সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : দুর্গাপুজোর আনন্দ শেষ হতে না হতেই ফের আবহাওয়ার চোখরাঙানি। উৎসবের দিনগুলিতে বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির ভোগান্তি কাটিয়ে যখন স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করেছেন রাজ্যবাসী, তখনই বঙ্গোপসাগরে নতুন করে শক্তিশালী নিম্নচাপ (Bay of Bengal Low Pressure) তৈরির সম্ভাবনা ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে বলে হাওয়া অফিস সূত্রে খবর। আবহাওয়ার সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতি অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে তৈরি হতে পারে একটি নিম্নচাপ অঞ্চল। অনুকূল পরিস্থিতি পেলে সেটি ক্রমশ শক্তি বাড়িয়ে গভীর নিম্নচাপ কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিতে পারে বলে কয়েকটি আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেলে ইঙ্গিত মিলেছে। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে সম্ভাব্য এই আবহাওয়া ব্যবস্থার গতিপথ কোন দিকে মোড় নেয়, তার উপরেই নির্ভর করছে পশ্চিমবঙ্গ-সহ পূর্ব উপকূলের আবহাওয়ার পরবর্তী পরিস্থিতি।
আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের দিকে নজর রাখছে ভারতের মৌসম বিভাগ (India Meteorological Department বা IMD)। প্রাথমিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, থাইল্যান্ড উপসাগর ও সংলগ্ন মায়ানমার অঞ্চলে তৈরি হওয়া একটি ঘূর্ণাবর্ত পশ্চিম দিকে সরে উত্তর আন্দামান সাগর এলাকায় পৌঁছেছে। সেখান থেকে সেটি পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হলে শুক্রবার নাগাদ দক্ষিণ-পূর্ব ও সংলগ্ন মধ্য-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ অঞ্চল তৈরি হওয়ার অনুকূল পরিস্থিতি গড়ে উঠতে পারে। তবে নিম্নচাপ তৈরি হওয়া ও তার পরবর্তী সময়ে সেটি কতটা শক্তিশালী হবে, তা নির্ভর করবে সমুদ্রের উপরিভাগের তাপমাত্রা, বাতাসের গতিপ্রকৃতি, বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা ও অন্যান্য আবহাওয়াগত উপাদানের উপর। কিন্তু, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বঙ্গোপসাগরের সম্ভাব্য নিম্নচাপটি কী শেষ পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হবে? আবহাওয়া পূর্বাভাসের বিভিন্ন মডেলে এই সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ইউরোপীয় মধ্যমেয়াদী আবহাওয়া পূর্বাভাস কেন্দ্র (European Centre for Medium-Range Weather Forecasts বা ECMWF)-এর মডেল অনুযায়ী, আগামী ২৮ অক্টোবরের আশপাশে নিম্নচাপটি আরও ঘনীভূত হয়ে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। পরবর্তী সময়ে সেটি ওড়িশা উপকূলের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও উঠে এসেছে পূর্বাভাসে। যদিও সম্ভাব্য গতিপথ ও শক্তি সম্পর্কে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সময় আসেনি। নিম্নচাপটি বাস্তবে তৈরি হওয়ার পর তার অবস্থান ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে আরও নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস পাওয়া যাবে বলে উল্লেখ। অন্যদিকে, বেসরকারি আবহাওয়া সংস্থা অ্যাকুওয়েদার (AccuWeather)-এর আবহাওয়াবিদ জেসন নিকোলস (Jason Nicholls) সামাজিক মাধ্যম এক্স (X)-এ এই আবহাওয়া ব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। তাঁর পূর্বাভাস অনুযায়ী, অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হলে চলতি সপ্তাহের শেষ ভাগে সিস্টেমটি উল্লেখযোগ্য শক্তি অর্জন করতে পারে। তবে কোনও নিম্নচাপ ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হবে কি না, তা নির্ধারণের জন্য ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ জরুরি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আবহাওয়া মডেলের পূর্বাভাসে সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের ইঙ্গিত থাকলেও, সেটিকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে ধরে নেওয়ার অবকাশ নেই।
চেন্নাইয়ের আবহাওয়া পর্যবেক্ষক পার্থনের বক্তব্যেও উঠে এসেছে অক্টোবরের এই আবহাওয়া ব্যবস্থার সম্ভাব্য গতিপথ নিয়ে আলোচনা। বর্তমান এল নিনো (El Nino) পরিস্থিতি ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহের প্রভাবের কারণে এই সময় তৈরি হওয়া নিম্নচাপ পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে বলে কয়েকটি পূর্বাভাসে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তবে ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ নির্ধারণে একাধিক বিষয় কাজ করে। ফলে প্রাথমিক মডেলের পূর্বাভাসের সঙ্গে পরবর্তী পর্যবেক্ষণের পার্থক্য থাকাও অস্বাভাবিক নয়। আগামী কয়েক দিনে সমুদ্রের উপর আবহাওয়া ব্যবস্থাটির অবস্থান এবং তার শক্তির পরিবর্তনই পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সম্ভাব্য এই নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের কারণ রয়েছে পূর্ব ভারতের উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলিতে বলে সূত্রের খবর। কয়েকটি পূর্বাভাস অনুযায়ী, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি অঞ্চল পেরিয়ে আবহাওয়া ব্যবস্থাটি পশ্চিম দিকে এগোলে আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি নাগাদ পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা আর অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলবর্তী এলাকায় তার প্রভাব পড়তে পারে। এই পর্যায়ে বাংলার কোন জেলায় কতটা বৃষ্টি হবে, কোথায় ঝোড়ো হাওয়া বইবে কিংবা সমুদ্র কতটা উত্তাল হয়ে উঠবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাচ্ছে না।
সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র কোথায় তৈরি হবে ও শেষ পর্যন্ত সেটি কোন উপকূলের দিকে এগোবে, তার উপরেই প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করবে বলে উল্লেখ। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে উপকূলবর্তী পূর্ব মেদিনীপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও উত্তর ২৪ পরগনার মতো জেলাগুলির আবহাওয়া পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এই জেলাগুলিতে দুর্যোগের আশঙ্কা নিশ্চিত করে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে মৌসম বিভাগের পরবর্তী পূর্বাভাসের জন্য অপেক্ষা করা প্রয়োজন। নিম্নচাপটি যদি শক্তি বাড়িয়ে উপকূলের দিকে এগিয়ে আসে, তা হলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধি, দমকা হাওয়া ও সমুদ্র উত্তাল হয়ে ওঠার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা বা সতর্কতা জারি করার প্রয়োজনও দেখা দিতে পারে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত নির্দেশ নির্ভর করবে সরকারি আবহাওয়া বুলেটিনের উপর।
উৎসবের মরসুমে আবহাওয়ার এমন অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে। পুজোর ছুটি কাটিয়ে অনেকে কাজে ফিরছেন, স্কুল-কলেজ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক কাজকর্ম শুরু হচ্ছে। সেই সময় ভারী বৃষ্টি বা ঝোড়ো হাওয়া দেখা দিলে যাতায়াত, যান চলাচল এবং উপকূলবর্তী এলাকার স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে সম্ভাব্য দুর্যোগের কথা মাথায় রেখে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার বদলে নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাসের উপর নজর রাখাই সবচেয়ে জরুরি। আবহাওয়া ব্যবস্থার প্রাথমিক গতিপ্রকৃতি দেখে আগাম সতর্কতা নেওয়া সম্ভব হলেও, নিশ্চিত তথ্য ছাড়া ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা কিংবা আছড়ে পড়ার স্থান নির্ধারণ করা যায় না। কিন্তু, বঙ্গোপসাগর বরাবরই অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে ঘূর্ণিঝড় তৈরির অনুকূল পরিবেশের জন্য পরিচিত। বর্ষা বিদায়ের পরেও সমুদ্রের উপরিভাগে পর্যাপ্ত তাপ ও আর্দ্রতা থাকলে নিম্নচাপ শক্তি অর্জন করতে পারে। অনুকূল বায়ুপ্রবাহের সঙ্গে এই উপাদানগুলি একত্রে কাজ করলে কোনও কোনও নিম্নচাপ গভীর নিম্নচাপ কিংবা ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। অবশ্য বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া প্রতিটি নিম্নচাপই যে ঘূর্ণিঝড় হবে, এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে নিম্নচাপ দুর্বল হয়ে যায় অথবা স্থলভাগে প্রবেশের আগেই তার শক্তি কমে আসে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্ভাবনা ও নিশ্চিত পূর্বাভাসের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।
এখন লক্ষ্য, আগামী কয়েক দিনের আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতির দিকে। উত্তর আন্দামান সাগর থেকে সরে আসা ঘূর্ণাবর্ত সত্যিই নিম্নচাপে পরিণত হয় কি না, সেটি কত দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করে এবং কোন দিকে অগ্রসর হয়, এই তিনটি বিষয়ই পরিস্থিতির পরবর্তী ছবি নির্ধারণ করবে। ২৮ অক্টোবরের আশপাশে গভীর নিম্নচাপ তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও, ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তের জন্য সরকারি পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দাদের তাই ভারতের মৌসম বিভাগের নিয়মিত পূর্বাভাস, বৃষ্টির সতর্কতা এবং প্রশাসনের নির্দেশ অনুসরণ করা উচিত। পুজোর রেশ কাটতেই বঙ্গোপসাগরে যে নতুন আবহাওয়া পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তার দিকে এখন নজর গোটা পূর্ব ভারতের।
ছবি: প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Asian Para Games News, India Medal Tally | এক দিনেই ৫ সোনা, ১৮ পদক! প্যারা এশিয়ান গেমসে দুরন্ত ভারত, নাগোয়ায় রেকর্ড গড়ে নজর কাড়লেন সিমরন-প্রবীণ-সচিন



