সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নাগোয়া : প্যারা এশিয়ান গেমসে (Asian Para Games) ভারতের পদক জয়ের দৌড় অব্যাহত। প্রতিযোগিতার তৃতীয় দিনেই পাঁচটি সোনা-সহ মোট ১৮টি পদক জিতে নজর কাড়লেন ভারতীয় অ্যাথলিটেরা। জাপানের নাগোয়ায় (Nagoya, Japan) আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় বুধবার একের পর এক সাফল্য এসেছে ভারতের ঝুলিতে। দৌড়, হাই জাম্প ও শট পাটের মতো বিভাগে দুরন্ত পারফরম্যান্স করে দেশের পদক তালিকাকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন সিমরন (Simran), প্রবীণ কুমার (Praveen Kumar), সচিন খিলাড়ি (Sachin Khilari), দিলীপ গাভিত (Dilip Gavit) এবং আয়ুষ বর্মা (Ayush Verma)। তাঁদের মধ্যে কয়েক জন নতুন গেমস রেকর্ড গড়ে সোনা জিতেছেন। ফলে প্রতিযোগিতার শুরু থেকেই ভারতীয় দলের যে ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে, তৃতীয় দিনেও তার ব্যতিক্রম হল না। দিনের শেষে মোট ৬২টি পদক নিয়ে তালিকার পঞ্চম স্থানে রয়েছে ভারত।
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari, 64 MLAs | শুভেন্দুর ৬৪ বিধায়ক মন্তব্যে জল্পনা, ঋতব্রত শিবিরকে নিশানা তৃণমূলের
এখন পর্যন্ত ভারতের সংগ্রহে রয়েছে ১৪টি সোনা, ২২টি রুপো এবং ২৬টি ব্রোঞ্জ। সংখ্যার বিচারে পদক তালিকায় দেশের অবস্থান পঞ্চম হলেও ভারতীয় অ্যাথলিটদের পারফরম্যান্সে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে অ্যাথলেটিক্স। এই বিভাগ থেকেই এসেছে ৪২টি পদক। তার মধ্যে ১৩টি সোনা, ১৪টি রুপো এবং ১৫টি ব্রোঞ্জ রয়েছে। অর্থাৎ, ভারতের মোট পদকসংগ্রহের বড় অংশই এসেছে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের বিভিন্ন ইভেন্ট থেকে। পাশাপাশি প্যারা-তিরন্দাজি, প্যারা-সাঁতার ও প্যারা-ভারোত্তোলনেও পদক জিতে দেশের সাফল্যের তালিকায় নতুন সংযোজন ঘটিয়েছেন প্রতিযোগীরা। বুধবারের সাফল্যের অন্যতম মুখ সিমরন। মহিলাদের ১০০ মিটার টি১২ বিভাগে দুরন্ত দৌড়ে সোনা জিতেছেন তিনি। মাত্র ১২.০২ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে নতুন গেমস রেকর্ড গড়েছেন ভারতীয় এই অ্যাথলিট। তাঁর এই পারফরম্যান্স শুধু একটি সোনার পদক এনে দেয়নি, চলতি প্রতিযোগিতায় তাঁর ধারাবাহিকতার ছবিও তুলে ধরেছে। এর আগের দিন মহিলাদের ২০০ মিটার টি১২ দৌড়েও সোনা জিতেছিলেন সিমরন। সেই ইভেন্টেও গেমস রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি সোনা জিতে প্রতিযোগিতার অন্যতম সফল ভারতীয় অ্যাথলিট হিসেবে নজর কেড়েছেন সিমরন।
টি১২ বিভাগে দৃষ্টিশক্তিজনিত প্রতিবন্ধকতা থাকা অ্যাথলিটেরা অংশ নেন। এই বিভাগে প্রতিযোগিতার জন্য প্রয়োজন হয় অসাধারণ গতি, ভারসাম্য ও দৌড়ের ছন্দ ধরে রাখার ক্ষমতা। ১০০ মিটারের মতো স্বল্প দূরত্বের দৌড়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গতি বজায় রাখার পাশাপাশি প্রতিটি পদক্ষেপের উপর নিয়ন্ত্রণও অত্যন্ত জরুরি। সিমরনের ১২.০২ সেকেন্ডের সময় তাই তাঁর প্রস্তুতি ও প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতার পরিচয় বহন করছে। একই প্রতিযোগিতায় ২০০ মিটারেও সাফল্য পাওয়ায় তাঁর পারফরম্যান্সের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এখন নজর থাকবে, পরবর্তী ইভেন্টগুলিতেও তিনি এই ছন্দ ধরে রাখতে পারেন কি না। পুরুষদের ১০০ মিটার টি৪৭ বিভাগেও ভারতের জন্য এসেছে সোনা। এই ইভেন্টে ১০.৬৯ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন দিলীপ গাভিত। স্বল্প দূরত্বের দৌড়ে প্রতিযোগীদের মধ্যে ব্যবধান অনেক সময় কয়েক মুহূর্তের হয়। তাই শুরু থেকে গতি তোলা, দৌড়ের মাঝের অংশে ছন্দ বজায় রাখা এবং শেষ পর্যায়ে শক্তি ধরে রাখার বিষয়গুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিলীপের সাফল্য ভারতের অ্যাথলেটিক্স বিভাগের পদকসংগ্রহে আরও একটি সোনা যোগ করেছে। তাঁর এই জয়ও প্রমাণ করেছে, বিভিন্ন শ্রেণির প্রতিযোগিতায় ভারতীয় অ্যাথলিটেরা নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
পুরুষদের হাই জাম্পে টি৪৪/৬৪ বিভাগে সোনা জিতে আলোচনায় উঠে এসেছেন প্রবীণ কুমার। এই ইভেন্টে নতুন গেমস রেকর্ড গড়ে শীর্ষস্থান অর্জন করেছেন তিনি। হাই জাম্প এমন একটি প্রতিযোগিতা, যেখানে শুধু শারীরিক শক্তি থাকলেই চলে না; প্রয়োজন সঠিক দৌড়ের গতি, লাফের সময় শরীরের অবস্থানও এবার অতিক্রম করার নিখুঁত কৌশল। প্রতিটি উচ্চতায় সফল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাপও বাড়তে থাকে। সেই পরিস্থিতিতে রেকর্ড গড়ে সোনা জেতা প্রবীণের পারফরম্যান্সকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। তাঁর জয় ভারতের পদক তালিকায় একটি সোনা বাড়ানোর পাশাপাশি অ্যাথলেটিক্সে দেশের শক্তিশালী উপস্থিতিকেও তুলে ধরেছে।
শট পাটেও ভারতের সাফল্য এসেছে জোড়া সোনার হাত ধরে। পুরুষদের এফ৪৬ বিভাগে সোনা জিতেছেন সচিন খিলাড়ি। অন্য দিকে, এফ৫৩ বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন আয়ুষ বর্মা। শট পাটে প্রতিযোগীদের একটি নির্দিষ্ট বৃত্তের মধ্যে থেকে ভারী গোলক যত দূরে সম্ভব ছুড়ে দিতে হয়। এই ইভেন্টে বাহুর শক্তি, শরীরের ভারসাম্য, কৌশল এবং ছোড়ার সময় সঠিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতিবন্ধকতার ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন বিভাগে প্রতিযোগিতা হওয়ায় প্রত্যেক অ্যাথলিটের সামনে চ্যালেঞ্জও আলাদা। সেই পরিস্থিতিতে সচিন ও আয়ুষের সোনা ভারতের পদকসংগ্রহকে আরও শক্তিশালী করেছে। উল্লেখ্য, সচিন খিলাড়ির নাম ভারতীয় প্যারা অ্যাথলেটিক্সে আগেও আলোচনায় এসেছে। শট পাটে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অভিজ্ঞতা তাঁকে বড় মঞ্চে নিজের দক্ষতা তুলে ধরার সুযোগ করে দিয়েছে। নাগোয়ায় সোনা জিতে তিনি সেই ধারাবাহিকতার আরও একটি অধ্যায় যোগ করলেন। অন্য দিকে, আয়ুষ বর্মার সাফল্যও ভারতের প্যারা-অ্যাথলেটিক্স দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই দিনে দৌড়, হাই জাম্প এবং শট পাটের মতো আলাদা আলাদা ইভেন্ট থেকে সোনা আসায় ভারতীয় দলের সাফল্যের ব্যাপ্তি আরও বেশি করে সামনে এসেছে।
ভারতের ৬২টি পদকের মধ্যে ৪২টি অ্যাথলেটিক্স থেকে আসার বিষয়টি প্রতিযোগিতায় এই বিভাগের গুরুত্ব বুঝিয়ে দেয়। কিন্তু, পদক তালিকায় দেশের অগ্রগতির জন্য অন্য খেলাগুলির অবদানও কম নয়। প্যারা-তিরন্দাজিতে লক্ষ্যভেদের দক্ষতা, প্যারা-সাঁতারে গতি ও সহনশীলতা এবং প্যারা-ভারোত্তোলনে শক্তি ও নিয়ন্ত্রণের পরীক্ষায় ভারতীয় প্রতিযোগীরা পদক জিতেছেন। ফলে দেশের সাফল্য কোনও একটি বিভাগের মধ্যে আটকে নেই। বিভিন্ন খেলায় অংশগ্রহণ এবং পদক অর্জনের মাধ্যমে ভারতীয় দল প্রতিযোগিতায় নিজেদের উপস্থিতি বজায় রেখেছে। প্যারা এশিয়ান গেমস প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদদের আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরারও বড় সুযোগ। প্রতিটি ইভেন্টে প্রতিযোগীদের প্রস্তুতি, অনুশীলন ও মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষা হয়। নাগোয়ায় ভারতীয় অ্যাথলিটদের পারফরম্যান্সে সেই কঠোর পরিশ্রমের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে একই দিনে পাঁচটি সোনা জেতা ও একাধিক গেমস রেকর্ড গড়া ভারতীয় শিবিরের কাছে বড় প্রাপ্তি। প্রতিযোগিতার এখনও বাকি থাকা ইভেন্টগুলিতে আরও পদক আসবে কি না, সে দিকেই এখন লক্ষ্য থাকবে সমর্থকদের।
তৃতীয় দিনের শেষে ১৪টি সোনা, ২২টি রুপো এবং ২৬টি ব্রোঞ্জ-সহ মোট ৬২টি পদক নিয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছে ভারত। পদক তালিকায় অবস্থান উন্নত করার সুযোগ এখনও রয়েছে। তার জন্য আগামী দিনগুলিতে বিভিন্ন বিভাগের প্রতিযোগীদের নিজেদের সেরাটা দিতে হবে। সিমরনের জোড়া সোনা, প্রবীণ কুমারের রেকর্ড, সচিন খিলাড়ি ও আয়ুষ বর্মার শট পাটে জয় এবং দিলীপ গাভিতের দ্রুততম দৌড় ইত্যাদি মিলিয়ে বুধবার ভারতের জন্য অত্যন্ত সফল দিন হয়ে থাকল। নাগোয়ার মঞ্চে ভারতীয় অ্যাথলিটদের এই ছন্দ শেষ পর্যন্ত কোথায় পৌঁছয়, এখন সেটাই দেখার।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India Women’s Hockey Asian Games Gold |এশিয়ান গেমসে ভারতের মহিলা হকিতে সোনা, চিনকে হারিয়ে ইতিহাস দীপিকাদের



