সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : নতুন দিল্লিতে ব্রিক্স সম্মেলনের মঞ্চে শনিবার আচমকাই থেমে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। সামনে উপস্থিত রাষ্ট্রনেতাদের দিকে তাকিয়ে তিনি বক্তৃতা করছিলেন। আচমকা তাঁর নজর যায় চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং -এর (Xi Jinping) দিকে। জিনপিংকে কিছুটা অস্বস্তিতে দেখেই বক্তব্য থামিয়ে তাঁর অনুবাদকের কাছে জানতে চান মোদী, ‘উনি ঠিক আছেন তো?’ চিনের প্রেসিডেন্ট তখন মৃদু মাথা নেড়ে নিজের অবস্থার কথা জানান। এর পর ফের বক্তব্য শুরু করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ব্রিক্সের প্রথম দিনের সূচনা পর্বের এই মুহূর্তটি নজর কেড়েছে আন্তর্জাতিক মহলের। তবে ঠিক কী কারণে জিনপিংকে সেই সময় অস্বস্তিতে মনে হচ্ছিল, তা নিয়ে চিনের প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে কোনও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ফলে মোদীর নজরে পড়া সেই মুহূর্ত নিয়ে কৌতূহল থাকলেও এর নির্দিষ্ট কারণ এখনও জানা যায়নি। পরে অবশ্য চিনের প্রেসিডেন্ট দিনের অন্য কর্মসূচিতে অংশ নেন। বিকেলে মোদীর সঙ্গে তাঁর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও হয়।
সাত বছর পর ভারতে এসেছেন শি জিনপিং। ব্রিক্স সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য শনিবার দুপুরের আগেই নয়াদিল্লিতে পৌঁছন তিনি। এবার ব্রিক্সের ১৮তম সম্মেলনের আয়োজক ভারত। সেই কারণে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (Vladimir Putin), ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান (Masoud Pezeshkian) -সহ একাধিক দেশের রাষ্ট্রনেতা রাজধানীতে উপস্থিত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতির টানাপড়েনের মধ্যে এই সম্মেলনকে ঘিরে তাই প্রথম থেকেই কূটনৈতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। শনিবার সম্মেলনের সূচনা পর্বে মোদীর ভাষণের সময়ই জিনপিংকে ঘিরে ওই ঘটনা ঘটে। সরাসরি সম্প্রচারের ছবিতে চিনের প্রেসিডেন্টকে কিছুটা অস্বস্তিকর অবস্থায় দেখা যাচ্ছিল বলে দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়। তা নজরে আসার পর নিজের বক্তব্য থামিয়ে দেন মোদী। তিনি সরাসরি জিনপিংয়ের সঙ্গে কথা না বলে তাঁর অনুবাদকের মাধ্যমে পরিস্থিতি জানতে চান। চিনের প্রেসিডেন্টের মৃদু সম্মতির পর ফের বক্তব্যে ফিরে যান ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
এই ছোট্ট মুহূর্তের পর অবশ্য ব্রিক্সের মঞ্চে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের যোগাযোগে কোনও ছেদ দেখা যায়নি। সম্মেলনের প্রথম দিনেই মোদীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন জিনপিং। ভারত-চিন সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হয়। সাত বছর পর চিনের প্রেসিডেন্টের ভারত সফরের কারণে এই বৈঠকও যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে। তবে শনিবার রাতে ভারত মণ্ডপমে মোদীর দেওয়া রাষ্ট্রনেতাদের নৈশভোজে জিনপিংকে দেখা যায়নি। অন্য কর্মসূচি শেষ করে তিনি হোটেলে ফিরে যান। সূত্রের দাবি, দীর্ঘ যাত্রা ও পর পর কর্মসূচির কারণে ক্লান্তি অনুভব করছিলেন চিনের প্রেসিডেন্ট। সেই কারণেই নৈশভোজে না গিয়ে হোটেলে বিশ্রাম নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। যদিও তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি নিয়ে চিনের পক্ষ থেকে কোনও পৃথক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। শুধু জিনপিং নন, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রতিনিধি আবু ধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহয়ানও নৈশভোজে উপস্থিত ছিলেন না। ব্রিক্সের প্রথম দিনের কর্মসূচী শেষ করেই তিনি দেশে ফিরে যান। ফলে শনিবার রাতের নৈশভোজে কয়েক জন গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি অতিথির অনুপস্থিতি নজরে আসে।
এরপর রবিবার ব্রিক্স সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচি শুরু হয় প্রধানমন্ত্রী মোদীর বক্তব্য দিয়ে। এ দিনের ভাষণে তিনি ব্যক্তিগত কোনও ঘটনার বদলে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির বৃহত্তর চিত্রের দিকে নজর দেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বাড়তে থাকা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। সংঘাত, দ্বন্দ্ব এবং উত্তেজনার প্রভাব যে সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়ছে, সেই বিষয়টি সামনে রেখে ব্রিক্স সদস্য দেশগুলিকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। মোদীর বক্তব্যে উঠে আসে প্রযুক্তি ও দুর্লভ খনিজ সম্পদের ব্যবহারের বিষয়টিও। তাঁর মতে, প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদকে রাজনৈতিক বা কৌশলগত হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সম্মিলিত উন্নয়নের পথে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই উন্নয়নশীল দেশগুলির স্বার্থে এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।
রবিবারের অধিবেশনে মোদীর সামনে উপস্থিত ছিলেন জিনপিং, পুতিন ও পেজ়েশকিয়ান। তাঁদের পাশাপাশি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম (Anwar Ibrahim) এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোয়ো সুবিয়ান্তো (Prabowo Subianto)-ও উপস্থিত ছিলেন। এই আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের সামনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ব্রিক্সের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে ভারতের সভাপতিত্বের অগ্রাধিকারের কথাও তুলে ধরেন। মোদী জানান, ভারতের সভাপতিত্বে ব্রিক্সের কাজের ক্ষেত্রে সহশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং স্থায়িত্ব, এই চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সদস্য দেশগুলির সহযোগিতায় যৌথ উদ্দেশ্যকে এমন একটি কাঠামোর দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছে, যেখানে প্রত্যেক দেশের স্বার্থের পাশাপাশি পারস্পরিক লাভের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত ও টানাপড়েন বাড়ছে। তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। শুধু যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাত নয়, মহামারি থেকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয়, একাধিক চ্যালেঞ্জ এখন কোনও একটি দেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি অঞ্চলে তৈরি হওয়া সঙ্কট দ্রুত অন্য দেশগুলির অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও জনজীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ব্রিক্সকে আরও কার্যকর সহযোগিতার মঞ্চ হিসাবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন মোদী। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সঙ্কট আগেভাগে চিহ্নিত করার প্রয়োজন। শুধু সমস্যা তৈরি হওয়ার পরে প্রতিক্রিয়া দেখানোর বদলে সম্ভাব্য ঝুঁকি আগে থেকে চিহ্নিত করে তার মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়ার উপর তিনি জোর দেন।
উন্নয়নশীল দেশগুলির সামনে থাকা নানা সমস্যার কথাও রবিবারের ভাষণে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, ব্রিক্সের প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ যেমন বেড়েছে, তেমনই এই গোষ্ঠীকে ঘিরে প্রত্যাশাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই সদস্য দেশগুলির সামনে এখন দায়িত্ব আরও বেশি। অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, পরিবেশগত সঙ্কট মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক শান্তির মতো ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি জানান। ব্রিক্সের দ্বিতীয় দিনের সূচনায় নরেন্দ্র মোদীর এই বক্তব্য এমন একটি সময়ে এল, যখন বিশ্বের একাধিক অঞ্চলে সংঘাত চলছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও প্রযুক্তি নিয়েও টানাপড়েন বাড়ছে। দুর্লভ খনিজের জোগান, প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটে ব্রিক্সের মঞ্চ থেকে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
একই সম্মেলনে এক দিকে মোদীর বক্তৃতার সময় জিনপিংকে নিয়ে তাঁর উদ্বেগ প্রকাশের মুহূর্ত, অন্য দিকে পরের দিন আন্তর্জাতিক উত্তেজনা মোকাবিলায় ঐক্যের ডাক—দুই ঘটনাই ব্রিক্স সম্মেলনের আবহকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। ভারত-চিন সম্পর্ক নিয়ে আলাদা দ্বিপাক্ষিক বৈঠক যেমন হয়েছে, তেমনই বহুপাক্ষিক মঞ্চে উন্নয়নশীল দেশগুলির যৌথ স্বার্থের কথাও সামনে এসেছে। দু’দিনের ব্রিক্স সম্মেলনের শেষ পর্বে তাই কেবল অর্থনীতি বা বাণিজ্য নয়, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, দুর্লভ খনিজ, জলবায়ু এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উপর বৈশ্বিক সঙ্কটের প্রভাবের মতো বিষয়ও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। নয়াদিল্লির মঞ্চ থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী যে বার্তা দিয়েছেন, তার মূল সুর ছিল সহযোগিতা বাড়ানো এবং সম্ভাব্য সঙ্কটের মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলির মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা। আর সম্মেলনের প্রথম দিনে জিনপিংকে নিয়ে মোদীর আচমকা উদ্বেগ প্রকাশের দৃশ্যটি হয়ে রইল দুই দিনের এই আন্তর্জাতিক বৈঠকের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : BRICS vegetarian menu | Rahul Gandhi on BRICS dinner : ব্রিক্সের নিরামিষ নৈশভোজ নিয়ে ফের তরজা, রাহুলের পোস্টে রিজিজুর ‘রাজনীতি’ কটাক্ষ




