সৌভিক দাস ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : বাংলার রান্নাঘরে মাছ মানেই এক অন্য জাদু। ইলিশ (Hilsa) বা ভেটকি (Bhetki) পাতুরি খেয়ে অভ্যস্ত আমরা অনেকেই। কিন্তু আজ থাকছে এমন এক রেসিপি যা সাধারণ অথচ স্বাদে অবিশ্বাস্য, চুনো মাছের মরিচখোলা পাতুরি (Chuno Machher Morich Khola Paturi)। একে বলা চলে গ্রামীণ বাংলার হারিয়ে যাওয়া এক রসনাতৃপ্ত স্বাদ। যেভাবে চুনো মাছের সরলতা, মরিচের ঝাঁজ আর কলাপাতার ঘ্রাণ একসঙ্গে মিশে যায়, তা ভাতের সঙ্গে একেবারে স্বর্গীয় অভিজ্ঞতা এনে দেয়।
চুনো মাছের পাতুরি তৈরি করা একদমই সহজ, তেমনই প্রয়োজনীয় উপকরণও মেলে সহজেই। বাড়ির রান্নাঘরের সামান্য উপকরণ দিয়েই আপনি তৈরি করতে পারেন একদম দেশি ধাঁচের এই অনন্য পদটি। চলুন জেনে নেওয়া যাক, কীভাবে বানাবেন এই মনমাতানো চুনো মাছের মরিচখোলা পাতুরি।
প্রথমেই লাগবে ২৫০ গ্রাম চুনো মাছ (Small Anchovy Fish)। মাছটি ভালোভাবে পরিষ্কার করে ধুয়ে নিতে হবে, যেন কাঁটা ও অপ্রয়োজনীয় অংশ কিছুই না থাকে। তারপর জল ঝরিয়ে আলাদা করে রেখে দিন। চুনো মাছের পাতুরি তৈরি করার মূল কৌশল হল মশলা মেশানোয়। একটি বড় বাটিতে নিন তিনটি বড় পেঁয়াজ কুচি, এক টেবিল চামচ হলুদ গুঁড়ো (Turmeric Powder), দুই টেবিল চামচ আদা-রসুন বাটা (Ginger-Garlic Paste), দেড় টেবিল চামচ লঙ্কা গুঁড়ো (Red Chili Powder), চার-পাঁচটি গোটা কাঁচা লঙ্কা (Green Chili), ধনেপাতা কুচি (Coriander Leaves), স্বাদমতো নুন এবং সরষের তেল (Mustard Oil)। এই মশলার মিশ্রণে মাছগুলো ভালোভাবে মাখিয়ে রাখতে হবে অন্তত ১৫-২০ মিনিট, যাতে মশলা মাছের ভেতর পর্যন্ত ঢুকে যায়। অনেক রান্নাঘরে এই পর্যায়ে কিছুটা ভাজা পেঁয়াজ মিশিয়ে দিলে স্বাদ আরও গভীর হয়।
এরপর আসবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ-কলাপাতা (Banana Leaf) প্রস্তুত করা। কলাপাতাকে সরাসরি গরম তাওয়ায় বা খোলা আগুনে উলটেপালটে হালকা করে সেঁকে নিতে হবে, যাতে পাতাটা নরম হয় ও সহজে ভাঁজ করা যায়। কলাপাতা পুড়ে না গিয়ে শুধু হালকা বাদামি হয়ে গেলেই যথেষ্ট। এরপর পাতায় অল্প সরষের তেল মাখিয়ে একপাশে রেখে দিন। এখন সেই পাতার মাঝখানে মাছ ও মশলার মিশ্রণটি দিয়ে ভালভাবে মুড়ে নিন। ভাঁজগুলো শক্ত করে সুতো দিয়ে বেঁধে ফেললে পাতুরি ভেতরের রস ও ঘ্রাণ ধরে রাখবে। এই বেঁধে রাখা পাতুরিগুলোকে ফ্রাইং প্যান বা ননস্টিক তাওয়ায় রাখুন।
আরও পড়ুন : How to make mustard paste | সর্ষে বাটার সঠিক কৌশল: পাতুরি ও সর্ষে-ইলিশ রান্নার সময় কোন ভুল এড়াবেন?
গ্যাসের-উনুনের আঁচ মাঝারি রাখবেন। প্রতিটি দিক ৫ থেকে ৭ মিনিট করে ভাজতে হবে। কলাপাতার রঙ বদলে গাঢ় বাদামি হয়ে গেলে বুঝবেন পাতুরি তৈরি হয়ে গেছে। আগুন থেকে নামিয়ে পরিবেশনের আগে কিছুক্ষণ রেখে দিলে পাতার ভেতরে বাষ্প জমে আরও ঘ্রাণ ছড়াবে। এক কামড়ে চুনো মাছের নরম টেক্সচার, মরিচের ঝাঁজ আর সরষের তেলের গন্ধে মন ভরে যাবে। পাতুরি খোলার সঙ্গে সঙ্গে কলাপাতার সুগন্ধ ঘরে ছড়িয়ে পড়বে। এক বাটি গরম ভাত, পাশে সামান্য লেবুর টুকরো, আর কিছু লাগবে না।
রান্নার সময় চাইলে আপনি নিজের পছন্দমতো টুইস্টও আনতে পারেন। কেউ কেউ সামান্য নারকেল কোরানো (Grated Coconut) যোগ করেন, যা মশলায় মিষ্টি ঘ্রাণ আনে। আবার কেউ পাতুরি বাষ্পে রান্না করেন, সে ক্ষেত্রেও স্বাদে নতুন মাত্রা আসে। একজন অভিজ্ঞ গৃহিণীর বলেন, “চুনো মাছের মরিচখোলা পাতুরি এমন একটা পদ, যেটা একদিকে সহজ, অন্যদিকে নস্টালজিক। আমাদের ছোটবেলায় মা এইভাবে কলাপাতায় বেঁধে কাঠের চুলায় রান্না করতেন। সেই ঘ্রাণ আজও ভুলতে পারিনি।”
অন্যদিকে এক রন্ধনশিল্পী অর্ণব ঘোষ বলেন, “এই রেসিপিতে কলাপাতা শুধু র্যাপ নয়, আসলে ফ্লেভার ট্রান্সমিটার। পাতার তাপ ও তেলের মিশ্রণে যে ধোঁয়াটে ঘ্রাণ তৈরি হয়, সেটাই চুনো মাছের এই পাতুরির আত্মা।”
চুনো মাছের মরিচখোলা পাতুরি কেবল একটি পদ নয়, এটি বাংলার রান্নার ঐতিহ্যের অংশ। শহরের রান্নাঘরে হারিয়ে যাওয়া সেই স্বাদ আবার ফিরিয়ে আনার এক অসাধারণ উপায় এটি। আপনি চাইলে এটি রুটি বা পরোটা সঙ্গে খেতেও পারেন, তবে ভাতের সঙ্গে এর তুলনা হয় না। এই রান্নার বিশেষত্ব হল, কম সময়, কম খরচ, অথচ স্বাদে অতুলনীয়। তাই সপ্তাহান্তে বা অতিথি এলে এই দেশি পদটি একবার বানিয়ে ফেলুন। একবার স্বাদ পেলে বারবারই বানাতে ইচ্ছে করবে, গ্যারান্টি রইল!
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Begun Posto Recipe | এমন স্বাদের বেগুন পোস্ত রেসিপি, একবার খেলে আরও খাওয়ার জন্য আঙুল চাটবেন



