সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ঢাকা : দুর্গাপুজোর ঢাকে কাঠি পড়তে আর বেশি দেরি নেই। পুজোর বাজার, নতুন জামাকাপড়, প্যান্ডেল আর ভোগের পাশাপাশি বাঙালির রসনাতেও এখন থেকেই শুরু হয়েছে প্রস্তুতি। আর সেই তালিকায় ইলিশ থাকলে উৎসবের আমেজ যেন আরও বেড়ে যায়। পুজোর সময়ে কলকাতা-সহ পশ্চিমবঙ্গের বাজারে বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশের (Padma Hilsa) চাহিদা বরাবরই থাকে। এবার সেই চাহিদার কথা মাথায় রেখে ফের ভারতে ইলিশ রফতানির অনুমতি চাইল বাংলাদেশের ১৮টি প্রতিষ্ঠান। ফলে চলতি দুর্গাপুজোয় পদ্মার ইলিশ (Padma Hilsa for Durga Puja) কলকাতার বাজারে ঢুকবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা।
বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট রফতানিকারকদের দাবি, শুধু দুর্গাপুজোর কয়েকটি দিনের জন্য নয়, ভারতীয় বাজারে ইলিশ রফতানির সুযোগ আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য দেওয়া হোক। তাঁদের বক্তব্য, অল্প সময়ের মধ্যে মাছ সংগ্রহ থেকে শুরু করে যাবতীয় রফতানি প্রক্রিয়া শেষ করা অত্যন্ত কঠিন। তাই অন্তত দুই মাসের জন্য অথবা সারা বছর ইলিশ রফতানির সুযোগ থাকলে দুই দেশের ব্যবসায়ীরাই বেশি সুবিধা পাবেন। বাংলাদেশের চট্টগ্রামের জেএস এন্টারপ্রাইজ (JS Enterprise) ও আনরাজ ফিশ প্রোডাক্টস (Anraj Fish Products), ঢাকার ভিজিল্যান্ট এক্সপ্রেস (Vigilant Express), স্বর্ণালী এন্টারপ্রাইজ (Swarnali Enterprise), ম্যাজেস্টিক এন্টারপ্রাইজ (Majestic Enterprise), বিডিএস করপোরেশন (BDS Corporation) -সহ মোট ১৮টি প্রতিষ্ঠান এই আবেদন জানিয়েছে বলে উল্লেখ। তাঁদের আবেদনের পর বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রকের তরফে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রকের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
রফতানিকারকদের বক্তব্য, দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে যদি মাত্র ২০ থেকে ২৫ দিনের সময়সীমা রাখা হয়, তা হলে পুরো প্রক্রিয়া সামলানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ শুধু ইলিশ ধরলেই তো কাজ শেষ নয়। মাছ সংগ্রহের পর তা বাছাই, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও রফতানির জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্রের কাজও করতে হয়। তার আগে ভারতীয় আমদানিকারকদের তরফে ঋণপত্র বা এলসি (Letter of Credit) খোলার প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করতে হয়। ফলে সময় কম থাকলে বিপুল পরিমাণ ইলিশ ভারতে পাঠানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতির নজির গত কয়েক বছরেও দেখা গিয়েছে। ২০২৪ সালের আগে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ গত বছর ভারতে ১ হাজার ২০০ টন ইলিশ পাঠানোর অনুমতি পেয়েছিল। কিন্তু অনুমোদিত পরিমাণের তুলনায় বাস্তবে রফতানি হয়েছিল মাত্র ১৫০ টন। এবার যাতে অনুমোদিত পরিমাণের সঙ্গে বাস্তব রফতানির এত বড় ফারাক না থাকে, সেই বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার আবেদন জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলি।
ভারতের বাজার থেকেও অবশ্য বাংলাদেশের ইলিশ আমদানির বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে। বাংলাদেশের কাছ থেকে ইলিশ আমদানির অনুমতি চেয়ে ভারতের ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (Fish Importers Association) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বিদেশ মন্ত্রক ও বাণিজ্য মন্ত্রকের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। সেখানে দুই দেশের মধ্যে ইলিশ বাণিজ্যের পুরনো সম্পর্ক এবং ভারতীয় বাজারে এই মাছের চাহিদার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৯৬ সাল থেকে বাংলাদেশ প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫ হাজার টন ইলিশ ভারতে রফতানি করত। পরে ২০১২ সালে সেই রফতানি বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ বিরতির পর ফের বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে ভারতে ইলিশ আসার পথ খুলতে শুরু করে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে দুর্গাপুজো উপলক্ষে ৫০০ টন ইলিশ রফতানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। পরের বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে অনুমোদিত পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৫০ টন।
এরপর ২০২৩ সালে বাংলাদেশকে ভারতে ৩ হাজার ৯৫০ টন ইলিশ রফতানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে অনুমোদনের পুরো পরিমাণ ভারতে পৌঁছয়নি। শেষ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৩০০ টন ইলিশ রফতানি হয়েছিল বলে ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে রফতানির পরিমাণ আরও কমে যায়। সেই বছর বাংলাদেশ থেকে ভারতে মাত্র ৫৭৭ টন ইলিশ এসেছিল। প্রসঙ্গত, ইলিশ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আবেগ ও বাণিজ্য দুই দিকই দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে দুর্গাপুজোর আগে কলকাতা এবং পশ্চিমবঙ্গের বাজারে পদ্মার ইলিশ নিয়ে আগ্রহ বাড়তে দেখা যায়। বাংলাদেশ থেকে ইলিশ এলে তা শুধু বাজারের চাহিদাই মেটায় না, পুজোর খাবারের তালিকাতেও আলাদা জায়গা করে নেয়। ইলিশের ঝোল, ভাপা ইলিশ কিংবা সর্ষে ইলিশ, পুজোর সময়ে অনেক বাঙালি পরিবারেই এই মাছের জন্য অপেক্ষা থাকে। এবার সেই অপেক্ষার অবসান হবে কি না, তা নির্ভর করছে রফতানির অনুমতির উপর। বাংলাদেশের ১৮টি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময়ের জন্য রফতানির সুযোগ চাওয়ায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। ভারতীয় আমদানিকারকরাও অনুমতির জন্য আবেদন করেছেন। ফলে বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছে দুই দেশের ইলিশ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মহল।
দুর্গাপুজোর বাজারে বাংলাদেশের ইলিশ ঢুকলে একদিকে যেমন আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে, তেমনই কলকাতা-সহ পশ্চিমবঙ্গের মাছপ্রেমীদের কাছেও তা হয়ে উঠতে পারে বড় আকর্ষণ। কিন্তু এবার কত টন ইলিশ রফতানির অনুমতি দেওয়া হবে, কত দিন সময় মিলবে এবং শেষ পর্যন্ত অনুমোদিত মাছের কতটা ভারতীয় বাজারে পৌঁছবে, এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরেই নির্ভর করছে পুজোর বাজারে পদ্মার ইলিশের উপস্থিতি।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Chuno Machher Morich Khola Paturi Recipe | চুনো মাছের মরিচখোলা পাতুরি রেসিপি




