সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দিল। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)। দীর্ঘদিন ধরে যে ভোট সমীকরণ রাজ্যে প্রভাব বিস্তার করেছিল, সেই সমীকরণে বড় রদবদল দেখা গেল এবারের ফলাফলে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত আসনগুলিতে বিজেপির সাফল্য রাজনৈতিক মহলে তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, রাজ্যে মোট ২৯৪টি আসনের মধ্যে প্রায় ১৪৬টি আসনে সংখ্যালঘু ভোটারের হার ২৫ শতাংশের বেশি। এতদিন এই আসনগুলিকে তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress)-এর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে ধরা হত। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই চিত্র অনেকটাই পাল্টে গিয়েছে। তৃণমূল যেখানে এই ১৪৬টি আসনের মধ্যে ৭৩টিতে জয় পেয়েছে, সেখানে বিজেপি জিতেছে ৬৬টি আসনে। ২০২১ সালের নির্বাচনে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১৬ ফলে বৃদ্ধি কতটা তা সহজেই অনুমেয়।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হল, যেসব আসনে সংখ্যালঘু ভোটারের হার ৪০ শতাংশের বেশি, এমন ১৭টি আসনেও জয় পেয়েছে বিজেপি। আগের নির্বাচনে এই ধরনের মাত্র দু’টি আসনে জয় এসেছিল তাদের। ফলে প্রশ্ন উঠছে, কীভাবে এই বদল সম্ভব হল? রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে আসছে একাধিক কারণ। একদিকে সংখ্যালঘু ভোটের মধ্যে বিভাজন লক্ষ্য করা গিয়েছে। তৃণমূলের ঐতিহ্যগত ভোটব্যাঙ্কে প্রভাব ফেলেছে কংগ্রেস (INC), সিপিএম (Communist Party of India Marxist), আইএসএফ (Indian Secular Front) এবং হুমায়ুন কবীর (Humayun Kabir)-এর দল এজেইউপি (AJUP)-এর মতো শক্তিগুলি। অন্যদিকে, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মধ্যে অভূতপূর্ব ঐক্য লক্ষ্য করা গিয়েছে, যা বিজেপির পক্ষে গিয়েছে। মালদহ ও মুর্শিদাবাদ দু’টি জেলাই এতদিন তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০২১ সালে মালদহে ১০টির মধ্যে ৮টি এবং মুর্শিদাবাদে ২২টির মধ্যে ২০টি আসনে জয় পেয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) -এর দল। কিন্তু ২০২৬-এ সেই ছবি আর নেই। মালদহে তৃণমূল ৬টি আসনে সীমাবদ্ধ থেকেছে, বিজেপি পেয়েছে ৪টি। মুর্শিদাবাদে তৃণমূল ৯টি ও বিজেপি ৮টি আসনে জয়ী হয়েছে। এই পরিবর্তন রাজ্যের বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রবণতার দিকেই ইঙ্গিত করছে। শুধু উত্তরবঙ্গ নয়, দক্ষিণবঙ্গেও একই প্রবণতা দেখা গিয়েছে। হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা প্রায় সর্বত্রই বিজেপির অগ্রগতি লক্ষ্যণীয়। দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটিতেও এবার চারটি আসনে জয় পেয়েছে বিজেপি, যেখানে আগের নির্বাচনে তারা একটি আসনও পায়নি। সাতগাছিয়া কেন্দ্র, যা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)-এর লোকসভা কেন্দ্র ডায়মন্ড হারবারের অন্তর্ভুক্ত, সেখানেও গেরুয়া শিবিরের সাফল্য নজর কাড়ছে।
অন্যদিকে, জঙ্গিপুর, নবগ্রাম, বড়ঞাঁর মতো কেন্দ্র, যেখানে সংখ্যালঘু ভোটারের হার ৪০ শতাংশের বেশি, সেখানেও বিজেপির জয় রাজনৈতিক সমীকরণকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। মানিকচক, করণদিঘি, হেমতাবাদ এই ধরনের আসনেও একই প্রবণতা দেখা গিয়েছে। এই নির্বাচনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল প্রার্থী নির্বাচন। তৃণমূল যেখানে ৪৭ জন সংখ্যালঘু প্রার্থী দিয়েছে, সেখানে বিজেপি এক জন সংখ্যালঘুকেও প্রার্থী করেনি। এই কৌশল নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, এই পদক্ষেপ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটকে একত্রিত করতে সাহায্য করেছে, যার প্রভাব ভোটবাক্সে প্রতিফলিত হয়েছে। অন্যদিকে, সংখ্যালঘু রাজনীতির ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। আইএসএফ (Indian Secular Front)-এর নওশাদ সিদ্দিকি (Nausad Siddiqui) ভাঙড় কেন্দ্রে আবার জয়ী হয়েছেন। হুমায়ুন কবীর নিজেও মুর্শিদাবাদের দু’টি আসনে জয় পেয়েছেন। ফলে বোঝা যাচ্ছে, সংখ্যালঘু ভোট আর একমুখী নেই। মৌসম বেনজির নুর (Mausam Benazir Noor)-এর দলবদলও আলোচনায় ছিল। তিনি তৃণমূল ছেড়ে কংগ্রেসে যোগ দিলেও মালতীপুরে জয় পাননি। তবুও তাঁর সিদ্ধান্ত সংখ্যালঘু ভোটের উপর প্রভাব ফেলেছে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা।
২০১১ থেকে ২০২১, এই দশকে সংখ্যালঘু ভোট তৃণমূলের প্রধান শক্তি ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ফলাফল দেখাচ্ছে, সেই ভিত্তি এখন নড়বড়ে। ২০১৬ সালে যেখানে ১৪৬টি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত আসনের মধ্যে ১১৬টিতে জয় পেয়েছিল তৃণমূল, ২০২১-এ সেই সংখ্যা ছিল ১২৯। আর ২০২৬-এ তা নেমে এসেছে ৭৩-এ। এই পরিবর্তন রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। আগামী লোকসভা নির্বাচন ২০২৯-এ এই প্রবণতা আরও পরিষ্কার হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সংখ্যালঘু ভোট কোন দিকে যাবে, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট কতটা ঐক্যবদ্ধ থাকবে, এই প্রশ্নগুলির উত্তরই নির্ধারণ করবে পশ্চিমবঙ্গের আগামী রাজনৈতিক দিশা। ২০২৬ সালের এই নির্বাচনের ফলাফল ভোটের অঙ্ক ও কৌশলের আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এখন নতুন সমীকরণ, নতুন প্রতিযোগিতা এবং নতুন বাস্তবতার সূচনা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ : ২৯৪ আসনে কে কোথায় জয়ী ও পরাজিত হলেন? সম্পূর্ণ তালিকা




