সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : কলকাতা ও শিবপুরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই শিক্ষার পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করার পথে বড় পদক্ষেপ। টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস বা টিসিএস (TCS ) পশ্চিমবঙ্গের দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এআই সেন্টার অব এক্সিলেন্স গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। একটি কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে কলকাতার ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বা আইইএম-এ (Institute of Engineering and Management)। অন্য কেন্দ্রটি তৈরি হচ্ছে শিবপুরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বা আইআইইএসটি-তে (Indian Institute of Engineering Science and Technology)। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের এই যৌথ উদ্যোগে পড়ুয়াদের এআই প্রশিক্ষণ, গবেষণা, শিল্পভিত্তিক প্রকল্প এবং ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের প্রস্তুতিতে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুধু তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। স্বাস্থ্য পরিষেবা, কৃষি, শিক্ষা, পরিবহণ, উৎপাদন, আর্থিক পরিষেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সরকারি পরিষেবাতেও এআই-ভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। ফলে এই প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত কর্মীর চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। সেই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় ও ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়াদের শিল্পক্ষেত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রস্তুত করার লক্ষ্যেই টিসিএসের সঙ্গে এই ধরনের অংশীদারিত্ব তৈরি হচ্ছে।
আরও পড়ুন : GPT-6.1 Astra | GPT-6.1 Astra প্রকাশ করছে না OpenAI, নিরাপত্তা পরীক্ষায় আটকাল নতুন AI মডেল
কলকাতার আইইএমের সঙ্গে টিসিএসের তিন বছরের সহযোগিতার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই অংশীদারিত্বের অধীনে তৈরি হতে চলা এআই সেন্টার অব এক্সিলেন্সে একাধিক ধরনের প্রশিক্ষণ ও গবেষণামূলক কর্মকাণ্ড চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োগভিত্তিক এআই শিক্ষা থেকে শুরু করে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পড়ুয়াদের সার্টিফিকেশন, যৌথ গবেষণা ও বাস্তব শিল্পসমস্যার প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরির কাজ হবে এই উদ্যোগের অংশ। ফলে শুধু পাঠ্যবই বা শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষার্থীরা সরাসরি শিল্পক্ষেত্রের সমস্যাকে সামনে রেখে কাজ করার সুযোগ পেতে পারেন। এই কেন্দ্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে চলেছে প্রুফ অব কনসেপ্ট বা POC তৈরি। কোনও প্রযুক্তিগত ধারণা বাস্তবে কতটা কার্যকর হতে পারে, তার পরীক্ষামূলক প্রয়োগের মাধ্যমে সেই বিষয়টি যাচাই করা হয় প্রুফ অব কনসেপ্টের মাধ্যমে। পড়ুয়ারা যদি টিসিএসের মেন্টরদের সহায়তায় এই ধরনের প্রকল্পে কাজ করেন, তা হলে প্রযুক্তি তৈরির পাশাপাশি সেটিকে বাস্তব পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করার অভিজ্ঞতাও অর্জন করতে পারবেন।
হ্যাকাথনও এই সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধান তৈরি করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দলগত কাজ, পরিকল্পনা, কোডিং এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা তৈরি করা যায়। টিসিএসের মেন্টরশিপে এই ধরনের প্রকল্পের সুযোগ থাকলে পড়ুয়াদের কাছে শিল্পক্ষেত্রের বাস্তব কাজের ধরনও আরও কাছ থেকে পৌঁছবে। অন্য দিকে, শিবপুরের আইআইইএসটি-তেও এআই গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন পরিকাঠামো তৈরি হচ্ছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর টিসিএস এবং আইআইইএসটির মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। সেই চুক্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের হাই-পারফরম্যান্স কম্পিউটিং ল্যাবরেটরিতে এআই সেন্টার অব এক্সিলেন্স স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং পরিকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে উন্নত এআই গবেষণা ও শিল্পভিত্তিক প্রযুক্তি তৈরির সুযোগ তৈরি করাই এর অন্যতম লক্ষ্য।
আইআইইএসটি শিবপুরের এই কেন্দ্রের কাজ মূলত চারটি ক্ষেত্রে এগোনোর পরিকল্পনা রয়েছে। দক্ষতা উন্নয়ন, যৌথ গবেষণা, শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী এআই সমাধান তৈরি এবং উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগকে কেন্দ্রের প্রধান স্তম্ভ হিসেবে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ পড়াশোনা শেষ করে শুধু চাকরির বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নয়, প্রযুক্তিনির্ভর নতুন উদ্যোগ তৈরির পথও পড়ুয়াদের সামনে খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। গবেষণার ক্ষেত্রেও এই কেন্দ্রগুলিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ হতে পারে। প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণ বা Natural Language Processing, কম্পিউটার ভিশন, ইমেজ প্রসেসিং আর উন্নত ডেটা অ্যানালিটিক্সের মতো ক্ষেত্রে গবেষণার সুযোগ তৈরি হবে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নানা ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তিগুলির গুরুত্ব রয়েছে। ফলে পড়ুয়ারা গবেষণার পাশাপাশি বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রেও নিজেদের দক্ষতা তৈরি করার সুযোগ পাবেন।
আইআইইএসটির উদ্যোগে ইন্টার্নশিপের সুযোগের কথাও সামনে এসেছে। শিল্প সংস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে কাজ করার ফলে পড়ুয়ারা প্রযুক্তি শিল্পের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন। পাশাপাশি স্টার্টআপ তৈরির জন্য মেন্টরশিপ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। কোনও প্রযুক্তিগত ধারণাকে কী ভাবে পণ্য বা পরিষেবায় রূপ দেওয়া যায়, বাজারের প্রয়োজন কী ভাবে বোঝা যায় এবং নতুন উদ্যোগ তৈরির ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিকল্পনা দরকার, এই ধরনের বিষয়েও শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা পেতে পারেন। কলকাতা ও শিবপুরে দু’টি এআই কেন্দ্র তৈরির উদ্যোগের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প সংস্থার মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়াদের অনেক সময় পাঠ্যক্রমের মধ্যে প্রযুক্তির তাত্ত্বিক দিক শেখানো হলেও শিল্পক্ষেত্রে সেই প্রযুক্তি কী ভাবে ব্যবহার করা হয়, তার অভিজ্ঞতা আলাদা। সেই ব্যবধান কমানোর লক্ষ্যেই টিসিএসের মতো একটি বড় তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার সঙ্গে সরাসরি সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। টিসিএসের আন্তর্জাতিক স্তরে কাজের অভিজ্ঞতা, আইইএম ও আইআইইএসটির শিক্ষা ও গবেষণার পরিকাঠামো একসঙ্গে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে শিল্পক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অনুযায়ী প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে গবেষণাগারে তৈরি কোনও ধারণাকে বাস্তব প্রয়োগের দিকে নিয়ে যাওয়ার সুযোগও বাড়তে পারে।
প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়টিও এই উদ্যোগে গুরুত্ব পাচ্ছে। এআই প্রযুক্তি দ্রুত বদলাচ্ছে। ফলে শিক্ষকরা নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হলে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানেও তার প্রভাব পড়তে পারে। প্রশিক্ষণ ও যৌথ গবেষণার মাধ্যমে শিক্ষকেরা আধুনিক এআই প্রযুক্তি, তার প্রয়োগ এবং শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহারের ধরন সম্পর্কে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন। এর প্রভাব পড়তে পারে পড়ুয়াদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও। এআই, ডেটা অ্যানালিটিক্স, কম্পিউটার ভিশন, প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণ ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিংয়ের মতো ক্ষেত্রে দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে। কলেজের পড়াশোনার পাশাপাশি যদি পড়ুয়ারা শিল্পভিত্তিক প্রকল্প, ইন্টার্নশিপ, হ্যাকাথন ও সার্টিফিকেশনের সুযোগ পান, তা হলে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের আগে তাঁদের হাতে বাস্তব প্রকল্পের অভিজ্ঞতাও থাকবে। পশ্চিমবঙ্গের প্রযুক্তি শিক্ষার ক্ষেত্রে কলকাতা ও শিবপুরের নিজস্ব ঐতিহ্য রয়েছে। এক দিকে কলকাতায় আইইএমের মতো প্রতিষ্ঠান এবং অন্য দিকে দেশের অন্যতম পুরনো প্রযুক্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আইআইইএসটি শিবপুর। এই দুই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে টিসিএসের সহযোগিতা তাই রাজ্যের প্রযুক্তি শিক্ষার পরিসরে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোগ তৈরি করছে।
এই উদ্যোগকে ডিজিটাল ইন্ডিয়া ও বিকশিত ভারত ২০৪৭ -এর বৃহত্তর প্রযুক্তিগত লক্ষ্যের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে। তবে প্রকল্পের বাস্তব ফল নির্ভর করবে কেন্দ্রগুলি কত দ্রুত পূর্ণমাত্রায় কাজ শুরু করে, কতজন পড়ুয়া প্রশিক্ষণের সুযোগ পান, গবেষণার প্রকল্প কতটা এগোয় এবং শিল্পক্ষেত্রে তৈরি প্রযুক্তি কতটা বাস্তব প্রয়োগে পৌঁছতে পারে তার উপর। উল্লেখ্য, এআই-নির্ভর প্রযুক্তি যত দ্রুত বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রবেশ করছে, ততই দক্ষ মানবসম্পদের প্রয়োজন বাড়ছে। সেই জায়গায় কলকাতা ও শিবপুরে টিসিএসের দুটি এআই সেন্টার অব এক্সিলেন্স শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গবেষক এবং শিল্প সংস্থার মধ্যে যোগাযোগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে গবেষণা, ইন্টার্নশিপ, হ্যাকাথন, সার্টিফিকেশন এবং স্টার্টআপ মেন্টরশিপের সুযোগ তৈরি হলে প্রযুক্তি শিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের দূরত্বও কমতে পারে। আগামী দিনে এই দুই কেন্দ্র থেকে তৈরি হওয়া প্রকল্প, গবেষণা ও নতুন প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগই দেখাবে পশ্চিমবঙ্গের এআই শিক্ষায় এই অংশীদারিত্ব কতটা কার্যকর হয়ে উঠল।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : BRICS Summit Delhi, Narendra Modi Vladimir Putin Xi Jinping | ব্রিক্সের মঞ্চে মোদী-পুতিন-শি, আমেরিকার নীতির আবহে তাৎপর্যপূর্ণ তিন রাষ্ট্রনেতার ছবি




