সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড়সড় মোড়। নতুন সরকার গঠনের ঠিক আগে নাটকীয় পদক্ষেপে ১৭তম পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা (West Bengal Assembly dissolved) ভেঙে দিলেন রাজ্যপাল রবি নারায়ণ রবি (Ravi Narayan Ravi)। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হল বর্তমান বিধানসভার কার্যকাল। সামনে এখন একমাত্র পথ—নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে ১৮তম বিধানসভা গঠন এবং নতুন সরকারের শপথগ্রহণ।
কলকাতার রাজনৈতিক অন্দরে গত কয়েক দিন ধরেই চলছিল টানটান উত্তেজনা। বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও পর্যন্ত পদত্যাগ না করায় পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হয়েছিল নানা প্রশ্ন। নিয়ম অনুযায়ী নতুন সরকার গঠনের আগে মুখ্যমন্ত্রীর ইস্তফা দেওয়ার রীতি থাকলেও তা না হওয়ায় প্রশাসনিক স্তরে জটিলতা তৈরি হচ্ছিল। এই পরিস্থিতিতেই সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রাজ্যপাল। সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, ভারতীয় সংবিধানের ১৭৪ অনুচ্ছেদের (Article 174) ২ নম্বর দফার (খ) উপ-দফা অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিয়ালা (Dushmanta Nariala) একটি বিবৃতি জারি করে জানিয়েছেন, ‘সংবিধানসম্মত ক্ষমতা প্রয়োগ করেই বিধানসভা ভেঙে দেওয়া হয়েছে।’ এর ফলে বর্তমান সরকারের মেয়াদের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটল। এই সিদ্ধান্তের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, আগামী দু’দিন রাজ্যের প্রশাসনিক দায়িত্ব সরাসরি রাজ্যপালের অধীনে থাকবে। এই সময়ের মধ্যেই নতুন সরকারের শপথগ্রহণের প্রস্তুতি সম্পন্ন হবে। ফলে প্রশাসনিক স্তরে দ্রুত রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এদিকে, বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থান শুরু থেকেই ছিল অনড়। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই তিনি দাবি করে আসছিলেন, ‘আমরা হারিনি, আমাদের আসন লুঠ করা হয়েছে।’ এই মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। তাঁর এই অবস্থানের কারণেই পদত্যাগ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে আসছে, এই পরিস্থিতি রাজ্যের সাংবিধানিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। যেখানে মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ বিলম্বিত হলে রাজ্যপালের ভূমিকা কী হতে পারে, তারই এক বাস্তব চিত্র দেখা গেল।
এখন নজর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের দিকে। জানা গিয়েছে, রবীন্দ্র জয়ন্তীর দিন কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড (Brigade Parade Ground)-এ নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠিত হবে। এই অনুষ্ঠান ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah)-এর। পাশাপাশি বিজেপি (BJP)-শাসিত বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরাও উপস্থিত থাকবেন বলে জানা যাচ্ছে। ফলে এই শপথ অনুষ্ঠান শুধু রাজ্য রাজনীতির নয়, জাতীয় স্তরেও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে কড়া। ব্রিগেডের ভিতরে বিশেষ সুরক্ষার দায়িত্বে থাকবে স্পেশাল প্রোটেকশন গ্রুপ বা এসপিজি (SPG)। কলকাতা পুলিশ (Kolkata Police) এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী মিলিয়ে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হবে। অনুষ্ঠানে বিপুল জনসমাগমের সম্ভাবনা থাকায় প্রতিটি পদক্ষেপে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রাজনৈতিক অন্দরে এখন প্রশ্ন উঠছে, এই ঘটনাপ্রবাহ ভবিষ্যতে কী প্রভাব ফেলবে। একদিকে বিদায়ী সরকারের অবস্থান, অন্যদিকে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রয়োগ, এই দুইয়ের সংঘাতে তৈরি হয়েছে এক নতুন অধ্যায়।
এখন সব নজর নতুন সরকারের দিকে। ব্রিগেডের মঞ্চ থেকে শুরু হবে নতুন প্রশাসনের পথচলা। তবে তার আগেই যে নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হল, তা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক আলোচনায় জায়গা করে নেবে বলেই মনে করা হচ্ছে। এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও উঠে এল সংবিধান, প্রশাসন এবং রাজনীতির জটিল সম্পর্কের চিত্র। আগামী দিনে এই ধরনের পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : RN Ravi Governor Bengal, Bengal administrative reshuffle | ভোটের ফলের পরেই প্রশাসনে বড় রদবদল, রাজ্যপালের সচিব পদে সৌমিত্র মোহন, লোকভবনে নতুন সমীকরণ



