সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : কয়েক দিন আগেই ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের সব ফরম্যাটের অধিনায়কত্ব হারিয়েছেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে ভারত একাধিক সাফল্য পেলেও সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাট হাতে প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার বিষয়টি নিয়ে কম আলোচনা হয়নি। সেই চাপ, সমালোচনা ও ব্যক্তিগত হতাশার আবহেই ব্যাট হাতে যেন নিজের পুরনো রূপে ফিরলেন হরমনপ্রীত কৌর (Harmanpreet Kaur)। জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে তৃতীয় টি-টোয়েন্টি ম্যাচে মাত্র ৪১ বলে অপরাজিত ৯১ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেললেন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক। তাঁর ব্যাট থেকে এল ১০টি চার ও পাঁচটি ছক্কা। কিন্তু দিনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হল নিজের ইনিংস নিয়ে কথা বলতে গিয়ে। সাক্ষাৎকারের মাঝেই কণ্ঠ ধরে এল হরমনপ্রীতের। প্রাক্তন অধিনায়ক চোখের জল লুকিয়ে রাখতে পারলেন না। দ্রুত সেখান থেকে সরে যাওয়ার আগে তাঁর আবেগ যেন বুঝিয়ে দিল, এই ইনিংস তাঁর কাছে নিছক একটি বড় রান নয়, নিজের লড়াইয়েরও এক গুরুত্বপূর্ণ পর্ব।
হরমনপ্রীতের এই ইনিংসের গুরুত্ব বুঝতে হলে সাম্প্রতিক সময়ের প্রেক্ষাপটের দিকে তাকাতে হবে। তিনি ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও আক্রমণাত্মক ব্যাটার হিসেবে পরিচিত। বড় ম্যাচে দায়িত্ব নেওয়া, চাপের পরিস্থিতিতে দ্রুত রান তোলা ও প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণকে চাপে ফেলার ক্ষমতা তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। কিন্তু ক্রিকেটে অতীতের সাফল্য সব সময় বর্তমানের সমালোচনা থেকে রক্ষা করতে পারে না। সাম্প্রতিক ম্যাচগুলিতে ব্যাট হাতে প্রত্যাশিত ধারাবাহিকতা না থাকায় তাঁর ফর্ম নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল। শেষ ১০টি ম্যাচে একটিও অর্ধশতরান করতে পারেননি হরমনপ্রীত। ফলে অধিনায়কত্বের দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার পর তাঁর ব্যাটিংয়ের দিকে নজর আরও বেড়ে গিয়েছিল। এশিয়া কাপ ও এশিয়ান গেমসে ভারতীয় দলের সাফল্য থাকলেও ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনা থামেনি। দলীয় সাফল্যের পাশে নিজের ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে না পারার চাপ যে একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের উপরও পড়তে পারে, হরমনপ্রীতির সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তারই উদাহরণ। অধিনায়কত্ব হারানোর পর তাঁর সামনে তাই চ্যালেঞ্জ ছিল দ্বিগুণ। এক দিকে নতুন ভূমিকায় নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, অন্য দিকে ব্যাট হাতে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেওয়া। জ়িম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে ৯১ রানের ইনিংস সেই প্রেক্ষাপটেই বাড়তি তাৎপর্য পেয়েছে।
ম্যাচের পরে ধারাভাষ্যকারদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে হরমনপ্রীতি জানান, এদিন তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল নিজের খেলা উপভোগ করা এবং ক্রিজ়ে যতটা সম্ভব সময় কাটানো। তিনি বলেন, ‘খুব ভাল লাগছে। শুধু নিজের খেলা উপভোগ করতে চেয়েছি। ক্রিজ়ে অনেকটা সময় কাটিয়েছি। সেটাই আসল লক্ষ্য ছিল।’ তাঁর কথায় বড় ইনিংস খেলার তৃপ্তি যেমন ছিল, তেমনই ছিল নিজের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পাওয়ার আনন্দ। দীর্ঘ সময় ধরে রান না পাওয়ার পরে এমন একটি ইনিংস একজন ব্যাটারের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যখন তাঁকে ঘিরে আলোচনা শুধু পারফরম্যান্সে সীমাবদ্ধ না থেকে নেতৃত্বের দায়িত্ব নিয়েও চলতে থাকে। এই কথোপকথনে উপস্থিত ছিলেন ভারতের মহিলা দলের প্রাক্তন কোচ ডব্লিউভি রমন (WV Raman)। হরমনপ্রীত তাঁর এই ইনিংসের কৃতিত্বের কিছুটা রমনকেও দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, রমন যখন দলের দায়িত্বে ছিলেন, তখন খেলোয়াড়দের নিজের মতো করে খেলার স্বাধীনতা দেওয়ার কথা বলেছিলেন। সেই পরামর্শ এখনও তাঁর মনে রয়েছে। হরমন বলেন, ‘যে মুহূর্তে আপনি দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, বলেছিলেন, “যাও, নিজের মনের মতো করে খেলো।” সেটাই এখন আমি করার চেষ্টা করছি। কারও জন্য নয়, নিজের জন্য খেলছি। ওই পরামর্শের জন্য ধন্যবাদ।’ হরমনপ্রীতির এই মন্তব্যে তাঁর মানসিক অবস্থার একটি দিক উঠে আসে। ক্রিকেটারদের কাছে কোচের পরামর্শ অনেক সময় কৌশলগত নির্দেশনার চেয়েও বেশি কিছু হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিনের অভ্যাস, প্রত্যাশা এবং চাপের মধ্যে নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নিজের সিদ্ধান্তের উপর আস্থা রাখা ও ব্যাটিংয়ের আনন্দ ফিরে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। রমনের সেই কথাই যে তাঁর মনে রয়ে গিয়েছে, হরমনপ্রীতির বক্তব্যে তার ইঙ্গিত মিলেছে। এ দিনের ইনিংসে তিনি শুধু রান তোলেননি, নিজের পছন্দের ক্রিকেট খেলার দিকেও মন দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
এই প্রত্যাবর্তনের পিছনে অনুশীলনের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছেন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক। এশিয়ান গেমসের পর নেটে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন তিনি। ব্যাটিংয়ের বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করেছেন এবং নিজের ভুলত্রুটি শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সেই প্রস্তুতির জন্য ব্যাটিং কোচ হিমাংশু ভাইয়ের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন হরমনপ্রীত। তাঁর কথায়, ‘এশিয়ান গেমসের পর নেটে অনেকটা সময় কাটিয়েছি। অনেক পরিশ্রম করেছি। হিমাংশু ভাইকে ধন্যবাদ দিতে চাই। উনি আমার পিছনে অনেক খেটেছেন।’ মাঠের বাইরে এই পরিশ্রমই যে তাঁর ইনিংসের ভিত তৈরি করেছে, তা বোঝাতে চেয়েছেন হরমন। ৪১ বলে ৯১ রানের ইনিংসে ১০টি চার ও পাঁচটি ছক্কা হাঁকানো নিছক দ্রুত রান তোলার পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে ভুল হয়ে যাবে। আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের বোলারদের উপর চাপ তৈরি করার পাশাপাশি নিজের ছন্দ ফিরে পাওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন হরমনপ্রীত। একজন ব্যাটার যখন দীর্ঘ সময় বড় রান পান না, তখন প্রতিটি নতুন ইনিংসের সঙ্গে প্রত্যাশা ও চাপ বাড়তে থাকে। সেই পরিস্থিতিতে বড় শট খেলার আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া সহজ নয়। জ়িম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে তাঁর ব্যাটিংয়ে সেই আত্মবিশ্বাসের ছাপ দেখা গিয়েছে। তবে একটি ইনিংস দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী ধারাবাহিকতা বিচার করা যায় না। আগামী ম্যাচগুলিতে এই ছন্দ ধরে রাখাই হবে তাঁর সামনে পরবর্তী পরীক্ষা।
সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে আবেগ সামলাতে পারেননি হরমনপ্রীত। কথা বলতে বলতে তিনি হঠাৎ থেমে যান। চোখের জল ধরে রাখার চেষ্টা করলেও তা সহজ হয়নি। তার পর আর দীর্ঘ সময় সেখানে থাকেননি, দ্রুত সরে যান। প্রকাশ্যে নিজের আবেগ দেখাতে তিনি যে স্বচ্ছন্দ ছিলেন না, তাঁর আচরণে তা ধরা পড়ে। তবে সেই মুহূর্তকে শুধু কান্না দিয়ে ব্যাখ্যা করলে ছবির পুরোটা ধরা পড়ে না। অধিনায়কত্ব হারানো, ব্যাটিং নিয়ে সমালোচনা, নিজের খেলা নিয়ে নতুন করে কাজ করা এবং তার পরে এমন একটি ইনিংস মিলিয়ে তাঁর কাছে দিনটি যে আবেগঘন ছিল, তা অনুমান করা কঠিন নয়।অন্যদিকে, হরমনপ্রীত কৌরের ক্রিকেটজীবনে বড় ইনিংস নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু প্রতিটি ইনিংসের প্রেক্ষাপট আলাদা। জ়িম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে এই ৯১ রান তাঁর কাছে আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে ভারতীয় মহিলা দলের সমর্থকদের কাছেও এটি গুরুত্বপূর্ণ পারফরম্যান্স, কারণ দলের অভিজ্ঞ ব্যাটারদের ছন্দে থাকা যে কোনও প্রতিযোগিতায় ভারতের শক্তি বাড়ায়। অধিনায়কত্বের দায়িত্ব এখন তাঁর হাতে নেই, কিন্তু ব্যাট হাতে দলের জন্য অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে। মাঠে নিজের কাজের মাধ্যমে সেই ভূমিকাকে কতটা কার্যকর করে তুলতে পারেন, তা নির্ভর করবে আগামী দিনের ধারাবাহিকতার উপর।
এ দিনের ইনিংসের পরে হরমনপ্রীতির সামনে তাই নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সমালোচনার জবাব দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় মাঠের পারফরম্যান্স—ক্রিকেটে এই সত্য বহুবার দেখা গিয়েছে। তবে তাঁর কান্নার মুহূর্তটিও মনে করিয়ে দিল, ক্রিকেটারদের জীবন শুধু রান, উইকেট কিংবা অধিনায়কত্বের হিসাব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিশ্রম, প্রত্যাশা, ব্যর্থতার চাপ এবং নিজেকে আবার প্রমাণ করার লড়াই। জ়িম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে ৪১ বলে অপরাজিত ৯১ রান সেই লড়াইয়েরই এক আবেগঘন অধ্যায় হয়ে থাকল। এখন দেখার, এই ইনিংসের ছন্দ ধরে রেখে আগামী ম্যাচগুলিতেও হরমনপ্রীত কতটা ধারাবাহিক হতে পারেন।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India Women vs Japan Asian Games 2026, India women semi final Asian Games | ব্যাট হাতে নামতেই হল না হরমনপ্রীত-স্মৃতিকে, ৫ ওভারে জাপানকে উড়িয়ে এশিয়ান গেমসের সেমিফাইনালে ভারত



