সাশ্রয় নিউজ নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: আগামী কয়েক দশকে ভারতের খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। আয় বৃদ্ধি, নগরায়ন, জনসংখ্যার কাঠামোয় বদল এবং খাদ্যপছন্দের পরিবর্তনের সঙ্গে দেশে প্রোটিনের চাহিদা দ্রুত বাড়তে পারে (India’s Protein Demand Could Triple by 2070)। Asia Research & Engagement (ARE) এবং Federation of Indian Chambers of Commerce and Industry (FICCI) -এর যৌথ রিপোর্ট ‘Charting India’s Protein Transition’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতের মাথাপিছু বার্ষিক প্রোটিন গ্রহণ যেখানে প্রায় ৯.৫ কেজি, ২০৭০ সালে তা বেড়ে প্রায় ৩০ কেজিতে পৌঁছতে পারে। অর্থাৎ সাড়ে চার দশকে মাথাপিছু চাহিদা তিনগুণেরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু খাদ্যের পরিমাণ বাড়ার হিসাব নয়। আগামী দিনে ভারত কী ধরনের প্রোটিনের উপর নির্ভর করবে, সেই প্রশ্নও একই সঙ্গে উঠে আসছে। রিপোর্টের পূর্বাভাস অনুযায়ী, পশ্চিমের দেশগুলির মতো লাল মাংসকে কেন্দ্র করে ভারতের প্রোটিনের বাজার গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। দুধ ও ডালই দেশের প্রোটিনের প্রধান ভিত্তি হয়ে থাকতে পারে। পাশাপাশি ডিম, মুরগির মাংস, মাছ ও সামুদ্রিক খাবারের ব্যবহার দ্রুত বাড়বে। লাল মাংসের অংশ তুলনামূলক ভাবে সীমিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত ‘Charting India’s Protein Transition’ রিপোর্টে শুধু চাহিদা বৃদ্ধির ছবি নয়, তার সঙ্গে জড়িত পরিবেশগত ঝুঁকিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। রিপোর্টে Science Based Targets Initiative-এর ২০২২ সালের Food, Land and Agriculture Guidance-এর বিভিন্ন পরামিতি ব্যবহার করে একাধিক সম্ভাব্য পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। বর্তমান উৎপাদন ও খাদ্যাভ্যাসের ধারা বড় কোনও পরিবর্তন ছাড়া চলতে থাকলে ২০৭০ সালে ভারতের প্রোটিন ব্যবস্থার বার্ষিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ১.৯২ গিগাটন CO2 সমতুল্যে পৌঁছতে পারে বলে হিসাব করা হয়েছে। রিপোর্টে নির্ধারিত আনুমানিক ০.২৫ গিগাটন ‘ক্লাইমেট-সেফ’ সীমার তুলনায় এই পরিমাণ সাত গুণেরও বেশি। আরও দীর্ঘ সময়ের হিসাব ধরলে ছবিটি আরও বড়। ২০২৫ থেকে ২০৭০ সালের মধ্যে বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জলবায়ু-নিরাপদ সীমার অতিরিক্ত সঞ্চিত নিঃসরণ প্রায় ৪৪.৫৫ গিগাটন CO2 সমতুল্য হতে পারে বলে রিপোর্টে অনুমান করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ভারতের শক্তি-সম্পর্কিত বার্ষিক CO2 নিঃসরণের সঙ্গে তুলনা করলে এই অতিরিক্ত নিঃসরণ প্রায় ১৬ বছরের সমান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই হিসাবের কেন্দ্রে রয়েছে দুধ। ভারতের ভবিষ্যৎ প্রোটিনের চাহিদা পূরণে ডেয়ারি যে বড় ভূমিকা নেবে, তা রিপোর্টের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ। ২০৭০ সালে মাথাপিছু দুধ থেকে পাওয়া প্রোটিনের পরিমাণ প্রায় ১৩.১ কেজিতে পৌঁছতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ডাল থেকে মাথাপিছু প্রোটিন গ্রহণ প্রায় ৯.১২ কেজি হতে পারে। অর্থাৎ দুই ক্ষেত্রই ভবিষ্যৎ ভারতীয় খাদ্যতালিকায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকবে। দুধের ক্ষেত্রে অবশ্য চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে উৎপাদন ব্যবস্থার উপর চাপও বাড়বে। ভারত ইতিমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ, উৎপাদনের হিসাবে শীর্ষস্থানীয় দুধ উৎপাদক দেশ। রিপোর্ট-ভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, দেশে বার্ষিক দুধ উৎপাদন প্রায় ২৪৮ মিলিয়ন টনের কাছাকাছি। আবার এই বিশাল উৎপাদন কাঠামোর বড় অংশই ছোট কৃষক ও ক্ষুদ্র উৎপাদনকারীদের উপর নির্ভরশীল। বহু পরিবারের কাছে মাত্র দুই বা তিনটি গবাদি পশুই দুধ উৎপাদনের প্রধান ভিত্তি। ফলে ভবিষ্যতের ডেয়ারি সম্প্রসারণ শুধু পশুর সংখ্যা বাড়ানোর মাধ্যমে সম্ভব হবে না। পশুর উৎপাদনশীলতা, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য, জল ব্যবহার এবং মিথেন নিঃসরণ কমানোর মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
গত এক দশকের পরিসংখ্যানও দুধ উৎপাদনের দ্রুত বৃদ্ধির ছবি দেখায়। ২০১৪-১৫ সালে ভারতে দুধ উৎপাদন ছিল প্রায় ১৪৬.৩ মিলিয়ন টন। ২০২৩-২৪ সালে তা বেড়ে প্রায় ২৩৯.৩ মিলিয়ন টনে পৌঁছয়, অর্থাৎ প্রায় ৬৩.৬ শতাংশ বৃদ্ধি। একই সময়ে ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে গবাদি পশুর উৎপাদনশীলতাও প্রায় ২৭.৪ শতাংশ বেড়েছে বলে রিপোর্ট-ভিত্তিক হিসাব জানাচ্ছে। অর্থাৎ উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে উৎপাদনশীলতার উন্নতিও ভূমিকা রেখেছে। প্রোটিনের দ্বিতীয় বড় স্তম্ভ হতে পারে ডাল। ছোলা, মসুর, মটর-সহ বিভিন্ন ডাল ইতিমধ্যেই ভারতীয় খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে ভবিষ্যতের প্রোটিন চাহিদা মেটাতে ডালকে আরও বড় পরিসরে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। রিপোর্টের মতে, ২০৭০ সালে ডাল থেকে পাওয়া প্রোটিনের পরিমাণ বর্তমানের তুলনায় অনেক বাড়তে পারে। এখানেই ভারতের একটি বিশেষ সুযোগ তৈরি হচ্ছে, শুধু ডাল হিসাবে বাজারজাত না করে সেগুলি থেকে protein concentrate, protein isolate এবং অন্যান্য উচ্চমূল্যের খাদ্য উপাদান তৈরি করা সম্ভব। এই উপাদান ভবিষ্যতে উদ্ভিদভিত্তিক মাংস, দুধের বিকল্প বা ডিমের বিকল্প খাবার তৈরিতেও কাজে লাগতে পারে।
কিন্তু এই জায়গাতেই ভারতের পরিকাঠামোগত ঘাটতি সামনে আসছে। Ministry of Food Processing Industries-এর একটি sector profile অনুযায়ী, ভারত বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ plant-protein isolate আমদানি করে। অর্থাৎ দেশে ডাল ও অন্যান্য উদ্ভিদভিত্তিক কাঁচামাল উৎপাদনের শক্ত ভিত থাকলেও সেগুলিকে উন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে উচ্চমূল্যের প্রোটিন উপাদানে পরিণত করার ক্ষমতা এখনও যথেষ্ট নয়। এই আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় প্রক্রিয়াকরণ, গবেষণা, প্রযুক্তি এবং খাদ্যশিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। ডালের পাশাপাশি মাছ ও সামুদ্রিক খাবারের ক্ষেত্রেও বড় বৃদ্ধি দেখা যেতে পারে। রিপোর্টের হিসাবে, ২০২৫ সালে মাছ ও সামুদ্রিক খাবার থেকে পাওয়া প্রোটিনের পরিমাণ আনুমানিক ০.৬ মিলিয়ন টন থেকে ২০৭০ সালে প্রায় ২.৯ মিলিয়ন টনে পৌঁছতে পারে। অর্থাৎ তুলনামূলক ছোট ভিত্তি থেকে এই ক্ষেত্রটি দ্রুত বাড়তে পারে। ভারতের মোট মাছ উৎপাদনও গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছেন ২০১৩-১৪ সালের প্রায় ৯.৬ মিলিয়ন টন থেকে ২০২৪-২৫ সালে তা প্রায় ১৯.৫ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছে। একই সময়ে সামুদ্রিক খাদ্য রপ্তানিতে চিংড়ির বড় ভূমিকা রয়েছে এবং ২০২৪-২৫ সালে এই রপ্তানির মূল্য প্রায় ৭.৩ বিলিয়ন ডলার ছিল।
ডিম ও মুরগির মাংসও ভবিষ্যৎ প্রোটিনের বাজারে দ্রুত জায়গা করে নিতে পারে। রিপোর্টে অনুমান করা হয়েছে, ২০৭০ সালে ডিমের মোট চাহিদা প্রায় ২৫.৭ মিলিয়ন টন এবং মুরগির মাংসের চাহিদা প্রায় ১৬.২ মিলিয়ন টনে পৌঁছতে পারে। মাথাপিছু হিসাবে ডিম থেকে প্রোটিন গ্রহণ প্রায় ১.৮৫ কেজি এবং মুরগি থেকে প্রায় ১.৭৯ কেজি হতে পারে। রিপোর্টে এই মাত্রাগুলিকে EAT-Lancet Commission-এর Planetary Health Diet-এর মাঝারি গ্রহণমাত্রার সঙ্গে মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রোটিনের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্বন নিঃসরণও একই গতিতে বাড়তেই হবে, এমন নয়। ARE—FICCI রিপোর্ট একাধিক বিকল্প পথের হিসাব করেছে। উৎপাদন ব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়ানো, মিথেন কমানো, পশুখাদ্যের ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, খাদ্য অপচয় কমানো এবং অন্যান্য উৎপাদনভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে ২০৭০ সালের বার্ষিক প্রোটিন-সম্পর্কিত নিঃসরণ ০.৭৩ গিগাটনে নামিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। তবে শুধু উৎপাদন দক্ষতার উন্নতি যথেষ্ট নয় বলেই রিপোর্টের মডেলিং ইঙ্গিত করছে।
আরও সমন্বিত পথে ডেয়ারি, পোলট্রি ও মৎস্য উৎপাদনে দক্ষতা বৃদ্ধির সঙ্গে ডাল, ঐতিহ্যবাহী উদ্ভিদভিত্তিক প্রোটিন এবং নতুন ধরনের বিকল্প প্রোটিনের ব্যবহার বাড়ানো হলে ২০৭০ সালে বার্ষিক নিঃসরণ প্রায় ০.৩০ গিগাটনে নামতে পারে বলে রিপোর্টে হিসাব করা হয়েছে। এটি ০.২৫ গিগাটনের জলবায়ু-নিরাপদ সীমার কাছাকাছি। একই পথে ২০২৫ থেকে ২০৭০ সালের অতিরিক্ত সঞ্চিত নিঃসরণও অনেকটা কমে প্রায় ৮.৩৭ গিগাটনে নেমে আসতে পারে বলে মডেলিংয়ে দেখানো হয়েছে। এই পরিবর্তনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল কৃষক। ভারতের ডেয়ারি ব্যবস্থা এখনও বিপুল সংখ্যক ছোট উৎপাদনকারীর উপর নির্ভরশীল। পোলট্রি ও অন্যান্য খাদ্যশৃঙ্খলেও ক্ষুদ্র উৎপাদক ও চুক্তিভিত্তিক চাষিদের ভূমিকা রয়েছে। তাই পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের নতুন প্রযুক্তি বা নিয়ম চালু করার খরচ যদি সরাসরি ছোট উৎপাদকদের উপর পড়ে, তাহলে খাদ্য ব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়ে নতুন আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। ARE-এর রিপোর্টেও transition cost ছোট কৃষক, contract grower ও MSME-দের উপর একতরফা চাপিয়ে না দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। তাই আগামী দিনের প্রোটিন অর্থনীতি শুধু ‘কতটা উৎপাদন হবে’ এই প্রশ্নে আটকে থাকবে না। প্রশ্ন হবে, কোন প্রোটিন কতটা পরিবেশগত চাপ তৈরি করছে, কতটা জল ও জমি ব্যবহার করছে, উৎপাদক কতটা আয় পাচ্ছেন এবং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে খাবারের দাম রাখা যাচ্ছে কী না। একই সঙ্গে দেশীয় processing capacity বাড়ানো, কৃষকের কাছে প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া, উন্নত পশুখাদ্য ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করা এবং ডালের মতো স্থানীয় উৎস থেকে উচ্চমূল্যের প্রোটিন উপাদান তৈরির পরিকাঠামো গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ভারতের সামনে তাই আগামী ৪৫ বছরের খাদ্যচিত্রে একটি দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। এক দিকে মাথাপিছু প্রোটিন গ্রহণ ৯.৫ কেজি থেকে প্রায় ৩০ কেজিতে পৌঁছতে পারে, অন্য দিকে সেই চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে খাদ্যব্যবস্থার নিঃসরণ যাতে বিপুল হারে না বাড়ে, সেটিও দেখতে হবে। দুধ ও ডাল থাকবে এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে, সঙ্গে দ্রুত বাড়বে মাছ, ডিম ও মুরগির ভূমিকা। আর দেশীয় ডাল ও উদ্ভিদভিত্তিক প্রোটিনকে আধুনিক প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে খাদ্য, কৃষি, শিল্প এবং পরিবেশ, চারটি ক্ষেত্রেই নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Egg oil benefits, egg yolk oil uses | ডিমের কুসুমের তেলেই লুকিয়ে ত্বক-চুলের যত্নের নতুন ঠিকানা! এগ অয়েল নিয়ে বাড়ছে আগ্রহ, জানুন কী কী উপকার




