তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ দার্জিলিং : পাহাড়ের রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে চোখে পড়বে এক ঐতিহাসিক ভবন। উঁচু ঘড়ির টাওয়ার, পুরনো স্থাপত্য আর অতীতের নানা স্মৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে দার্জিলিঙের (Darjeeling) ক্যাপিটল হল (Capitol Hall)। একসময় যে ভবনে সিনেমা দেখতে ভিড় জমাতেন স্থানীয় বাসিন্দারা, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই জায়গা হারিয়েছে তার পুরনো ব্যস্ততা। এ বার সেই ঐতিহ্যবাহী ভবনকে নতুন করে সাজিয়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্যাপিটল হলকে মিউজিয়াম ও আর্ট গ্যালারিতে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দার্জিলিঙের ইতিহাস, সংস্কৃতি, চা-শিল্প, টয় ট্রেন ও স্থানীয় শিল্পকলার নানা দিক একই ছাদের নীচে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে। ফলে পর্যটকদের কাছে পাহাড়ের পরিচিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি শহরের অতীত ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার নতুন ঠিকানা হয়ে উঠতে পারে এই শতাব্দীপ্রাচীন ভবন।

দার্জিলিঙের লাডেনলা রোডে (Laden La Road), চৌরস্তার (Chowrasta) কাছাকাছি অবস্থিত ক্যাপিটল হলের ইতিহাস প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি পুরনো। ১৯২১ সালের মে মাসে ভবনটির উদ্বোধন হয়েছিল। সেই সময় থেকেই শহরের সামাজিক ও বিনোদনমূলক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যায় এই স্থাপনা। শুধু একটি ভবন হিসেবে নয়, দার্জিলিঙের বদলে যাওয়া সময়, মানুষের জীবনযাপন এবং শহরের সাংস্কৃতিক পরিসরের সাক্ষী হিসেবেও ক্যাপিটল হলের গুরুত্ব রয়েছে। পাহাড়ের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত বহু মানুষের কাছে ভবনটি অতীতের স্মৃতি বহন করে। সেই স্মৃতিকে সংরক্ষণ করে ভবনটিকে নতুন কাজে ব্যবহার করার পরিকল্পনা নেওয়ায় স্থানীয় ঐতিহ্য রক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ক্যাপিটল হলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য তার প্রায় ৭৫ ফুট উঁচু ঘড়ির টাওয়ার। একসময় শহরের পরিচিত দৃশ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল এই টাওয়ার। চৌরস্তা, নেহরু রোড (Nehru Road) কিংবা লাডেনলা রোড দিয়ে যাতায়াতের সময় দূর থেকেই নজরে পড়ত ঘড়িটি। শহরের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে তার পরিচিতি এমনভাবে জড়িয়ে ছিল যে, অনেকের কাছে সেটি ছিল দার্জিলিঙের অন্যতম পরিচয়চিহ্ন। সময়ের সঙ্গে ভবনের ব্যবহার কমে গেলেও টাওয়ারটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব কমেনি। ২০০৬ সালে দার্জিলিং রোটারি ক্লাব (Darjeeling Rotary Club) ঘড়ির টাওয়ারটির সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে সেই সংস্কারের পরেও গোটা ভবনকে পর্যটন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের উপযোগী করে তোলার কাজ আর এগোয়নি।
একসময় ক্যাপিটল হলের ভিতরে ছিল প্রায় ৬০০ আসনের একটি সিনেমা হল। সেই প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখতে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভিড় জমত। শহরের বিনোদনজগতের সঙ্গে ভবনটির ছিল নিবিড় যোগাযোগ। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে সিনেমা হলটি বন্ধ হয়ে যায়। তার পর থেকে ভবনটির ব্যবহার ও পরিচিতি ধীরে ধীরে কমতে থাকে। যে জায়গা একসময় মানুষের আনাগোনায় মুখর থাকত, সেটি ক্রমে তার পুরনো ভূমিকা হারায়। দীর্ঘদিন ধরে ভবনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকলেও পর্যটকদের জন্য সেটিকে নিয়মিত আকর্ষণ হিসেবে গড়ে তোলার মতো বড় কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ বার মিউজিয়াম ও আর্ট গ্যালারি তৈরির পরিকল্পনা সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটাতে পারে। প্রস্তাবিত প্রকল্পের জন্য দার্জিলিং পৌরসভা (Darjeeling Municipality) একটি বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন বা ডিপিআর (Detailed Project Report) তৈরি করেছে। গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (Gorkhaland Territorial Administration বা GTA) প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেবে বলে জানা গিয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য, সংস্কার ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে আগামী বছরের মধ্যেই ক্যাপিটল হল সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া। যদিও প্রকল্পের প্রতিটি পর্যায়ের নির্দিষ্ট সময়সীমা ও চূড়ান্ত উদ্বোধনের দিনক্ষণ এখনও বিস্তারিতভাবে জানা যায়নি, কিন্তু পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে শহরের ঐতিহ্য সংরক্ষণে নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে। নতুন মিউজিয়ামে দার্জিলিঙের অতীতকে বিভিন্ন দিক থেকে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। শহরের ইতিহাস, স্থানীয় সংস্কৃতি, চা-বাগানের বিকাশ আর দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের (Darjeeling Himalayan Railway) ঐতিহ্যকে প্রদর্শনীর মাধ্যমে দর্শকদের সামনে আনা হবে। পাহাড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিখ্যাত টয় ট্রেন (Toy Train) যাতায়াতের ও দার্জিলিঙের পরিচিতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার ইতিহাস, বিবর্তন আর স্থানীয় মানুষের জীবনে তার ভূমিকা মিউজিয়ামে তুলে ধরা গেলে পর্যটকেরা এই ঐতিহ্য সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে পারবেন। একই সঙ্গে শতাব্দীপ্রাচীন চা-বাগানগুলির ইতিহাস ও চা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত নানা বিষয় প্রদর্শনীর অংশ হতে পারে।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও পুরনো চা-বাগানগুলির কাছ থেকে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় ঐতিহাসিক তথ্য, ছবি, নথি কিংবা প্রদর্শনযোগ্য সামগ্রী সংগ্রহ করা গেলে মিউজিয়ামের উপস্থাপনা আরও সমৃদ্ধ হতে পারে। দার্জিলিঙের চা বিশ্বজুড়ে পরিচিত। সেই চায়ের উৎপাদন, বাণিজ্য, শ্রমিকদের জীবন এবং পাহাড়ি অর্থনীতিতে চা-শিল্পের ভূমিকা তুলে ধরার সুযোগও রয়েছে এই উদ্যোগে। পর্যটকেরা সাধারণত চা-বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করেন, কিন্তু সেই শিল্পের পিছনে থাকা দীর্ঘ ইতিহাস সম্পর্কে জানার সুযোগ সব সময় পান না। নতুন মিউজিয়াম সেই ঘাটতি পূরণে সহায়ক হতে পারে। ক্যাপিটল হলের পরিকল্পনায় স্থানীয় শিল্পীদের জন্য প্রদর্শনীর জায়গা রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। দার্জিলিঙের শিল্পী ও সৃজনশীল ব্যক্তিরা তাঁদের ছবি, শিল্পকর্ম এবং অন্যান্য সৃষ্টিকে দর্শকদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পেতে পারেন। এর ফলে ভবনটি শুধু অতীতের স্মৃতি সংরক্ষণের জায়গা হয়ে থাকবে না, বর্তমানের শিল্পচর্চারও একটি কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। স্থানীয় শিল্পীদের কাজ দেখতে পর্যটকদের আগ্রহ বাড়লে তাঁদের পরিচিতি বিস্তারের পাশাপাশি বিক্রির সুযোগও তৈরি হতে পারে। শিল্প ও পর্যটনের এই সংযোগ পাহাড়ের সাংস্কৃতিক পরিসরকে আরও সমৃদ্ধ করার সম্ভাবনা রাখে। দার্জিলিঙে বেড়াতে আসা অধিকাংশ পর্যটকের ভ্রমণসূচিতে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য, টয় ট্রেন, চা-বাগান ও শহরের পরিচিত দর্শনীয় স্থানগুলি বিশেষ গুরুত্ব পায়। কিন্তু একটি শহরের পরিচয় কেবল তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার স্থাপত্য, ইতিহাস, শিল্প, মানুষের জীবনযাপন এবং সাংস্কৃতিক পরম্পরাও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ক্যাপিটল হল মিউজিয়াম ও আর্ট গ্যালারিতে রূপান্তরিত হলে পর্যটকেরা শহরটিকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে জানার সুযোগ পাবেন। এতে দার্জিলিঙে ঘোরার অভিজ্ঞতা আরও বৈচিত্র্যময় হতে পারে আর পর্যটকেরা শহরে অতিরিক্ত সময় কাটানোর নতুন কারণ খুঁজে পেতে পারেন।
ভবনটির অবস্থানও প্রকল্পের সাফল্যের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। লাডেনলা রোডে এবং চৌরস্তার কাছাকাছি হওয়ায় শহরের কেন্দ্রীয় এলাকা থেকে হেঁটেই ক্যাপিটল হলে পৌঁছনো সম্ভব। ফলে পর্যটকদের জন্য আলাদা করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। সংস্কারের পরে ভবনটির স্থাপত্য, ঘড়ির টাওয়ার ও প্রদর্শনীগুলি একসঙ্গে আকর্ষণ তৈরি করতে পারে। তবে পুরনো স্থাপনার সংস্কারের ক্ষেত্রে মূল স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য বজায় রাখা, ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দর্শকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলার বিষয়গুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। দার্জিলিঙের পর্যটনকে আরও সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে ক্যাপিটল হলের পুনর্ব্যবহার একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ হয়ে উঠতে পারে। পুরনো ভবন ভেঙে নতুন নির্মাণের বদলে ঐতিহাসিক স্থাপনাকে সংরক্ষণ করে নতুন কাজে লাগানো গেলে শহরের ঐতিহ্যও বাঁচবে, আবার নতুন প্রজন্মের কাছেও তার গুরুত্ব পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। মিউজিয়াম ও আর্ট গ্যালারি চালু হলে স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, ইতিহাসপ্রেমী আর পর্যটকদের জন্য তৈরি হবে একটি নতুন সাংস্কৃতিক পরিসর। এখন নজর থাকবে, ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী সংস্কারের কাজ কবে শুরু হয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্যাপিটল হল জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব হয় কি না। অনেক অনেক দিনের অব্যবহারের পর এই ঐতিহাসিক ভবন আবার মানুষের আনাগোনায় মুখর হয়ে উঠলে দার্জিলিঙের পর্যটন মানচিত্রে যুক্ত হবে এক নতুন সাংস্কৃতিক গন্তব্য।
ছবি: প্রতীকী ও সংগৃহীত



