সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের সাজা কার্যকর করার ক্ষেত্রে আপাতত ফাঁসির দড়িই থাকছে ভারতের আইনি ব্যবস্থায় (Death penalty India)। ফাঁসির বদলে প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন, গুলি চালানো, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করা কিংবা গ্যাস চেম্বারের মতো বিকল্প পদ্ধতি চালুর দাবিতে দায়ের হওয়া জনস্বার্থ মামলা খারিজ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার বিচারপতি বিক্রম নাথ (Justice Vikram Nath) ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতার (Justice Sandeep Mehta) বেঞ্চ এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। তবে আদালতের রায়ে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দরজাও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। নতুন কোনও জোরালো বৈজ্ঞানিক, চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক বা তথ্যনির্ভর প্রমাণ সামনে এলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে ফের সাংবিধানিক বিচার হতে পারে বলে জানিয়েছে শীর্ষ আদালত। মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতি নিয়ে এই মামলা কয়েক বছর ধরেই দেশের আইনি মহলে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। বর্ষীয়ান আইনজীবী ঋষি মালহোত্রা (Rishi Malhotra) ২০১৭ সালে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রচলিত পদ্ধতি হিসেবে ফাঁসির সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, রাষ্ট্র যখন কোনও ব্যক্তির প্রাণদণ্ড কার্যকর করছে, তখন সেই প্রক্রিয়াতেও মানুষের মর্যাদা এবং অপ্রয়োজনীয় কষ্ট এড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় থাকা দরকার।
মামলায় মূলত ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫৪(৫) ধারাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল। ওই ধারায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে মৃত্যুর নির্দেশ দেওয়ার কথা বলা ছিল। বর্তমানে ফৌজদারি আইন কাঠামোয় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (BNSS) ৩৯৩(৫) ধারায় একই ধরনের বিধান রয়েছে। ফলে মামলাটি শুধু পুরনো আইনের একটি ধারাকে ঘিরে ছিল না, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে বৃহত্তর সাংবিধানিক প্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ঋষি মালহোত্রার আবেদনে বলা হয়েছিল, ফাঁসির প্রক্রিয়ায় মৃত্যুর আগে দীর্ঘ সময় ধরে কষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাঁর পক্ষ থেকে প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশনকে তুলনামূলক দ্রুত পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করার আবেদন করা হয়। পাশাপাশি গুলি চালানো, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করা ও গ্যাস চেম্বারের মতো পদ্ধতির কথাও মামলায় উঠে আসে। তাঁর যুক্তির সঙ্গে যুক্ত ছিল সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিসত্তার মর্যাদার যে সুরক্ষা রয়েছে, সেই সাংবিধানিক ধারণা। আদালত মঙ্গলবার এই যুক্তিতে সন্তুষ্ট হয়নি যে আগের রায় পুনর্বিবেচনার জন্য বিষয়টি বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানো প্রয়োজন। বিচারপতি বিক্রম নাথ ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ জানায়, আগের তিন বিচারপতির বেঞ্চের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার মতো পর্যাপ্ত ভিত্তি এই মামলায় পাওয়া যায়নি। ফলে ফাঁসি তুলে দিয়ে অন্য কোনও পদ্ধতি চালুর জন্য আদালতের মাধ্যমে কেন্দ্রকে নির্দেশ দেওয়ার আবেদন গ্রহণ করা হয়নি।
কিন্তু, রায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি হল, ভবিষ্যতে নতুন তথ্য এলে বিষয়টি ফের আদালতের সামনে আসতে পারে। শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, নতুন বৈজ্ঞানিক, চিকিৎসাবিজ্ঞান ভিত্তিক বা অভিজ্ঞতালব্ধ প্রমাণ যদি আগের বিচারিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিকে বদলে দেওয়ার মতো হয়, তা হলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে সাংবিধানিক পর্যালোচনার সুযোগ থাকবে। অর্থাৎ মঙ্গলবারের রায়কে এই বিষয়ে শেষ কথা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার চাইলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বর্তমান ব্যবস্থা নিয়ে একটি বিস্তৃত পর্যালোচনাও করতে পারে বলে জানিয়েছে আদালত। এ ক্ষেত্রে আইন, ফরেনসিক মেডিসিন, স্নায়ুবিজ্ঞান ও অপরাধবিদ্যার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। লক্ষ্য হতে পারে এমন কোনও বিকল্প পদ্ধতি আছে কি না, যার মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় কষ্ট কমানো এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির মর্যাদা বজায় রাখার সাংবিধানিক উদ্দেশ্য আরও ভাল ভাবে পূরণ করা সম্ভব।
এর ফলে এক দিকে দেশে ফাঁসির প্রচলিত আইনি ব্যবস্থা বহাল থাকল, অন্য দিকে বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা বা সরকারি পর্যালোচনার সম্ভাবনাও বজায় রইল। আদালত কোনও নির্দিষ্ট বিকল্প পদ্ধতিকে গ্রহণ করার নির্দেশ দেয়নি। অর্থাৎ প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন বা অন্য কোনও পদ্ধতি এখনই ভারতের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আইনি ব্যবস্থা হিসেবে চালু হচ্ছে না। মামলার শুনানির সময় প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। বিভিন্ন দেশে এই পদ্ধতি ব্যবহার হলেও তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কোথাও কোথাও ইঞ্জেকশন প্রয়োগের পর প্রত্যাশিত সময়ের মধ্যে মৃত্যু না হওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র অন্য কোনও দেশের ব্যবস্থাকে অনুসরণ করলেই তা ভারতে কার্যকর করা যাবে কি না, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আদালতের সামনে বিকল্প পদ্ধতির কার্যকারিতা ও মানবিকতার প্রশ্ন তাই শুধু আইনি নয়, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বাস্তব প্রয়োগের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়। প্রসঙ্গত, এর আগে ২০২৫ সালের শুনানিতেও ফাঁসি বনাম প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন নিয়ে কেন্দ্রের অবস্থান নিয়ে আদালতে আলোচনা হয়েছিল। কেন্দ্রের বক্তব্য ছিল, বিকল্প পদ্ধতিগুলিও সব পরিস্থিতিতে কম কষ্টদায়ক বা বেশি নির্ভরযোগ্য হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন কিংবা গুলি চালানোর পদ্ধতির ক্ষেত্রেও নানা বাস্তব সমস্যা থাকতে পারে বলে কেন্দ্রের তরফে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
অন্য দিকে, মামলাকারীর বক্তব্য ছিল, মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলেও তা কার্যকর করার পদ্ধতিকে সময়ের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আইন কমিশনের পুরনো সুপারিশের প্রসঙ্গও মামলায় উঠে আসে। ফলে মৃত্যুদণ্ডের নৈতিকতা নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের পাশাপাশি সাজা কার্যকর করার পদ্ধতি নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়। এই মামলার আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, আদালত মৃত্যুদণ্ডের সাংবিধানিক বৈধতা এবং সেই সাজা কী ভাবে কার্যকর হবে, এই দুই প্রশ্নকে আলাদা করে দেখেছে। মঙ্গলবারের সিদ্ধান্তে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাতিল বা বহাল রাখার প্রশ্নে কোনও নতুন ঘোষণা করা হয়নি। মূল বিতর্ক ছিল মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে। ফলে আদালতের রায় ভারতের প্রচলিত মৃত্যুদণ্ড ব্যবস্থার পদ্ধতিগত কাঠামোকেই আপাতত বহাল রাখল। ফলে আপাতত ভারতের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের ক্ষেত্রে ফাঁসির ব্যবস্থাই বহাল থাকছে। তবে কেন্দ্র চাইলে বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে গবেষণা ও পর্যালোচনা করতে পারবে। ভবিষ্যতে নতুন চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সামনে এলে সেই তথ্যের ভিত্তিতে আদালতের দরজাও ফের খোলা থাকতে পারে। মঙ্গলবারের রায়ে তাই একদিকে বর্তমান আইনি কাঠামো অক্ষুণ্ণ রইল, অন্যদিকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে ভবিষ্যৎ বিতর্কের জায়গাটিও পুরোপুরি বন্ধ হল না।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sonam bail case, Raja Raghuvanshi murder | মধুচন্দ্রিমার আড়ালে খুন, সোনমের জামিন ঘিরে নতুন মোড়: সুপ্রিম কোর্টে মেঘালয় সরকারের জরুরি আবেদন




