সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা ১৯ আগস্ট : উচ্চ প্রাথমিকে শারীরশিক্ষা ও কর্মশিক্ষার শিক্ষক নিয়োগ ঘিরে ফের বড় মোড়। পূর্বতন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের আমলে অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা চাকরিপ্রার্থীদের নিয়োগের জন্য তৈরি করা ১৬০০টি অতিরিক্ত বা সুপারনিউমেরারি (Supernumerary) পদ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার করে নিল বর্তমান শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) সরকার। বুধবার কলকাতা হাই কোর্টে রাজ্যের তরফে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। ফলে ২০২২ সালে তৈরি হওয়া ওই অতিরিক্ত পদগুলির ভিত্তিতে উচ্চ প্রাথমিকের নিয়োগ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আপাতত বন্ধ হয়ে গেল। আদালতের পরবর্তী নির্দেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে সংশ্লিষ্ট চাকরিপ্রার্থীদের।
উচ্চ প্রাথমিকের (Upper Primary) শারীরশিক্ষা ও কর্মশিক্ষা বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে জটিলতা চলছিল। অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা প্রার্থীদের নিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে ২০২২ সালে তৎকালীন রাজ্য সরকার অতিরিক্ত পদ তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারি নথি অনুযায়ী, ১৬০০টি সুপারনিউমেরারি পদের মধ্যে ৭৫০টি কর্মশিক্ষা এবং ৮৫০টি শারীরশিক্ষার সহকারী শিক্ষক পদ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। অপেক্ষমাণ তালিকার প্রার্থীদের নিয়োগের পথ তৈরি করাই ছিল এই সিদ্ধান্তের অন্যতম উদ্দেশ্য। ২০২২ সালের ১৯ মে রাজ্য সরকারের স্কুলশিক্ষা দফতর সুপারনিউমেরারি পদ তৈরির বিষয়ে নির্দেশ জারি করেছিল। সেই সিদ্ধান্তের আওতায় শুধু উচ্চ প্রাথমিকের শারীরশিক্ষা ও কর্মশিক্ষা নয়, বিভিন্ন স্তরে শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মীর জন্য মোট ৬৮৬১টি অতিরিক্ত পদ তৈরির কথা বলা হয়েছিল। সরকারি সিদ্ধান্তে এই পদগুলিতে অপেক্ষমাণ প্রার্থীদের নিয়োগের ব্যবস্থা রাখার কথা জানানো হয়েছিল।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই অতিরিক্ত পদ তৈরি নিয়ে আইনি প্রশ্ন ওঠে। কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর একক বেঞ্চে বিষয়টি যায়। সেখানে আদালত নিয়মিত নিয়োগের মতো করে সুপারনিউমেরারি পদ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানায়। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, কোনও নির্দিষ্ট ও ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ছাড়া নিয়মিত নিয়োগের বিকল্প হিসেবে এ ধরনের অতিরিক্ত পদ তৈরি করা যায় না। ফলে রাজ্যের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। একক বেঞ্চের সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে তৎকালীন রাজ্য সরকার ডিভিশন বেঞ্চে যায়। সেই মামলাই বুধবার বিচারপতি রাজাশেখর মান্থার (Rajasekhar Mantha) বেঞ্চে শুনানির জন্য ওঠে। কিন্তু শুনানির সময় রাজ্যের তরফে জানিয়ে দেওয়া হয়, বর্তমান সরকার আগের সরকারের জারি করা ওই দুই বিজ্ঞপ্তি অনুসারে আর এগোতে চাইছে না। রাজ্য সরকার নিজেই বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে বলে আদালতকে জানানো হয়।
এর ফলে মামলার গতিপথও নতুন মাত্রা পেল। পূর্বতন সরকারের সিদ্ধান্ত বহাল রাখার জন্য যে আইনি লড়াই চলছিল, বর্তমান সরকার সেই অবস্থান থেকে সরে দাঁড়াল। অর্থাৎ ২০২২ সালে তৈরি করা ১৬০০টি অতিরিক্ত পদকে ভিত্তি করে নিয়োগ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে পরিকল্পনা ছিল, তা এখন আর বর্তমান সরকারের প্রশাসনিক অবস্থানের অংশ নয়। বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীদের হয়ে মামলায় সওয়াল করেন আইনজীবী ফিরদৌস শামিম (Firdous Shamim)। উচ্চ প্রাথমিকের এই নিয়োগ জটিলতার পেছনে রয়েছে রাজ্যের স্কুলশিক্ষক নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি টানাপোড়েন। ২০১৬ সালের স্কুল সার্ভিস কমিশনের (SSC) নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। শীর্ষ আদালতের নির্দেশে ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেই বৃহত্তর নিয়োগ মামলার আবহেই অপেক্ষমাণ প্রার্থীদের জন্য অতিরিক্ত পদ তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তৎকালীন সরকার।
২০২২ সালের ১৯ মে রাজ্য সরকার যে ৬৮৬১টি সুপারনিউমেরারি পদ তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার মধ্যে ১৬০০টি ছিল শারীরশিক্ষা ও কর্মশিক্ষার সহকারী শিক্ষক পদ। সরকারী আদেশে অপেক্ষমাণ প্রার্থীদের নিয়োগের কথা বলা হয়েছিল এবং বিষয়টি আদালতে চলা মামলাগুলির ফলাফলের সাপেক্ষে রাখার কথাও উল্লেখ ছিল। এই অতিরিক্ত পদ তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে আইনি বিতর্ক আরও বাড়ে। সুপ্রিম কোর্ট ২০২৪ সালে সংশ্লিষ্ট মামলায় কলকাতা হাই কোর্টের সুপারনিউমেরারি পদ সংক্রান্ত সিবিআই তদন্তের নির্দেশের একটি অংশ বাতিল করেছিল। তবে অতিরিক্ত পদ তৈরির প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে হাই কোর্টে চলা আইনি প্রক্রিয়া আলাদা ভাবে চলতে থাকে। এখন নতুন সরকারের বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে সেই মামলায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। রাজ্য আর পূর্বতন সরকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে এগোতে চাইছে না। ফলে অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা যে প্রার্থীরা ১৬০০টি অতিরিক্ত পদের মাধ্যমে নিয়োগের আশায় ছিলেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁরা নিয়মিত শূন্যপদের মাধ্যমে নিয়োগ পাবেন কি না, নাকি নতুন কোনও নিয়োগ পদ্ধতি নেওয়া হবে, তা এখনও জানা যায়নি।
উচ্চ প্রাথমিকের শারীরশিক্ষা ও কর্মশিক্ষার নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার একাধিক ধাপ পেরিয়েও অনেকে চাকরি পাননি বলে অভিযোগ। অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা প্রার্থীদের একাংশের আশা ছিল, অতিরিক্ত পদ তৈরি হলে তাঁদের নিয়োগের সুযোগ মিলবে। সেই লক্ষ্যেই ২০২২ সালে রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ বলে দেখা হয়েছিল। কিন্তু আদালতের আপত্তি এবং পরে সরকার পরিবর্তনের ফলে সেই পথও এখন বন্ধ হয়ে গেল। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার পূর্বতন সরকারের একাধিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করছে। সরকারী ওয়েবসাইটেও শুভেন্দু অধিকারীকেই বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন সরকারের নীতি কী হবে, তা নিয়ে তাই নজর রয়েছে। বিশেষ করে যেসব নিয়োগ প্রক্রিয়া পূর্বতন সরকারের আমলে তৈরি হওয়া সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল, সেগুলির ক্ষেত্রে প্রশাসন কী অবস্থান নেয়, তা নিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের আগ্রহ রয়েছে। উচ্চ প্রাথমিকের ১৬০০ অতিরিক্ত পদ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত সেই বৃহত্তর নীতিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। এর আগে প্রাথমিক শিক্ষকদের একটি বড় অংশের চাকরি সংক্রান্ত মামলাতেও আদালতের বিভিন্ন নির্দেশ সামনে এসেছে। নিয়োগ বাতিল, পুনর্বহাল, নতুন করে যাচাই এবং অতিরিক্ত পদ তৈরির মতো বিষয় নিয়ে বছরের পর বছর আইনি প্রক্রিয়া চলেছে। ফলে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে আদালতের নির্দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এখন প্রশ্ন, ১৬০০টি পদ প্রত্যাহারের পরে উচ্চ প্রাথমিকের শারীরশিক্ষা ও কর্মশিক্ষার অপেক্ষমাণ প্রার্থীদের জন্য সরকার কী বিকল্প ব্যবস্থা নেয়। নিয়মিত শূন্যপদ থাকলে তার ভিত্তিতে নতুন করে নিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে কি না, অথবা অন্য কোনও পদ্ধতিতে সমস্যার সমাধান করা হবে কি না, তা নিয়ে এখনও সরকারি ভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। আদালতের পরবর্তী শুনানিতেও এই বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। বুধবারের সিদ্ধান্তে তাই শুধু একটি পুরনো বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার হয়নি, উচ্চ প্রাথমিকের নিয়োগ প্রক্রিয়ার একটি নির্দিষ্ট পথও বন্ধ হয়ে গেল। মমতা সরকারের আমলে তৈরি হওয়া ১৬০০টি সুপারনিউমেরারি পদের উপর যে চাকরিপ্রার্থীরা ভরসা করেছিলেন, তাঁদের এখন নতুন সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকতে হবে। আর বর্তমান শুভেন্দু সরকারের কাছে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, আইনি জটিলতার মধ্যে আটকে থাকা এই নিয়োগপ্রক্রিয়াকে কোন বিকল্প পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Durga Puja grant policy 2026, West Bengal puja subsidy | দুর্গাপুজোর অনুদানে বড় বদলের ইঙ্গিত, ছোট বাজেটের পুজোয় জোর দিতে পারে রাজ্য! শুভেন্দুর নীতিতে নতুন সমীকরণে কলকাতার শারদোৎসব




