সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুর্শিদাবাদ: রেজিনগর উপনির্বাচনের (Rejinagar By Election) আগে মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক মাটিতে উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। এক দিকে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের বিতর্কিত মন্তব্যকে ঘিরে টানাপড়েন, অন্য দিকে সেই মন্তব্যের জবাবে সরাসরি আক্রমণের পথে হাঁটলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। বৃহস্পতিবার রেজিনগরে বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকারের সমর্থনে প্রচারে গিয়ে হুমায়ুনকে নিশানা করেন তিনি বলে উল্লেখ। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে হুমায়ুনের রাজনৈতিক অতীত, দলবদল এবং রেজিনগর আসন ছেড়ে দেওয়ার প্রসঙ্গও। পাশাপাশি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) ও তৃণমূল কংগ্রেসকেও আক্রমণ করেন শুভেন্দু। হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সম্প্রতি এক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে শুভেন্দুর মৃত্যু কামনা করে মন্তব্য করেছিলেন তিনি। সেই বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক তৈরি হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগও দায়ের হয়। পরে হুমায়ুন নিজেই দাবি করেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রীর মৃত্যুকামনা করেননি। তবে তার মধ্যেই রেজিনগরের প্রচারসভা থেকে বিষয়টি সামনে এনে হুমায়ুনকে পাল্টা আক্রমণ করলেন শুভেন্দু।
জনসভায় শুভেন্দু বলেন, রাজনীতিতে মতের লড়াই, তর্ক-বিতর্ক কিংবা সমালোচনা থাকতেই পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে কারও মৃত্যু কামনা করা নিয়ে তিনি আপত্তি জানান। হুমায়ুনের বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে তাঁর দাবি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হলেও এমন ভাষা ব্যবহার করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। এরপরই রেজিনগরের ভোটারদের উদ্দেশে শুভেন্দুর মন্তব্য, ‘বিচারের ভার রেজিনগরের গণদেবতার।’ শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন হুমায়ুনের রাজনৈতিক পথচলাও। তাঁর অভিযোগ, হুমায়ুন যে রাজনৈতিক দল বা নেতার কাছ থেকে সুযোগ পেয়েছেন, পরবর্তী সময়ে তাঁদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছেন। কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী (Adhir Ranjan Chowdhury) -এর প্রসঙ্গ টেনে শুভেন্দু দাবি করেন, এক সময় কংগ্রেসের সঙ্গে থাকা হুমায়ুন পরে বিজেপিতে যান, সেখান থেকেও সরে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। পরে নিজের রাজনৈতিক দল গড়ে রেজিনগর থেকে লড়াইয়ের ময়দানে নামেন। এই রাজনৈতিক যাত্রাপথকে সামনে রেখেই হুমায়ুনকে আক্রমণ করেন বিজেপির এই নেতা।
হুমায়ুনের দলবদল নিয়ে আক্রমণ করতে গিয়ে শুভেন্দু বলেন, রাজনৈতিক জীবনে একাধিক শিবিরে থাকা ও পরে সেই শিবিরের নেতৃত্বের বিরোধিতা করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। হুমায়ুনের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। ধর্মীয় আবেগকে নির্বাচনী রাজনীতিতে ব্যবহার করার অভিযোগও তোলেন শুভেন্দু। যদিও এই অভিযোগগুলির রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়ে দুই শিবিরের বক্তব্য এক নয়। এবারের রেজিনগর উপনির্বাচনের রাজনৈতিক সমীকরণে হুমায়ুনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি রেজিনগর এবং নওদা, এই দুই কেন্দ্র থেকেই জয় পেয়েছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী দু’টির মধ্যে একটি আসন ছাড়তে হওয়ায় রেজিনগর আসনটি ছেড়ে দেন তিনি। ফলে সেখানে উপনির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ৬ অক্টোবর রেজিনগরে ভোটগ্রহণ হবে এবং ৯ অক্টোবর গণনা।
রেজিনগর আসনে নিজের জায়গায় হুমায়ুন তাঁর ছেলে গোলাম নবি আজাদকে (Golam Nabi Azad) প্রার্থী করেছেন। ফলে এই উপনির্বাচন তাঁর নিজের রাজনৈতিক প্রভাবেরও পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজেপির তরফে প্রার্থী করা হয়েছে শাখারভ সরকারকে। কংগ্রেসের প্রার্থী মহম্মদ আবদুল্লাহি কাফি ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরী। বামেদের তরফেও প্রার্থী রয়েছে। ফলে রেজিনগরে বহু-কোণী লড়াইয়ের আবহ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতেই বৃহস্পতিবারের প্রচারে হুমায়ুনের বিরুদ্ধে আরও একাধিক অভিযোগ তোলেন শুভেন্দু। নওদার বিধায়ক হওয়ার পর গত কয়েক মাসে এলাকার উন্নয়নে তিনি কী করেছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিজেপি নেতা। শুভেন্দুর দাবি, বিধায়ক হওয়ার পর নওদায় উল্লেখযোগ্য কাজ করতে পারেননি হুমায়ুন। তাঁর বক্তব্য, পাঁচ মাসে একটি ইটও গাঁথার মতো কাজ হয়নি এবং আগামী দিনেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না।
অন্য দিকে, রেজিনগরকে ঘিরে হুমায়ুনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর বিরোধীরা। যে আসন থেকে জয় পাওয়ার পরে তিনি সেটি ছেড়ে দিয়েছেন, সেই কেন্দ্রেই এখন তাঁর পরিবারের সদস্য প্রার্থী। ফলে উপনির্বাচনের প্রচারে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উত্তরাধিকার থেকে শুরু করে এলাকার উন্নয়ন আলোচনায় উঠে আসছে। শুধু হুমায়ুন নয়, এ দিনের সভা থেকে তৃণমূল কংগ্রেসকেও নিশানা করেন শুভেন্দু অধিকারী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দলের ভবিষ্যৎ নিয়েও কটাক্ষ করেন তিনি। তাঁর দাবি, রাজ্যে তৃণমূলের রাজনৈতিক প্রভাব কমে এসেছে। দলের নাম, সাংগঠনিক অবস্থান ও নেতৃত্বকে নিয়ে কটাক্ষ করে শুভেন্দু বলেন, ভোটের ফলের মাধ্যমে মানুষ তার জবাব দেবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব নিয়েও তিনি মন্তব্য করেন। শুভেন্দুর এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে রেজিনগর উপনির্বাচন যে শুধুমাত্র স্থানীয় প্রার্থী বা আসন ধরে লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা আরও এক বার সামনে এল। রাজ্যের শাসক দল, বিজেপি ও হুমায়ুন কবীরের দল, তিন পক্ষের রাজনৈতিক অবস্থানকে ঘিরে প্রচারে একের পর এক আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ চলছে। নির্বাচন যত এগোচ্ছে, ততই ব্যক্তিগত মন্তব্য এবং রাজনৈতিক অতীত প্রচারের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠছে।
এদিনের প্রচারে আর একটি ঘটনা বিশেষ ভাবে সামনে আসে। রেজিনগরে যাওয়ার পথে শুভেন্দু এমন একটি পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন, যাদের শিশু সদস্যা সম্প্রতি মিছিলের ভিড়ে পদপিষ্ট হয়ে মারা গিয়েছে বলে অভিযোগ। শিশুটির নাম জেসমিনা মল্লিক (Jesmina Mallik)। পরিবারের সঙ্গে দেখা করে তাঁর বাবা দুলাল মল্লিকের (Dulal Mallik) সঙ্গে কথা বলেন শুভেন্দু। ঘটনাটি ঘটে প্রচারের সময় মিছিলের মধ্যে থেকে লজেন্স ছোড়াকে কেন্দ্র করে বলে অভিযোগ। লজেন্স কুড়োতে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে পড়ে যায় শিশুটি। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে কলকাতার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয় বলে পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। পরিবারের সঙ্গে দেখা করার পরে শুভেন্দু বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধি চালু থাকায় এই মুহূর্তে সরকারিভাবে আর্থিক সাহায্য করার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। ভোটের পরে তিনি বিষয়টি দেখার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে রেজিনগরের বিজেপি কর্মীদের শিশুটির পরিবারের পরিচয় ও যোগাযোগের তথ্য জেলাশাসকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেন। শিশুমৃত্যুর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেও রাজনৈতিক প্রশ্ন উঠেছে। প্রচারমিছিলের ব্যবস্থাপনা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও নির্বাচনী কর্মসূচীতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় কার, তা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য আলাদা। ফলে প্রশাসনিক তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট তথ্য সামনে আসার পরই ঘটনার পূর্ণ চিত্র পাওয়া সম্ভব।
রেজিনগরের ভোট একাধিক রাজনৈতিক সংঘাতের মঞ্চ হয়ে উঠেছে। হুমায়ুন কবীরের বিতর্কিত মন্তব্য, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, শুভেন্দু অধিকারীর পাল্টা আক্রমণ, তৃণমূলকে নিয়ে বিজেপির বক্তব্য ও শিশুমৃত্যুর ঘটন ইত্যাদি নিয়ে প্রচারের ভাষা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এর মধ্যেই ৬ অক্টোবর ভোট দিতে যাবেন রেজিনগরের ভোটাররা। নির্বাচন কমিশনের সূচী অনুযায়ী ৯ অক্টোবর ভোটের ফল প্রকাশ হবে। কিন্তু, ভোটের আগে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য ঘিরে যতই উত্তাপ বাড়ুক, শেষ পর্যন্ত রেজিনগরের মানুষ কোন রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করবেন, তার উত্তর মিলবে ভোটের বাক্সেই। আপাতত প্রচারের মঞ্চে শুভেন্দু-হুমায়ুনের সংঘাতই রেজিনগর উপনির্বাচনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari on Annapurna Diwas | West Bengal Annapurna Yojana : ভাতা নয়, এবার সংস্কারের সরকার! অন্নপূর্ণা দিবসে শুভেন্দুর নিশানায় মমতা, মহিলাদের জন্য একগুচ্ছ ঘোষণা




