্যাট করেছে। লড়াই করেছে। এমন ফাইনালই সকলে দেখতে চায়।’ তাঁর এই মন্তব্যে পাকিস্তানের ব্যাটিং পারফরম্যান্সের প্রশংসা যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে ফাইনালের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক চরিত্রের স্বীকৃতি। ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচে দুই দেশের রাজনৈতিক ও ক্রীড়া ইতিহাসের কারণে বাড়তি আবেগ কাজ করে। সেই কারণে এশিয়ান গেমসের ফাইনালও সাধারণ ক্রিকেট ম্যাচের তুলনায় বেশি আলোচনায় এসেছে। তার মধ্যে যখন সোনার পদক নির্ধারণের ম্যাচে দুই দল মুখোমুখি, তখন প্রতিটি মুহূর্তের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। ভারত শেষ পর্যন্ত জয় পেলেও পাকিস্তানের লড়াই ম্যাচের উত্তেজনা ধরে রেখেছিল। এই জায়গাতেই ভারতীয় বোর্ডের সভাপতি মিঠুনের মন্তব্যের সঙ্গে সঞ্জুর বক্তব্যের পার্থক্য নজরে এসেছে। ভারত সোনা জেতার পরে মিঠুন দাবি করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারতের দাপট এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে পাকিস্তানকে তিনি আর ভারতের প্রকৃত প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছেন না। তাঁর বক্তব্যে ভারতীয় দলের আধিপত্যের দিকটিই সামনে এসেছে।
মিঠুন বলেন, ‘ভারত চির-প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে হারিয়েছে। আমি মনে করি পাকিস্তান এখন আমাদের প্রতিপক্ষই নয়। যে ভাবে আমাদের দল চাপ সামলাতে পারে, বিশ্বের অন্য কোনও দেশ তা পারে না।’ অর্থাৎ তাঁর বক্তব্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের সাম্প্রতিক সাফল্য এবং চাপের পরিস্থিতিতে দলের দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সঞ্জুর বক্তব্যে জয় পাওয়ার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের লড়াইও জায়গা পেয়েছে। তিনি মনে করেন, পাকিস্তান যদি ফাইনালে এতটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারত, তা হলে ম্যাচের উত্তেজনাও এতটা থাকত না। তাঁর মতে, কঠিন লড়াইয়ের পরে পাওয়া জয়ই দলের কাছে বেশি তৃপ্তির।
এখানেই এশিয়ান গেমসের ফাইনালকে ঘিরে তৈরি হয়েছে দুই ধরনের মূল্যায়ন। একদিকে রয়েছে ভারতের দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক সাফল্য এবং বড় ম্যাচে চাপ সামলানোর ক্ষমতার কথা। অন্যদিকে রয়েছে নির্দিষ্ট ম্যাচের মাঠের বাস্তবতা, যেখানে ২১১ রান করেও ভারতকে শেষ পর্যন্ত ১৯ রানের ব্যবধানে জিততে হয়েছে। সঞ্জু দ্বিতীয় দিকটিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। উল্লেখ্য, ভারতের ক্রিকেটে পাকিস্তান বরাবরই একটি আলাদা আবেগের প্রতিপক্ষ। দুই দলের দ্বৈরথ ঘিরে দর্শকদের আগ্রহও অন্য যে কোনও ম্যাচের তুলনায় বেশি। তাই প্রতিপক্ষ হিসেবে পাকিস্তানের গুরুত্ব কমে গিয়েছে কি না, সেই বিতর্কের পাশাপাশি এশিয়ান গেমসের ফাইনালের পারফরম্যান্সও আলাদা করে আলোচনায় এসেছে। সঞ্জুর বক্তব্য অবশ্য সেই ম্যাচের ক্রিকেটীয় দিকটিকে সামনে এনেছে। তাঁর কাছে ফাইনালে প্রতিপক্ষ কে ছিল, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল দলকে নিজেদের সেরাটা দিতে হয়েছে কি না। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৯ রানের জয় তাঁর চোখে সহজ সাফল্য নয়। বরং চাপের মধ্যে নিজেদের পরিকল্পনা ধরে রেখে সোনা জেতাটাই বড় অর্জন।
এশিয়ান গেমসে ভারতীয় ক্রিকেট দলের এই সাফল্য তাই শুধু পদক জয়ের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ফাইনালের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভারতের অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের ভূমিকা এবং পাকিস্তানের পাল্টা লড়াই, সবকিছু মিলিয়ে ম্যাচটি ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে আলোচনার জায়গা করে নিয়েছে। বোর্ড সভাপতির মন্তব্য যেখানে ভারতের আধিপত্যের ছবি তুলে ধরেছে, সেখানে সঞ্জু ম্যাচের বাস্তব লড়াইয়ের কথাই সামনে এনেছেন। ফলে সোনা জয়ের পর ভারতীয় ক্রিকেটে এখন একই ম্যাচ নিয়ে দুই ধরনের সুর শোনা যাচ্ছে। বোর্ড সভাপতির বক্তব্যে পাকিস্তানকে প্রতিপক্ষ হিসেবে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা থাকলেও সঞ্জু মাঠের লড়াইকে মূল্য দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা, প্রতিপক্ষকে ছোট করে নয়, কঠিন ম্যাচ জিতেই সাফল্যের মূল্য বাড়ে। এশিয়ান গেমসের ফাইনালে ভারতের ১৯ রানের জয় সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ হয়ে থাকল।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India Asian Games 2026 | India Four Gold Medals, Asian Games Medal Tally: এশিয়ান গেমসে ভারতের সোনার সকাল, চিনকে হারিয়ে পুরুষদের তিরন্দাজিতেও সোনা




