সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার আগে পুলিশি যাচাই নিয়ে কলকাতার আবেদনকারীদের জন্য আসছে বড় পরিবর্তন। আগামী ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে কলকাতা পুলিশ (Kolkata Police) এলাকার নতুন পাসপোর্ট যাচাইয়ের দায়িত্ব আর সংশ্লিষ্ট থানাগুলির হাতে থাকবে না। গোটা প্রক্রিয়ার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে সিকিয়োরিটি কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন বা এসসিও-কে (Security Control Organisation)। এত দিন নতুন পাসপোর্ট এবং পাসপোর্ট নবীকরণের ক্ষেত্রে থানা ও এসসিও মিলিয়ে যাচাইয়ের কাজ সামলানো হত। নতুন ব্যবস্থায় সেই কাঠামো বদলে যাচ্ছে। লালবাজারের (Lalbazar) নির্দেশ অনুযায়ী, ১ অক্টোবর থেকে যে নতুন আবেদনগুলি পুলিশি যাচাইয়ের জন্য আসবে, সেগুলি এসসিও-র আধিকারিকেরা দেখবেন। অন্য দিকে, ইতিমধ্যে থানাগুলিতে জমে থাকা পুরনো আবেদনের ফাইলগুলি নিষ্পত্তির দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট থানার উপরই থাকছে। অর্থাৎ নতুন কাজ আর থানায় জমা হবে না, তা পুরনো বকেয়া কমানোর দিকে জোর দেওয়া হবে। এই বকেয়া ফাইলের কাজ নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রাও দেওয়া হয়েছে।
কলকাতা পুলিশ এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৪২ হাজার পাসপোর্ট যাচাইয়ের আবেদন আটকে রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা এই বিপুল সংখ্যক ফাইলের কারণেই নতুন ব্যবস্থার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে বলে লালবাজার সূত্রে জানা যাচ্ছে। থানার আধিকারিকদের একসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধের তদন্ত এবং পাসপোর্ট যাচাইয়ের দায়িত্ব সামলাতে হওয়ায় সময়ের চাপ তৈরি হচ্ছিল। তার সঙ্গে বিভিন্ন নথির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরের কাছ থেকে রিপোর্ট পেতে সময় লাগায় অনেক আবেদন আরও পিছিয়ে যাচ্ছিল। নতুন নির্দেশে তাই কাজের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার পথে হাঁটল কলকাতা পুলিশ। থানার আধিকারিকদের কাছে নতুন পাসপোর্ট যাচাইয়ের আবেদন না পাঠিয়ে তা সরাসরি এসসিও-র আওতায় আনা হবে। ফলে থানাগুলিতে যে পুরনো ফাইলগুলি ইতিমধ্যে জমে রয়েছে, সেগুলি দ্রুত শেষ করার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন আবেদনের জন্য আলাদা একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা তৈরি হওয়ায় কাজের গতি বাড়ানোর লক্ষ্যও রাখা হয়েছে।
পুলিশের নির্দেশে শুধু বকেয়া ফাইল শেষ করার কথা বলা হয়নি, তার উপর নিয়মিত নজরদারির ব্যবস্থাও করা হয়েছে। থানার অফিসার ইনচার্জ বা ওসি-দের (Officer-in-Charge) ব্যক্তিগত ভাবে বকেয়া পাসপোর্ট যাচাইয়ের কাজের অগ্রগতি দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ কোনও থানায় কতগুলি আবেদন পড়ে রয়েছে, তার মধ্যে কতগুলি যাচাই হয়েছে এবং কতগুলি এখনও বাকি, সেই হিসাবের উপর সরাসরি নজর রাখতে হবে সংশ্লিষ্ট থানার শীর্ষ আধিকারিককে। এর পাশাপাশি বিভাগীয় ডেপুটি কমিশনারদেরও (Deputy Commissioner) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁরা থানাভিত্তিক কাজের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবেন এবং লালবাজারে সাপ্তাহিক রিপোর্ট পাঠাবেন। সপ্তাহের শুরুতে কতগুলি বকেয়া ফাইল ছিল এবং সপ্তাহ শেষে কতগুলি নিষ্পত্তি হল, সেই তথ্য রিপোর্টে উল্লেখ করার নির্দেশ রয়েছে। ফলে নভেম্বর পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে রাখার চেষ্টা করছে কলকাতা পুলিশ।
পাসপোর্ট যাচাইয়ের ক্ষেত্রে পুলিশের কাজ শুধু আবেদনকারীর দেওয়া তথ্য দেখা নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ঠিকানা, পরিচয় এবং জমা দেওয়া নথির সত্যতা যাচাই করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভুয়ো নথি ব্যবহার করে পাসপোর্ট তৈরির অভিযোগ সামনে আসার পরে কলকাতা পুলিশ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আরও কড়া পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন নথি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে সত্যতা যাচাই করার ব্যবস্থাও জোরদার হয়েছে। এর ফলে নিরাপত্তার দিক থেকে যাচাই প্রক্রিয়া আরও বিস্তৃত হলেও কাজ শেষ করতে সময় বেড়েছে বলে পুলিশের একটি অংশ মনে করছে। কলকাতা পুলিশের এসসিও-র সঙ্গে পাসপোর্ট যাচাইয়ের সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। শহরের বাসিন্দাদের পাসপোর্ট সংক্রান্ত পুলিশি অনুসন্ধানের কাজে এই শাখা আগেও যুক্ত ছিল। গত কয়েক বছরে পাসপোর্ট জালিয়াতি সংক্রান্ত তদন্তেও এসসিও-র ভূমিকা সামনে এসেছে। ভুয়ো পরিচয়পত্র বা নথি ব্যবহার করে ভারতীয় পাসপোর্ট পাওয়ার অভিযোগে একাধিক তদন্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পাসপোর্ট যাচাইয়ের কাজ আরও সংগঠিত ভাবে একটি নির্দিষ্ট শাখার হাতে দেওয়ার উদ্যোগকে প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
নতুন ব্যবস্থায় আবেদনকারীদের জন্যও কিছু পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। আগে কোনও আবেদনকারীর পাসপোর্ট যাচাইয়ের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট থানায় গেলে থানার নির্দিষ্ট আধিকারিক সেই কাজটি করতেন। এখন নতুন আবেদন এসসিও-এর অধীনে যাওয়ায় যাচাইয়ের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা তৈরি হবে। এর ফলে কোন আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে, তার নজরদারি আরও এক জায়গা থেকে করা সম্ভব হবে বলে পুলিশের তরফে আশা করা হচ্ছে। তবে পুরনো বকেয়া আবেদনের ক্ষেত্রে আপাতত পরিস্থিতি আলাদা। প্রায় ৪২ হাজার আবেদন ইতিমধ্যেই অপেক্ষমাণ থাকায় আগামী কয়েক সপ্তাহ কলকাতা পুলিশের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ১ অক্টোবর থেকে নতুন ফাইল থানায় না এলেও পুরনো ফাইলের চাপ থেকেই যাচ্ছে। নভেম্বরের মধ্যে সেগুলি শেষ করার নির্দেশ থাকায় থানাগুলিকে প্রতিদিনের অন্যান্য দায়িত্বের পাশাপাশি এই কাজেও নির্দিষ্ট সময় দিতে হবে।
পুলিশ প্রশাসনের যুক্তি, নতুন ও পুরনো আবেদনকে একই জায়গায় না রেখে আলাদা ভাবে পরিচালনা করলে কাজের জট কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। থানাগুলি যদি নতুন ফাইল গ্রহণ না করে শুধু পুরনো আবেদন নিষ্পত্তিতে মন দেয়, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা কাজ দ্রুত কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। অন্য দিকে, এসসিও নতুন আবেদনগুলি শুরু থেকেই হাতে নিলে সেই কাজের জন্য নির্দিষ্ট কর্মী ও সময় বরাদ্দ করা সম্ভব হবে। পাসপোর্ট যাচাইয়ের সময় নিয়ে আবেদনকারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। কারও ক্ষেত্রে দ্রুত প্রক্রিয়া শেষ হলেও কোনও কোনও আবেদন নথি যাচাই বা অন্যান্য প্রশাসনিক কারণে দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে নথি যাচাইয়ের কড়াকড়ি বাড়ায় প্রক্রিয়ার সময়ও কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে। পুলিশের বক্তব্য, নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা বজায় রেখেই যাচাই প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা চলছে।
এখন নজর থাকবে ১ অক্টোবরের পর নতুন ব্যবস্থাটি বাস্তবে কতটা গতি আনে। বিশেষ করে প্রায় ৪২ হাজার বকেয়া আবেদনের মধ্যে নভেম্বরের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কতগুলি ফাইল নিষ্পত্তি করা যায়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সাপ্তাহিক রিপোর্টের মাধ্যমে লালবাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবে বলে প্রশাসনিক নজরদারিও বাড়ছে। কোনও থানায় কাজের গতি কম থাকলে বিভাগীয় স্তর থেকেই সেই পরিস্থিতির দিকে নজর দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফলে কলকাতায় পাসপোর্ট যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এবার দায়িত্বের বড় রদবদল হতে চলেছে। নতুন আবেদন যাবে এসসিও-র হাতে, আর থানাগুলি মন দেবে পুরনো বকেয়া ফাইল শেষ করার কাজে। প্রায় ৪২ হাজার অপেক্ষমাণ আবেদনের চাপ কমানো এবং যাচাইয়ের সময় কমানোই এই প্রশাসনিক পরিবর্তনের প্রধান লক্ষ্য। আগামী কয়েক মাসেই বোঝা যাবে, নতুন কাঠামো পাসপোর্ট যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কতটা কমাতে পারে!
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : 1400 Fire Department Vacancies in West Bengal | CM Suvendu Adhikari : দমকল দফতরে কর্মী ঘাটতি মেটাতে বড় সিদ্ধান্ত, ১৪০০ পদে নিয়োগের ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর




