BRICS Summit 2026 Iran UAE meeting | ব্রিক্‌সের মঞ্চে ইরান-আমিরশাহির বরফ গলল? ছ’মাসের সংঘাতের পর নতুন দিল্লিতে মুখোমুখি দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : নতুন দিল্লির মাটিতে ব্রিক্‌স সম্মেলন ঘিরে একাধিক কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে নজরকাড়া ঘটনাগুলির একটি পশ্চিম এশিয়ার দুই দেশের সম্পর্ককে ঘিরে। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে সংঘাত ও পাল্টা অভিযোগের আবহে থাকা ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রতিনিধিরা এবার মুখোমুখি আলোচনায় বসলেন। ভারতের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ব্রিক্‌স সম্মেলনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান (Masoud Pezeshkian) ও আবু ধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহয়ান (Sheikh Khaled bin Mohamed bin Zayed Al Nahyan) -এর বৈঠককে ঘিরে তাই নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

আরও পড়ুন : Narendra Modi BRICS bilateral meetings, Modi seven countries meeting | ব্রিক্‌সের শেষ দিনে মোদীর ম্যারাথন কূটনীতি, সাত দেশের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্য-প্রতিরক্ষা থেকে মহাকাশে নজর

দুই দেশের মধ্যে গত কয়েক মাস ধরে যে টানাপড়েন চলছিল, তার প্রেক্ষিতে নয়াদিল্লির এই সাক্ষাৎকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ইরানের প্রেসিডেন্টও বৈঠকের পর সম্পর্কের ক্ষেত্রে অতীতের সংঘাতকে পিছনে রেখে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফলে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার পর ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মধ্যে ফের যোগাযোগের একটি পরিসর তৈরি হল কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। দু’দিনের ব্রিক্‌স সম্মেলন শেষ হওয়ার পর রবিবার ইরানে ফিরে যান পেজেশকিয়ান। তার আগে ভারতীয় রাজধানীতে আমিরশাহির প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনার অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজের বক্তব্য জানিয়েছেন তিনি। ভারতে ইরানের দূতাবাসের প্রকাশিত বিবৃতি অনুযায়ী, আবু ধাবির যুবরাজের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা যথেষ্ট ইতিবাচক ছিল। পেজ়েশকিয়ান জানিয়েছেন, দুই পক্ষই অতীতের দিকে না তাকিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে আরও সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে তিনি আশাবাদী।

পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে উঠে এসেছে রাশিয়া এবং চিনের প্রসঙ্গও। ব্রিক্‌স সম্মেলনের ফাঁকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (Vladimir Putin) ও চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের (Xi Jinping) সঙ্গেও ইরানের প্রেসিডেন্টের কথাবার্তা হয়েছে। তবে তাঁর দাবি, সেই আলোচনা ছিল মূলত সংক্ষিপ্ত সৌজন্য বিনিময়। তুলনায় সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রতিনিধির সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা ছিল অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। ইরান-আমিরশাহি সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে গেলে সাম্প্রতিক পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের দিকে তাকাতে হয়। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হয়। আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায়। সেই হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যু হয় বলে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দাবি করা হয়েছে। এরপর সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ে ও ইরান পশ্চিম এশিয়ায় থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা শুরু করে।

এই সংঘাতের প্রভাব পড়ে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতেও। আমিরশাহির একাধিক এলাকায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা আঘাত হানে। তেহরানের দৃষ্টিতে আবু ধাবি আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র। ইরানের অভিযোগ ছিল, আমিরশাহির ভূখণ্ডে থাকা ঘাঁটি ব্যবহার করে মার্কিন বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। অন্য দিকে, আমিরশাহি বার বার এই ধরনের হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং নিজেদের ভূখণ্ডকে আঞ্চলিক সংঘাতের অংশ করে তোলার বিরোধিতা করেছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে তৈরি হয় গভীর অবিশ্বাস। সরাসরি সামরিক সংঘাতে না জড়ালেও ইরান এবং আমিরশাহির মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের উপর চাপ বাড়তে থাকে। সেই পরিস্থিতিতে নতুন দিল্লিতে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মুখোমুখি হওয়া যথেষ্ট তাৎপর্য বহন করছে। বিশেষ করে সংঘাত শুরুর পর এটাই দুই দেশের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরাসরি যোগাযোগ।

আরও পড়ুন : India Asia Cup Trophy, Harmanpreet Kaur Mohsin Naqvi | এশিয়া কাপ জিতেও ট্রফি হাতে উঠল না ভারতের! নকভির হাত থেকে পুরস্কার নিলেন না হরমনপ্রীতেরা, ফের সেই একই ছবি

দুই দেশই ব্রিক্‌সের সদস্য। সেই আন্তর্জাতিক মঞ্চই এবার তাদের কথাবার্তার সুযোগ করে দিল। ভারতের আয়োজনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের শেষ দিনে সদস্য দেশগুলির যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুদ্ধ ও উত্তেজনা নিয়ে ওই বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংঘাতের পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ সংযম বজায় রাখা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। ব্রিক্‌সের বিবৃতিতে অবশ্য কোনও নির্দিষ্ট দেশের নাম করে অভিযোগ তোলা হয়নি। কিন্তু আঞ্চলিক দেশগুলির সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। কূটনৈতিক পথে সমস্যার সমাধান ও আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর কথাও রয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিতে এই অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

বিবৃতি চূড়ান্ত করার আগে সদস্য দেশগুলির মধ্যে মতপার্থক্য ছিল বলেও সূত্রের দাবি। শেষ পর্যন্ত ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি উভয়েই যৌথ বিবৃতিতে সম্মতি দেয়। ফলে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পাশাপাশি দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগও নতুন করে সামনে আসে। এর আগে মে মাসে ব্রিক্‌সের সদস্য দেশগুলির বিদেশমন্ত্রীরা বৈঠকে বসেছিলেন। সেই বৈঠকের সময় রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহিকে সরাসরি আলোচনায় বসার আহ্বান জানানো হয়েছিল। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের পরিধি যাতে আরও না বাড়ে ও আঞ্চলিক দেশগুলির মধ্যে যোগাযোগ বজায় থাকে, সেই লক্ষ্যেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে মনে করা হয়। কয়েক মাস পর নয়াদিল্লির সম্মেলনে সেই আহ্বানের বাস্তব প্রতিফলন দেখা গেল। কিন্তু, একটি বৈঠকেই দুই দেশের দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস পুরোপুরি কেটে গিয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সময় এখনও আসেনি। কারণ, ইরান ও আমিরশাহির সম্পর্কের উপর পশ্চিম এশিয়ার বৃহত্তর সংঘাতের প্রভাব রয়েছে। আমেরিকার সঙ্গে আবু ধাবির সম্পর্ক এবং তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের বিরোধ, দুই বিষয়ই এই সমীকরণকে জটিল করে রেখেছে। ফলে নয়াদিল্লিতে কথাবার্তা হলেও আগামী দিনে তার বাস্তব ফল কতটা পাওয়া যায়, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।

তারপরও পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে অতীতের দিকে না তাকিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার যে ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে, তা কূটনৈতিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা ইরানের প্রেসিডেন্ট নিজেই উল্লেখ করেছেন। রাজনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পর্ককে সামনে এনে দুই দেশ নতুন কোনও সমঝোতার পথে হাঁটতে পারে কি না, তা নিয়ে নজর রয়েছে। নতুন দিল্লির ব্রিক্‌স সম্মেলন তাই শুধু তিন বা চারটি বড় দেশের নেতৃত্বের বৈঠকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সম্মেলনের পার্শ্ববৈঠকগুলিও পশ্চিম এশিয়ার কূটনীতিতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মধ্যে দীর্ঘ কয়েক মাসের টানাপড়েনের পর মুখোমুখি আলোচনা সেই সম্ভাবনারই একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এখন দেখার, দিল্লিতে শুরু হওয়া এই যোগাযোগ আগামী দিনে নিয়মিত কূটনৈতিক আলোচনায় পরিণত হয় কি না এবং তার মাধ্যমে পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা কমানোর কোনও পথ তৈরি হয় কি না।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Modi stops speech for Xi Jinping, Modi Xi Jinping BRICS Summit | ‘উনি ঠিক আছেন তো?’ জিনপিংকে দেখে বক্তৃতা থামালেন মোদী, ব্রিক্‌সের দ্বিতীয় দিনে ঐক্যের ডাক

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন