সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: আগামী বছর জুলাই-আগস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজ (West Indies) ও আমেরিকা (USA) সফরে যেতে চলেছে ভারতীয় ক্রিকেট দল (India Cricket Team)। ক্যারিবিয়ান সফরে তিনটি একদিনের ম্যাচ ও পাঁচটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলবে ভারত। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে শুরু হওয়া সাদা বলের এই লড়াইয়ের শেষ দুই টি-টোয়েন্টি হবে আমেরিকার ফ্লোরিডায়। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (BCCI) ও ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজ (Cricket West Indies) যৌথ ভাবে আগামী বছরের এই সফরের সূচী ঘোষণা করেছে। এই সফরের সময়কাল ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। কারণ ২০২৭ সালের অক্টোবরেই রয়েছে একদিনের বিশ্বকাপ (ODI World Cup)। ফলে বিশ্বকাপের কয়েক মাস আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে এক দিনের ক্রিকেটে ভারতীয় দলের প্রস্তুতি কতটা জোরদার হয়, তা নিয়ে আগ্রহ থাকবে ক্রিকেটমহলে। যদিও ঘোষিত সূচিতে তিনটি এক দিনের ম্যাচের তুলনায় টি-টোয়েন্টির সংখ্যা বেশি। পাঁচটি টি-টোয়েন্টির বিপরীতে এক দিনের ম্যাচ রয়েছে মাত্র তিনটি। বিশ্বকাপের আগে এক দিনের ক্রিকেটের প্রস্তুতির জন্য আরও বেশি ম্যাচের প্রয়োজন ছিল কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।
বর্তমান সূচী অনুযায়ী, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারতের সাদা বলের সিরিজ শেষ হবে আগামী বছরের ১৭ জুলাই। সেই সিরিজ শেষ হওয়ার পরই ভারতীয় দল সরাসরি ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের উদ্দেশে রওনা হবে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে এক দিনের সিরিজ শুরু হবে ২২ জুলাই। পরের দুই ম্যাচ হবে ২৪ এবং ২৭ জুলাই। তিনটি ম্যাচই অনুষ্ঠিত হবে পোর্ট অফ স্পেনের কুইনস পার্ক ওভালে (Queen’s Park Oval)। ফলে এক দিনের সিরিজের জন্য দুই দলকেই একই মাঠে পরপর তিনটি ম্যাচ খেলতে হবে।
এক দিনের সিরিজ শেষ হওয়ার দু’দিন পরেই শুরু হবে টি-টোয়েন্টি লড়াই। ২৯ জুলাই পোর্ট অফ স্পেনের ব্রায়ান লারা স্টেডিয়ামে (Brian Lara Stadium) হবে প্রথম টি-টোয়েন্টি। এরপর সিরিজের তৃতীয় ও চতুর্থ ম্যাচের আগে ভেন্যু বদলাবে দুই দল। ১ এবং ২ অগস্ট সেন্ট কিটসের ওয়ার্নার পার্কে (Warner Park) হবে পরের দুই টি-টোয়েন্টি। এর পর সিরিজের শেষ দুই ম্যাচের জন্য ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ় পাড়ি দেবে আমেরিকায়। ফ্লোরিডার ব্রোওয়ার্ড কাউন্টি স্টেডিয়ামে (Broward County Stadium) ৬ এবং ৭ অগস্ট অনুষ্ঠিত হবে চতুর্থ ও পঞ্চম টি-টোয়েন্টি। অর্থাৎ প্রায় আড়াই সপ্তাহের সফরে ভারতীয় দলকে তিনটি আলাদা ভেন্যু এবং দুই দেশের মাটিতে ম্যাচ খেলতে হবে।
সূচী অনুযায়ী, এক দিনের ম্যাচগুলি ভারতীয় সময় সন্ধে ৭টা থেকে শুরু হবে। টি-টোয়েন্টি ম্যাচ শুরু হবে রাত ৮টায়। ফলে ভারতীয় দর্শকদের জন্য ম্যাচগুলির সময়ও তুলনামূলক সুবিধাজনক রাখা হয়েছে। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টির রাতের সূচি দর্শকদের সরাসরি খেলা দেখার সুযোগ করে দেবে। আগামী বছর অক্টোবরের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে এক দিনের দলের কাঠামো গড়ে তোলার কাজ ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। অধিনায়ক শুভমন গিল (Shubman Gill), শ্রেয়াস আইয়ার (Shreyas Iyer), কেএল রাহুল (KL Rahul)-সহ দলের অভিজ্ঞ ও তরুণ ক্রিকেটারদের মধ্যে কারা বিশ্বকাপের পরিকল্পনায় থাকবেন, তা বোঝার ক্ষেত্রেও এই সিরিজ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে মিডল অর্ডার এবং ম্যাচের শেষ দিকের ব্যাটিং নিয়ে ভারতকে বিভিন্ন পরিকল্পনা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। এই প্রসঙ্গেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে চলতি এক দিনের সিরিজে ভারতের ব্যাটিং নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয় ম্যাচে ৪০০-র বেশি রান তাড়া করে ভারত জয় পেয়েছিল। আবার তৃতীয় ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজও ৩৫০-র বেশি রান তাড়া করে জিতে যায়। ফলে আধুনিক এক দিনের ক্রিকেটে জয়ের জন্য কত রান যথেষ্ট, সেই পুরনো ধারণা বদলে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভারতের মিডল অর্ডার ব্যাটার কেএল রাহুল (KL Rahul) জানিয়েছেন, দলের ভাবনায় এখন আরও বড় স্কোরের বিষয়টি রয়েছে। তাঁর মতে, প্রথমে ব্যাট করার সুযোগ পেলে ৩৩০ থেকে ৩৪০ রান একসময় যথেষ্ট বলে মনে করা হলেও বর্তমান ক্রিকেটের আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের যুগে সেই স্কোর সবসময় নিরাপদ নয়। তাঁর বক্তব্য, ভারতীয় ব্যাটারদের ৩৭০-৩৮০ রানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে ৪০০ রানের কাছাকাছি পৌঁছনোর মানসিকতা রাখতে হচ্ছে। রাহুলের কথায়, ‘এক দিনের ক্রিকেটে দলগুলি এখন অনায়াসে ৩৪০ বা ৩৫০ রান তাড়া করে ফেলছে। তাই আমাদের ভাবতে হচ্ছে কী ভাবে ৩৭০-৩৮০ রান করা যায় কিংবা স্কোরকে ৪০০-র দিকে নিয়ে যাওয়া যায়।’
মিডল অর্ডারে ব্যাট করার সময় নিজের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেছেন রাহুল। তাঁর মতে, পাঁচ বা ছয়ে নামা ব্যাটারের কাজ শুধু উইকেটে টিকে থাকা নয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত রান তোলার ক্ষমতাও প্রয়োজন। রাহুল জানিয়েছেন, ক্রিজে আসার পর বেশি সময় নিয়ে সেট হওয়ার পরিবর্তে শুরু থেকেই রাহুল রান তোলার গতি বজায় রাখার চেষ্টা করেন। প্রতি কয়েকটি বলের মধ্যে বাউন্ডারি বের করে রানরেট বাড়িয়ে রাখার দিকেও তাঁর নজর থাকে। বিশ্বকাপের প্রস্তুতির সঙ্গে এই পরিকল্পনার সম্পর্কও রয়েছে। রাহুল জানিয়েছেন, দলের কোচ ও অধিনায়কের কাছে খেলোয়াড়দের ভূমিকা সম্পর্কে পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্বকাপের সম্ভাব্য দলের ক্রিকেটারদের পর্যাপ্ত ম্যাচ খেলার সুযোগ দেওয়ার লক্ষ্যও রয়েছে। ফলে আগামী কয়েকটি সিরিজে ক্রিকেটারদের ব্যাটিং পজিশন, দায়িত্ব এবং ম্যাচ পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষমতা পরীক্ষা করা হতে পারে।
সম্প্রতি এক দিনের ক্রিকেটে পাঁচ বা ছয় নম্বরে ব্যাট করছেন রাহুল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে একটি ম্যাচে তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে ১২৯ রান। দীর্ঘ সময় ক্রিজে কাটানোর সেই ইনিংস নিয়ে সন্তুষ্ট রাহুল জানিয়েছেন, এক দিনের ক্রিকেটে আবার বড় সময় ধরে ব্যাট করার সুযোগ পেয়ে তাঁর ভাল লেগেছে। তাঁর মতে, দীর্ঘ ইনিংস খেলার অভ্যাস আরও বাড়ানো দরকার। রাহুল বলেছেন, ‘আমি ক্রিজে আরও বেশি সময় কাটাতে চাই। শেষ বার এক দিনের ক্রিকেটে এতটা সময় পেয়েছিলাম জানুয়ারিতে নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে। তার পর থেকে দীর্ঘ ইনিংস খেলার সুযোগ খুব বেশি পাইনি।’
এক দিনের ক্রিকেটে বল পুরনো হয়ে যাওয়ার পর ব্যাটিংয়ের ধরনও বদলে যায়। নতুন বলের গতি কাজে লাগানো তুলনামূলক সহজ হলেও পুরনো ও নরম বলে বড় শট খেলা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। রাহুল তাই এই পর্যায়ের ব্যাটিং নিয়েও আলাদা করে কাজ করছেন। তাঁর বক্তব্য, গতি থাকা বল খেলতে তিনি স্বচ্ছন্দ ও সেই সুবিধা কাজে লাগাতে পারেন। কিন্তু পুরনো বলে একই ধরনের আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করতে আরও বেশি অনুশীলন প্রয়োজন। রাহুলের কথায়, ‘শক্ত বল খেলতে ভাল লাগে। গতি কাজে লাগাতে পারি। নরম, পুরনো বলে খেলে সেই বলেও ছক্কা মারার অভ্যাস করতে চাই।’ উল্লেখ্য, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে আগামী বছরের সিরিজ তাই ভারতীয় দলের কাছে শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক সফর নয়, বিশ্বকাপের আগে দল গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হয়ে উঠতে পারে। এক দিনের ক্রিকেটে মাত্র তিনটি ম্যাচ থাকলেও প্রতিটি ম্যাচে ব্যাটিং অর্ডার, বোলিং পরিকল্পনা ও ম্যাচের শেষ পর্ব সামলানোর দক্ষতা যাচাই করার সুযোগ থাকবে। অন্য দিকে পাঁচটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে দলের সাদা বলের ক্রিকেটের আরও একটি দিক পরীক্ষা করা যাবে।
এই মুহূর্তে অবশ্য ভারতীয় দল চলতি ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ নিয়েই ব্যস্ত। এক দিনের সিরিজে ভারত ২-১ ব্যবধানে জয় পেয়েছে। তার পর টি-টোয়েন্টি সিরিজ শুরু হচ্ছে। অর্থাৎ দুই দেশের ক্রিকেট লড়াই একবার শেষ হওয়ার আগেই আগামী বছরের সফরের সূচী সামনে চলে এসেছে। বর্তমান সিরিজের অভিজ্ঞতা এবং ফলাফল আগামী দিনের পরিকল্পনাতেও প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৭ সালের বিশ্বকাপের আগে ভারতীয় দলের সামনে একাধিক সাদা বলের সিরিজ রয়েছে। তার মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরটি হবে দীর্ঘ সফরগুলির অন্যতম। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ থেকে ফ্লোরিডা, ভিন্ন পরিবেশ ও ভেন্যুতে খেলার অভিজ্ঞতা ক্রিকেটারদের প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে। বিশেষ করে বিশ্বকাপের আগে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া আর বড় রান তাড়া বা বড় স্কোর তৈরির অভ্যাস তৈরি করাই হবে ভারতীয় দলের অন্যতম লক্ষ্য। তিনটি এক দিনের ম্যাচ এবং পাঁচটি টি-টোয়েন্টি, এই আট ম্যাচের সফর তাই একাধিক কারণে নজরে থাকবে। শুভমন গিল ও শ্রেয়াস আইয়ারদের মতো ব্যাটারদের পাশাপাশি কেএল রাহুলের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের ভূমিকা নিয়েও আগ্রহ থাকবে। বিশ্বকাপের দল গঠনের সময় কে কোন জায়গায় খেলবেন, সেই ছবিও ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে পারে। তার আগে ক্যারিবিয়ান সফরেই ভারতীয় দলের ব্যাটিং শক্তি এবং সাদা বলের পরিকল্পনার আরও একটি বড় পরীক্ষা হতে চলেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Shubman Gill captaincy, India ODI World Cup 2027 | বিশ্বকাপের আগে আর পরীক্ষা নয়, সেরা একাদশ চান শুভমন! পেস বোলিং নিয়ে বড় চিন্তা ভারতের




