সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটে বড় পরিবর্তন। আচমকাই তিন ধরনের ক্রিকেট থেকেই অধিনায়কত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন হরমনপ্রীত কৌর (Harmanpreet Kaur)। মঙ্গলবার সমাজমাধ্যমে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, ভারতীয় দলের নেতৃত্বের অধ্যায় এবার শেষ করতে চান। তবে ক্রিকেট থেকে অবসর নিচ্ছেন না হরমনপ্রীত। খেলোয়াড় হিসেবে ভারতীয় দলের হয়ে তাঁর যাত্রা অব্যাহত থাকবে। তাঁর জায়গায় ভারতের নতুন অধিনায়ক হিসেবে স্মৃতি মন্ধানাকে (Smriti Mandhana) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বোর্ড।

হরমনপ্রীতের সিদ্ধান্ত সামনে আসতেই ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটে নতুন যুগের সূচনার আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে দলের নেতৃত্ব দেওয়া হরমনপ্রীতের অধিনায়কত্বে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেয়েছে। তাঁর নেতৃত্বের সময়েই ভারত ২০২৫ সালের এক দিনের বিশ্বকাপ (ICC Women’s Cricket World Cup 2025) জিতেছে। এ ছাড়াও ২০২২ এবং ২০২৬ সালের এশিয়ান গেমসে (Asian Games) ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল সোনা জয়ের নজির গড়েছে। ফলে নেতৃত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্তটি শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের একটি দীর্ঘ অধ্যায়েরও সমাপ্তি। সমাজমাধ্যমে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানাতে গিয়ে হরমনপ্রীত জানিয়েছেন, অধিনায়কত্ব ছাড়া তাঁর কাছে মোটেই সহজ ছিল না। বছরের পর বছর ধরে দলের নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর আবেগ, পরিশ্রম, ত্যাগ এবং অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় নিজের ব্যক্তিগত লক্ষ্য এবং পারফরম্যান্সের বিষয়ও পিছনে রাখতে হয়েছে তাঁকে। দলের প্রয়োজনকে নিজের ব্যক্তিগত সাফল্যের আগে রাখাই ছিল তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম নীতি।
হরমনপ্রীতের বক্তব্যের মূল সুর ছিল, অধিনায়কত্ব তাঁর কাছে শুধু একটি পদ ছিল না। মাঠে সিদ্ধান্ত নেওয়া, সতীর্থদের পাশে থাকা, কঠিন সময়ে দলকে ধরে রাখা এবং নতুন ক্রিকেটারদের নিজেদের সামর্থ্য প্রকাশের সুযোগ করে দেওয়া ইত্যাদি সবকিছুকেই তিনি দায়িত্বের অংশ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, অধিনায়ক হিসেবে নেওয়া অনেক সিদ্ধান্ত হয়তো সেই সময়ে সকলের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য হয়নি। কিন্তু প্রতিটি সিদ্ধান্তের পিছনে দলের উন্নতিই ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য। নিজের দীর্ঘ নেতৃত্বপর্বের কথা বলতে গিয়ে হরমনপ্রীত জানিয়েছেন, সাফল্যের পাশাপাশি তাঁকে ব্যর্থতার কঠিন সময়ও পার করতে হয়েছে। বড় ম্যাচে হতাশা, সমালোচনা, দলের খারাপ সময় এবং ব্যক্তিগত প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে বিশ্বকাপ জয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্য আর দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার গর্ব। সেই কারণেই অধিনায়কত্ব ছাড়ার মুহূর্তে তাঁর মনে একই সঙ্গে আবেগ এবং তৃপ্তি কাজ করছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

হরমনপ্রীতের কথায়, ‘অধিনায়কত্ব ছেড়ে দেওয়া সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। এই দায়িত্বের সঙ্গে আমার জীবনের বহু বছর, অসংখ্য স্মৃতি এবং অনেক ত্যাগ জড়িয়ে রয়েছে। দলের জন্য যা করার ছিল, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সবটাই দেওয়ার চেষ্টা করেছি। অনেক সময় ব্যক্তিগত লক্ষ্যকে পিছনে রেখে দলের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়েছি। এখন মনে হচ্ছে, দায়িত্ব পালনের সময়টা শেষ করে নতুন অধ্যায়ে যাওয়ার সময় এসেছে।’ ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশাবাদী হরমনপ্রীত। তাঁর মতে, বর্তমান দলে প্রতিভার অভাব নেই। তরুণ ও অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের সমন্বয়ে তৈরি এই দল ভবিষ্যতে আরও সাফল্য পেতে পারে। তাই নেতৃত্ব ছাড়ার সময় তাঁর সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা হল, দলকে তিনি এমন একটি অবস্থায় রেখে যাচ্ছেন যেখানে পরবর্তী প্রজন্ম দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত। হরমনপ্রীত আরও জানিয়েছেন, অধিনায়কত্ব শেষ হলেও ভারতীয় ক্রিকেটের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হচ্ছে না। খেলোয়াড় হিসেবে দেশের হয়ে মাঠে নামার ইচ্ছা তাঁর এখনও রয়েছে। অর্থাৎ, নেতৃত্বের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালেও ব্যাটার হিসেবে তাঁকে ভারতীয় দলের জার্সিতে দেখা যেতে পারে। দলের সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কেরিয়ারও আগামী দিনে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে থাকবে।
তাঁর বক্তব্যে সতীর্থ, কোচিং স্টাফ, দলের পরিচালনা ব্যবস্থা, বিসিসিআই (BCCI), পরিবার এবং সমর্থকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা উঠে এসেছে। দীর্ঘ সময়ে যাঁরা তাঁর পাশে থেকেছেন, তাঁদের প্রত্যেককে ধন্যবাদ জানিয়েছেন হরমনপ্রীত। তাঁর বক্তব্যের শেষাংশে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত, অধিনায়কত্বের দায়িত্ব ছাড়লেও ক্রিকেটজীবনের যাত্রা থামছে না। উল্লেখ্য, হরমনপ্রীতের জায়গায় উত্তরসূরি হিসেবে অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন স্মৃতি মন্ধানা। ভারতীয় দলের অন্যতম পরিচিত ব্যাটার মন্ধানা দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। দলের সহ-অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব সামলানোর অভিজ্ঞতাও ছিল তাঁর। হরমনপ্রীতের অনুপস্থিতিতে বিভিন্ন সময়ে ভারতীয় দলকে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন।

শুধু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেই নয়, ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটেও মন্ধানার নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা রয়েছে। মহিলা প্রিমিয়ার লিগে (Women’s Premier League) রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু (Royal Challengers Bengaluru Women) দলের অধিনায়ক হিসেবে তাঁর পারফরম্যান্স ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে। দলের চাপ সামলানো, ম্যাচ পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সতীর্থদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুকে মহিলা প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জেতানোর পর মন্ধানার নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা আরও বেড়েছে। ফলে জাতীয় দলের দায়িত্ব তাঁর হাতে এলে আন্তর্জাতিক ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট দুই ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারবেন তিনি।
হরমনপ্রীতের নেতৃত্বের সময় ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের পথচলায় বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য দিকও তৈরি হয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে দল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একাধিক বড় মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের এক দিনের বিশ্বকাপ জয় তাঁর অধিনায়কত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে থেকে যাবে। সেই বিশ্বকাপ জয়ের পরে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছিল। একই সঙ্গে এশিয়ান গেমসে সাফল্যও তাঁর নেতৃত্বপর্বকে সমৃদ্ধ করেছে। দীর্ঘ সময় নেতৃত্বে থাকার ফলে চাপও কম ছিল না। মহিলা ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় দলের অধিনায়ককে ঘিরে প্রত্যাশাও বেড়েছে। বড় ম্যাচে দল প্রত্যাশিত ফল না করলে অধিনায়কের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আবার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে জয় এলে সেই সাফল্যের বড় অংশও অধিনায়কের কৃতিত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এই চাপের মধ্যেই দীর্ঘ সময় ভারতীয় দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন হরমনপ্রীত।

এখন সেই জায়গায় পরিবর্তনের পালা। নতুন অধিনায়ক হিসেবে স্মৃতি মন্ধানা দায়িত্ব মহিলা ক্রিকেটে নেতৃত্বের ধরনেও কিছু পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। মন্ধানা নিজে বিশ্বের অন্যতম পরিচিত বাঁহাতি ব্যাটার। দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। একই সঙ্গে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে বিভিন্ন দেশের ক্রিকেটারদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও তৈরি হয়েছে। হরমনপ্রীত নেতৃত্ব ছাড়লেও কোনওভাবেই ভারতীয় দলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের শেষ হচ্ছে না। তিনি নিজেই জানিয়েছেন, নেতৃত্বের দায়িত্ব ছেড়ে দিলেও দেশের হয়ে ক্রিকেট খেলার ইচ্ছা রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে একই ড্রেসিংরুমে নতুন অধিনায়ক মন্ধানার সঙ্গে খেলতে দেখা যেতে পারে তাঁকে। একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার হিসেবে তাঁর পরামর্শ ও মাঠের অভিজ্ঞতা নতুন নেতৃত্বের জন্যও কাজে আসতে পারে।
ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটে অধিনায়ক বদল সাধারণ কোনও ঘটনা নয়। কারণ নেতৃত্বের সঙ্গে দলের কৌশল, ড্রেসিংরুমের পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও জড়িত। হরমনপ্রীতের দীর্ঘ সময়ের নেতৃত্বের পরে মন্ধানা যদি দায়িত্ব পান, তবে তাঁকে একই সঙ্গে দলের সিনিয়র ক্রিকেটারদের সামলানো ও নতুন প্রজন্মকে সামনে নিয়ে যাওয়ার কাজ করতে হবে। বিশ্বকাপ ও এশিয়ান গেমসের মতো বড় মঞ্চে সাফল্যের ধারাও ধরে রাখার চাপ থাকবে নতুন অধিনায়কের ওপর হরমনপ্রীতের সিদ্ধান্ত তাই একদিকে আবেগের, অন্য দিকে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের পরবর্তী অধ্যায়ের সূচনাও। দীর্ঘদিনের অধিনায়ক এবার নেতৃত্বের বোঝা নামিয়ে শুধু ক্রিকেটার হিসেবে নিজের খেলায় মন দিতে পারবেন। আর ভারতীয় ক্রিকেটে শুরু হবে নতুন নেতৃত্বের অপেক্ষা। আর নতুন দায়িত্বে স্মৃতি মন্ধানা। ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটে হরমনপ্রীত-পরবর্তী যুগের সূচনায় স্মৃতির নেতৃত্বের দায়িত্ব যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : WPL 2027 start date, WPL 2027 auction date, WPL auction 28 October 2026 | হরমনপ্রীতদের WPL শুরু ১৪ জানুয়ারি, কোচিতে নিলাম! রিটেনশনের শেষ দিনও ঘোষণা বিসিসিআইয়ের




