ISRO satellite monitoring, Himalayan glacial lakes | হিমালয়ের ২৮ হাজার হিমবাহ হ্রদে নজরদারি, সিকিমের বিপর্যয়ের পর আরও কড়া হচ্ছে ভারতের প্রস্তুতি

SHARE:

হিমালয়ের নদী অববাহিকায় ২৮,০৪৩টি হিমবাহ হ্রদ চিহ্নিত করেছে ইসরো। সিকিমের দক্ষিণ লোনাক হ্রদের বিপর্যয়ের পর GLOF ঝুঁকি কমাতে উপগ্রহ নজরদারি ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করছে ভারত।

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : হিমালয়ের বরফঢাকা পাহাড়ের বুকের ছোট-বড় হিমবাহ হ্রদ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সিকিমে ২০২৩ সালের ভয়াবহ হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার পর হিমালয় অঞ্চলের জলাধারগুলির গতিবিধির উপর নজরদারি আরও জোরদার করেছে ভারত। উপগ্রহচিত্র ও দূর অনুধাবন প্রযুক্তির সাহায্যে ইতিমধ্যেই ভারতীয় হিমালয় অঞ্চলের নদী অববাহিকাগুলিতে ২৮ হাজার ৪৩টি হিমবাহ হ্রদ চিহ্নিত করা হয়েছে। এই তালিকায় ০.২৫ হেক্টর বা তার বেশি আয়তনের হ্রদগুলিও রয়েছে। ইসরোর (ISRO) জাতীয় দূর অনুধাবন কেন্দ্র বা ন্যাশনাল রিমোট সেন্সিং সেন্টার (NRSC)-এর তৈরি হিমবাহ হ্রদ সংক্রান্ত তথ্যভান্ডার ভবিষ্যতে ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ, নজরদারি এবং বিপর্যয় মোকাবিলার পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ISRO) -এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় হিমালয়ের ইন্দুস, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদ অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় উপগ্রহের মাধ্যমে হিমবাহ হ্রদগুলির অবস্থান, আয়তন, উচ্চতা এবং গঠনের ধরন নথিভুক্ত করা হয়েছে। ২০১৬-১৭ সালের উচ্চ রেজোলিউশনের Resourcesat-2 LISS-IV উপগ্রহচিত্রের ভিত্তিতে তৈরি এই মানচিত্রে মোট ২৮,০৪৩টি হ্রদ ধরা পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭,৫৭০টি হ্রদ ভারতের ভূখণ্ডে এবং ২০,৪৭৩টি রয়েছে সীমান্তপারের অঞ্চলে। অর্থাৎ হিমালয়ের এই জলাধারগুলির একটি বড় অংশ এমন এলাকায় অবস্থিত, যেখানে একাধিক দেশের নদী অববাহিকার সঙ্গে তাদের যোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন : India’s Protein Demand Could Triple by 2070, Emissions Raise Climate Concerns | ২০৭০-এ ভারতের প্রোটিন চাহিদা তিনগুণ! দুধ-ডালের ভরসায় বাড়বে কার্বন নিঃসরণ, সামনে বড় পরীক্ষা

ভারতের ভূখণ্ডে থাকা হিমবাহ হ্রদের সংখ্যাও রাজ্য ও অঞ্চলভেদে আলাদা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী অরুণাচল প্রদেশে ২,১৮৮টি, সিকিমে ৭৩৩টি, জম্মু ও কাশ্মীরে ৫৪৬টি, হিমাচল প্রদেশে ৫৮৭টি, উত্তরাখণ্ডে ৩৪৭টি এবং লাদাখে ২,৩১৯টি হিমবাহ হ্রদ চিহ্নিত করা হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি নথিতে হিমবাহ হ্রদের সংখ্যা ও শ্রেণিবিন্যাস নির্দিষ্ট সমীক্ষা ও মাপের সীমার উপর নির্ভর করে বদলাতে পারে। তবে সামগ্রিক চিত্রে হিমালয়ের বিপুল সংখ্যক জলাধারই নজরদারির আওতায় আসছে। এই নজরদারির প্রয়োজনীয়তা বোঝা যায় দীর্ঘমেয়াদি উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ থেকেও। ইসরোর ১৯৮৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, ২০১৬-১৭ সালে চিহ্নিত ১০ হেক্টরের বেশি আয়তনের ২,৪৩১টি হিমবাহ হ্রদের মধ্যে ৬৭৬টির আয়তন ১৯৮৪ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে ৬০১টি হ্রদের আয়তন দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ১৩০টি এমন হ্রদ ভারতের ভূখণ্ডে রয়েছে ইন্দুস অববাহিকায় ৬৫টি, গঙ্গা অববাহিকায় ৭টি এবং ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় ৫৮টি।

উচ্চতার ভিত্তিতেও এই পরিবর্তন নজর কেড়েছে। ইসরোর বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, উল্লেখযোগ্য ভাবে আয়তন বাড়া হ্রদগুলির মধ্যে ৩১৪টি রয়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে এবং ২৯৬টি রয়েছে ৫,০০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতায়। হিমবাহের পশ্চাদপসরণ ও বরফ গলার সঙ্গে এই ধরনের হ্রদের আয়তন বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। হ্রদের চারপাশে বরফ, পাথর ও মাটির তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধ থাকে। সেই বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়লে অথবা হঠাৎ কোনও তুষারধস, ভূমিধস, বরফখণ্ডের পতন বা অতিবৃষ্টির মতো ঘটনা ঘটলে বিপুল জল একসঙ্গে নেমে আসতে পারে। এই ঘটনাকেই বলা হয় গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা GLOF, GLOF-এর সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হল, একটি দুর্গম পাহাড়ি হ্রদের ঘটনা অল্প সময়ের মধ্যে বহু দূরের জনবসতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। হঠাৎ বিপুল জল নেমে এলে নদীর জলস্তর দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। তার সঙ্গে পাথর, মাটি ও পলি নেমে এসে নদীর গতিপথ বদলাতে পারে। রাস্তা, সেতু, বাড়িঘর, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও অন্যান্য পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। হিমালয়ের দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে সব হ্রদে নিয়মিত গিয়ে সরেজমিনে পরিমাপ করা কঠিন। সেই জায়গাতেই উপগ্রহ প্রযুক্তি বড় ভূমিকা নিতে পারে। NRSC দূর অনুধাবন উপগ্রহের তথ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ এবং বিপর্যয় ব্যবস্থাপনার জন্য সিদ্ধান্ত সহায়ক তথ্য তৈরির কাজ করে।

আরও পড়ুন : Beta Pictoris b radio signal, exoplanet radio signal | পৃথিবী নয়, তবু মহাকাশে বড় আবিষ্কার! প্রথমবার অন্য গ্রহের রেডিও সংকেত ধরল MeerKAT

সিকিমের দক্ষিণ লোনাক হ্রদের ঘটনা এই ঝুঁকির ভয়াবহ উদাহরণ হয়ে রয়েছে। ২০২৩ সালের ৩ অক্টোবর দক্ষিণ লোনাক হ্রদের কাছে একটি বড় ভূমিধসের ফলে হ্রদে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর নেমে আসে। আইআইটি ভুবনেশ্বরের (IIT Bhubaneswar) গবেষকদের নেতৃত্বে হওয়া একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রায় ১ কোটি ৪৭ লক্ষ ঘনমিটার পরিমাণ উপাদান হ্রদে পড়ার ফলে প্রায় ২০ মিটার উচ্চতার ঢেউ তৈরি হয়েছিল। সেই ঢেউ প্রাকৃতিক বাঁধে আঘাত করার পরে প্রায় ৫ কোটি ঘনমিটার জল হ্রদ থেকে বেরিয়ে যায়। ভয়াবহ জলস্রোত তিস্তা নদীর উপত্যকা ধরে প্রায় ৩৮৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। এই ঘটনায় প্রাণহানি ঘটে ও তিস্তা উপত্যকার জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সেতু, রাস্তা ও বিভিন্ন পরিকাঠামোয় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। গবেষণায় দক্ষিণ লোনাক হ্রদের আশপাশের ভূপ্রকৃতির দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের কথাও উঠে এসেছে। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সংশ্লিষ্ট অংশের অস্থিরতা এবং ভূমির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। ফলে কোনও হিমবাহ হ্রদের শুধু বর্তমান আয়তন জানা যথেষ্ট নয়, সময়ের সঙ্গে তার আকার, জলস্তর, আশপাশের বরফ ও প্রাকৃতিক বাঁধের অবস্থায় কী পরিবর্তন হচ্ছে, সেটিও নিয়মিত দেখা প্রয়োজন। উপগ্রহচিত্রের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য এই ধরনের পরিবর্তন বোঝার সুযোগ করে দেয়।

দক্ষিণ লোনাকের ঘটনার পরে ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদ চিহ্নিত করার কাজ আরও জোরদার হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (NDMA) বিভিন্ন সংস্থার তথ্য মিলিয়ে ১৯৫টি উচ্চঝুঁকির হিমবাহ হ্রদকে নজরে রেখেছে। এই হ্রদগুলির জলপৃষ্ঠ দ্রুত বাড়ছে কি না এবং সেগুলি GLOF -এর সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় জল কমিশনও (CWC) বর্ষার সময় হিমবাহ হ্রদ ও জলাশয়ের পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে। শুধু তালিকা তৈরি করেই থেমে থাকছে না কেন্দ্র। হিমবাহ হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি কমাতে ন্যাশনাল GLOF রিস্ক মিটিগেশন প্রোগ্রামের আওতায় ১৫০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, সিকিম এবং অরুণাচল প্রদেশে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ঝুঁকি মূল্যায়ন, নজরদারি, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, প্রয়োজনভিত্তিক প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ এবং স্থানীয় স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ রয়েছে।

আরও পড়ুন : Nirmala Sitharaman on 10 percent growth | India economic growth : ৭.৮ শতাংশ থেকে ১০-এর ঘরে যেতে পারে! ভারতের অর্থনীতি নিয়ে বড় আশার কথা শোনালেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন

২০২৫ সালের সরকারি তথ্যে উল্লেখ, উচ্চঝুঁকির হিমবাহ হ্রদগুলিতে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা তৈরির কাজ এগোচ্ছে। ২০২৫ সালের মূল্যায়নে ১৮৯টি উচ্চঝুঁকির হিমবাহ হ্রদ নিয়ে সমীক্ষা চালানো হয়েছিল এবং তার মধ্যে ৫৬টিকে অত্যন্ত উচ্চঝুঁকির শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচিত হ্রদগুলিতে GLOF আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। হিমালয়ের হিমবাহ হ্রদের ক্ষেত্রে তাই এখন মূল লক্ষ্য শুধু বিপদ ঘটার পরে ক্ষয়ক্ষতি সামলানো নয়, তার আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করা। কোন হ্রদের আয়তন বাড়ছে, কোনটির প্রাকৃতিক বাঁধ দুর্বল, কোন হ্রদের নীচে জনবসতি বা গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো রয়েছে, এই তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি করা হচ্ছে। ইসরোর উপগ্রহ প্রযুক্তি, NRSC-র দূর অনুধাবন তথ্য, কেন্দ্রীয় জল কমিশনের পর্যবেক্ষণ এবং NDMA-র বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে সেই প্রস্তুতিই আরও জোরদার করার চেষ্টা চলছে।

২০২৩ সালের সিকিম বিপর্যয় দেখিয়েছে, হিমালয়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি হ্রদের পরিবর্তনও নিচের বিস্তীর্ণ এলাকায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ২৮ হাজারেরও বেশি হিমবাহ হ্রদের তথ্যভান্ডার এখন শুধু একটি মানচিত্র নয়, ভবিষ্যৎ বিপর্যয় মোকাবিলার পরিকল্পনার অন্যতম ভিত্তি। উপগ্রহে ধরা পড়া প্রতিটি পরিবর্তন সময়মতো বিশ্লেষণ করা গেলে সম্ভাব্য GLOF -এর ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ বাড়বে। হিমালয়ের দুর্গম ভূপ্রকৃতিতে মানুষের সরাসরি পৌঁছনো যেখানে কঠিন, সেখানে মহাকাশ থেকে নিয়মিত নজরদারিই হয়ে উঠছে ঝুঁকি চিহ্নিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : GJ 3378b exoplanet, super Earth discovery | ২৫ আলোকবর্ষ দূরে নতুন পৃথিবী? GJ 3378b আবিষ্কারে মহাকাশ গবেষণায় তুমুল আলোড়ন

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন