সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: চা, কফি, রাবারের মতো বাণিজ্যিক ফসলের পর এবার কলা চাষেও বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বা এফডিআই (FDI) বাড়ানোর রাস্তা খুলতে পারে কেন্দ্রীয় সরকার। ভারতের বিশাল কলা উৎপাদনকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বড় পরিসরে পৌঁছে দিতে প্ল্যান্টেশন সেক্টরে বিনিয়োগের নিয়ম কিছুটা সহজ করার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেন্দ্রের ভাবনায় রয়েছে কলা চাষ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসাকে আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগের আওতায় আনা। বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রক (Ministry of Commerce and Industry) ইতিমধ্যেই এই সম্ভাব্য নীতি পরিবর্তন নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির সঙ্গে আলোচনা করছে বলে জানা গিয়েছে। সরকারী মহলের বক্তব্য, ভারতের কৃষি অর্থনীতিতে কলার গুরুত্ব যথেষ্ট। দেশে বিপুল পরিমাণ কলা উৎপাদিত হলেও আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাজারে ভারতের অংশ এখনও খুবই কম। তাই শুধু জমিতে উৎপাদন বাড়ানো নয়, ফসল তোলার পর সংরক্ষণ, প্যাকেজিং, পরিবহণ, কোল্ড চেন ও প্রক্রিয়াকরণের পরিকাঠামোয় বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন। সেই জায়গাতেই বিদেশি পুঁজি ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করছে কেন্দ্র। এক সরকারি আধিকারিকের কথায়, ‘কলা-সহ প্ল্যান্টেশন সেক্টরে আরও FDI উদারীকরণের বিষয়ে আমরা ভাবছি।’
২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ভারত প্রায় ৩৭৭.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের কলা বিদেশে পাঠিয়েছে। আগের অর্থবর্ষের তুলনায় এই রপ্তানি প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় কলার চাহিদা তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। আগামী দিনে রপ্তানি আরও বাড়িয়ে ১০০ কোটি ডলারের লক্ষ্যে পৌঁছনোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
বর্তমানে ভারতের প্ল্যান্টেশন ক্ষেত্রের নির্দিষ্ট কিছু অংশে বিদেশি বিনিয়োগের অনুমতি রয়েছে। চা ও চা বাগান, কফি, রাবার, এলাচ, পাম ও অলিভ অয়েল গাছের চাষের মতো ক্ষেত্রে অটোমেটিক রুটে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত FDI অনুমোদিত। অর্থাৎ নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ওই ক্ষেত্রগুলিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সরাসরি বিনিয়োগ করতে পারেন। কিন্তু প্ল্যান্টেশন সংক্রান্ত আরও বেশ কিছু কর্মকাণ্ডে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ এখনও সীমিত বা নিষিদ্ধ। কলা চাষকে অনুমোদিত ক্ষেত্রের পরিধিতে আনার উদ্যোগ সফল হলে সেই পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। এর ফলে বিদেশি সংস্থাগুলি ভারতের কলা উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে আরও গভীর ভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। শুধু চাষের জমিতে বিনিয়োগ নয়, ফসল সংগ্রহের পর বাছাই, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং, প্রক্রিয়াকরণ ও রপ্তানিমুখী সরবরাহ ব্যবস্থাতেও পুঁজি আসতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষিপণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে যে ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিকাঠামো প্রয়োজন, তা তৈরিতেও বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কলা উৎপাদনের পরিসংখ্যানে ভারতের অবস্থান অবশ্যই শক্তিশালী। ভারত ইতিমধ্যেই বিশ্বের বৃহত্তম কলা উৎপাদক দেশ। প্রতি বছর দেশে ৩ কোটি টনেরও বেশি কলা উৎপাদিত হয়। ২০২২-২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট কলা উৎপাদনের ৬৭ শতাংশেরও বেশি আসে পাঁচটি প্রধান উৎপাদক রাজ্য থেকে। অন্ধ্রপ্রদেশ (Andhra Pradesh), মহারাষ্ট্র (Maharashtra), কর্ণাটক (Karnataka), তামিলনাড়ু (Tamil Nadu) এবং উত্তরপ্রদেশ (Uttar Pradesh) এই পাঁচ রাজ্য দেশের কলা উৎপাদনে বড় ভূমিকা নেয়। কলা শুধু সাধারণ ফল হিসেবে নয়, ভারতের উদ্যানপালন ক্ষেত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ফসল হিসাবেও বিবেচিত হয়। বিপুল উৎপাদনের কারণে দেশে কৃষক, পাইকার, পরিবহণ সংস্থা, আড়তদার, প্রক্রিয়াকরণ শিল্প ও খুচরো ব্যবসার সঙ্গে এই ফসলের বড় অর্থনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু উৎপাদনের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের কলার উপস্থিতি এখনও যথেষ্ট কম।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই সেই ফারাক ধরা পড়ে। বিশ্বে যত কলা উৎপাদিত হয়, তার প্রায় ২৬.৪৫ শতাংশই ভারত থেকে আসে। কিন্তু আন্তর্জাতিক কলা রপ্তানি বাজারে ভারতের অংশ মাত্র প্রায় ১ শতাংশ। অর্থাৎ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কলা উৎপাদন করেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারতের অবস্থান এখনও উৎপাদনের অনুপাতে অনেক পিছনে। কেন্দ্রের নতুন পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে এই ব্যবধান কমানো। রপ্তানির ক্ষেত্রে অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ভারত প্রায় ৩৭৭.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের কলা বিদেশে পাঠিয়েছে। আগের অর্থবর্ষের তুলনায় এই রপ্তানি প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় কলার চাহিদা তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। আগামী দিনে রপ্তানি আরও বাড়িয়ে ১০০ কোটি ডলারের লক্ষ্যে পৌঁছনোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এই লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে শুধু চাষের পরিমাণ বাড়ালেই হবে না। কলা একটি দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়া কৃষিপণ্য হওয়ায় ফসল কাটার পর সঠিক ভাবে সংরক্ষণ ও দ্রুত বাজারে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ দূরত্বে রপ্তানির ক্ষেত্রে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক প্যাকেজিং, কোল্ড স্টোরেজ, রেফ্রিজারেটেড পরিবহণ আর বন্দরভিত্তিক লজিস্টিক ব্যবস্থার উন্নতি প্রয়োজন। ফলে FDI-এর দরজা আরও খুললে কৃষিক্ষেত্রের পাশাপাশি এই পরিকাঠামোগুলিতেও বিনিয়োগ বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিমধ্যেই ভারতীয় কলার উপস্থিতি রয়েছে। ইরান (Iran), ইরাক (Iraq), সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (United Arab Emirates), ওমান (Oman), উজবেকিস্তান (Uzbekistan), সৌদি আরব (Saudi Arabia), নেপাল (Nepal), কাতার (Qatar), কুয়েত (Kuwait), বাহরাইন (Bahrain), আফগানিস্তান (Afghanistan) ও মালদ্বীপে (Maldives) ভারতীয় কলা রপ্তানি হয়। পশ্চিম এশিয়ার বাজারে ভারতীয় কলার চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি আরও বড় আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে। আমেরিকা (United States), রাশিয়া (Russia), জাপান (Japan), জার্মানি (Germany), চিন (China), নেদারল্যান্ডস (Netherlands), ব্রিটেন (United Kingdom) এবং ফ্রান্সের (France) মতো দেশের বাজারে ভারতীয় কলার রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এই বাজারগুলিতে প্রবেশ করতে হলে আন্তর্জাতিক মানের গুণমান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং আর খাদ্য নিরাপত্তার নিয়ম মেনে চলার পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে হবে।
কেন্দ্রের নীতিগত পরিবর্তনের ভাবনার পিছনে তাই শুধু বিদেশি পুঁজি আনার লক্ষ্য নেই। ভারতীয় কলাকে একটি বৃহত্তর রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্য হিসেবে গড়ে তোলাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে। বিদেশি সংস্থাগুলি বিনিয়োগ করলে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, উন্নত জাতের চারা, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা, ফসল কাটার পর সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বিপণনের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর সঙ্গে কৃষকদেরও লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উৎপাদকদের সঙ্গে সরাসরি বাজারের যোগাযোগ বাড়লে ফসল বিক্রির ক্ষেত্রে নতুন পথ তৈরি হতে পারে। চাষের পাশাপাশি বাছাই, প্যাকেজিং, গুদামজাতকরণ, পরিবহণ ও প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে। তবে বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি কৃষকের স্বার্থ, জমির ব্যবহার, মূল্য নির্ধারণ এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অবস্থানের বিষয়গুলিও নীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ভারতের সামনে এখন বড় প্রশ্ন উৎপাদন কতটা বাড়ানো যায়, তা নয়। বরং দেশে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ কলার কতটা অংশ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব, সেটিই বড় বিষয়। ফসলের অপচয় কমানো, সংরক্ষণের সময় বাড়ানো এবং দ্রুত রপ্তানি ব্যবস্থার সঙ্গে উৎপাদনকে যুক্ত করতে পারলে ভারতের কলা শিল্প নতুন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। তাই প্ল্যান্টেশন সেক্টরে FDI-এর নিয়ম শিথিল করার কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা কার্যকর হলে কলা চাষের সঙ্গে যুক্ত গোটা মূল্যশৃঙ্খলেই পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। চাষের জমি থেকে শুরু করে বন্দর পর্যন্ত একটি আধুনিক সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে ভারতের বিপুল উৎপাদনকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে আরও কার্যকর ভাবে যুক্ত করা সম্ভব হতে পারে। বিশ্বের মোট কলা উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশেরও বেশি ভারতের দখলে থাকা সত্ত্বেও রপ্তানি বাজারে অংশ মাত্র ১ শতাংশ, এই ব্যবধানই এখন সবচেয়ে বড় সুযোগের জায়গা। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ৩৭৭.৫ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ও এক বছরে প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধির পর কেন্দ্রের সামনে এখন আরও বড় লক্ষ্যমাত্রা। FDI, প্রযুক্তি, কোল্ড চেন ও উন্নত রপ্তানি পরিকাঠামোকে একসঙ্গে কাজে লাগানো গেলে ভারতীয় কলার আন্তর্জাতিক বাজার আরও বিস্তৃত হতে পারে। আগামী দিনে প্ল্যান্টেশন সেক্টরে নীতির পরিবর্তন কতটা বাস্তবায়িত হয়, তার উপরই অনেকটা নির্ভর করবে ভারতের কলা রপ্তানির পরবর্তী গতি।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Solar Energy Agriculture India, Narendra Modi | সৌরশক্তিতে কৃষির বদল, ভারতের মডেল বিশ্বে তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী




