সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বেজিং : দিল্লি সফর শেষ করে বেজিংয়ে ফিরেছেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (Xi Jinping)। আর তাঁর ফেরার পরই ভারত-চিন সম্পর্ক নিয়ে বড় বার্তা দিল বেজিং। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) -এর সঙ্গে শি জিনপিংয়ের বৈঠককে ঘিরে চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই (Wang Yi) জানান, দুই দেশের রাষ্ট্রনেতাদের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্য তৈরি হয়েছে একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে ভারত ও চিনকে পরস্পরের অংশীদার হিসেবে এগোতে হবে, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়। ১২ সেপ্টেম্বর নতুন দিল্লিতে মোদী ও শি-র বৈঠকের পর চিনা বিদেশমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে দুই দেশের সম্পর্কের সাম্প্রতিক গতিপথে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন : CPIM China Visit | চিনের আমন্ত্রণে বেজিং সফরে সিপিএম শীর্ষ নেতৃত্ব
ব্রিক্স সম্মেলনে যোগ দিতে ১২ সেপ্টেম্বর নতুন দিল্লিতে এসেছিলেন শি জিনপিং। ১৩ সেপ্টেম্বর সম্মেলন শেষ করে তিনি চিনে ফিরে যান। তার পরেই চিনা বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই চিনা সরকারি সংবাদমাধ্যমকে মোদী-শি বৈঠকের বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করেন। তাঁর দাবি, দুই রাষ্ট্রনেতা ভারত-চিন সম্পর্কের কৌশলগত, দীর্ঘস্থায়ী ও ভবিষ্যৎমুখী বিভিন্ন দিক নিয়ে গভীর ও খোলামেলা আলোচনা করেছেন। সেই আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল হিসেবে উঠে এসেছে দুই দেশকে অংশীদার হিসেবে দেখার সিদ্ধান্ত। ওয়াং ই-র বক্তব্য অনুযায়ী, চিন ও ভারত একে অপরের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এগোতে পারে। দুই দেশের উন্নয়নের পথে পরস্পরকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে থাকা মতপার্থক্যও আলোচনার মাধ্যমে সামলানোর কথা উঠে এসেছে। চিনা পক্ষের বক্তব্যে তাই শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কথা নয়, কিন্তু অর্থনীতি, উন্নয়ন, বহুপাক্ষিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বৃহত্তর পরিসরে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন জায়গায় নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে।
দিল্লির অবস্থানও নিজের জায়গায় যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। মোদী-শি বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভারত-চিন সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, পারস্পরিক স্বার্থ ও পরস্পরের সংবেদনশীলতার বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দিতে হবে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকও ১৫ সেপ্টেম্বর জানায়, চিনের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে এই তিনটি নীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং পারস্পরিক সংবেদনশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকার বাকি সমস্যাগুলির সমাধানও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে নয়াদিল্লির তরফে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ বেজিং যেখানে ‘অংশীদার’ শব্দটিকে সামনে আনছে, দিল্লি সেখানে সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বার্থের ভারসাম্যের কথা বলছে। দুই পক্ষের বক্তব্যে ভাষার পার্থক্য থাকলেও একটি জায়গায় মিল রয়েছে, দুই দেশই আপাতত সংঘাতের বদলে সংলাপ ও সম্পর্কের স্থিতিশীলতার দিকে এগোতে চাইছে। বিশেষ করে ২০২০ সালের সীমান্ত উত্তেজনার পর ভারত-চিন সম্পর্ক যে দীর্ঘ সময় ধরে চাপের মধ্যে ছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে এই পরিবর্তন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
নরেন্দ্র মোদী ও শি জিনপিং -এর বৈঠকে সীমান্ত পরিস্থিতিও আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। চিনা পক্ষ জানিয়েছে, দুই নেতা সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে একমত হয়েছেন। একই সঙ্গে দুই দেশই নিজেদের মধ্যে থাকা মতপার্থক্যকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। বেজিংয়ের ব্যাখ্যায় সীমান্ত সমস্যা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে পাশাপাশি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ এক দিকে সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা, অন্য দিকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানো, দুই পথই একসঙ্গে চলবে বলে চিনের বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে। এই পরিবর্তনের পিছনে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণও রয়েছে। ভারত ও চিন, দুই দেশই বর্তমানে নিজেদের কৌশলগত পরিসর বাড়ানোর চেষ্টা করছে। আমেরিকা-চিন বাণিজ্যিক ও কৌশলগত টানাপড়েনের মধ্যেও বেজিং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখতে আগ্রহী। অন্য দিকে দিল্লিও একদিকে আমেরিকা, ইউরোপ এবং অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে অন্য দিকে চিনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পথ খোলা রাখতে চাইছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক এখন শুধুমাত্র সীমান্ত সমস্যার মধ্যে আটকে নেই; বাণিজ্য, প্রযুক্তি, সরাসরি যোগাযোগ, বহুপাক্ষিক সংগঠন ও আঞ্চলিক রাজনীতিও তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
ব্রিক্সও এই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠছে। ২০২৬ সালে ব্রিক্সের সভাপতিত্ব করছে ভারত এবং ২০২৭ সালে সভাপতিত্বের দায়িত্ব যাবে চিনের হাতে। ফলে আগামী দুই বছর নয়াদিল্লি ও বেজিংয়ের মধ্যে বহুপাক্ষিক সমন্বয়ের সুযোগ আরও বাড়তে পারে। ওয়াং ই জানিয়েছেন, দুই দেশ একে অপরের ব্রিক্স সভাপতিত্বকে সহযোগিতা করার বিষয়েও সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রপুঞ্জ, সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন এবং জি২০-র মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়ানোর কথাও উঠে এসেছে। শুধু কূটনীতি নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। চিনা পক্ষ জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ, মানুষের যাতায়াত এবং সরাসরি বিমান পরিষেবা বাড়ানোর বিষয়ে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনার প্রভাব পড়েছিল বিভিন্ন স্তরের যোগাযোগে। সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে বাণিজ্যিক ও জনপর্যায়ের যোগাযোগ স্বাভাবিক করার উদ্যোগ ভবিষ্যতে সম্পর্কের গতিপথ বদলাতে পারে।
চিনা বিদেশমন্ত্রী আরও দাবি করেছেন, ভারত-চিন সম্পর্কের উন্নতি শুধু দুই দেশের জন্য নয়, বৃহত্তর গ্লোবাল সাউথের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের বিপুল জনসংখ্যা এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে সামনে রেখে বেজিং মনে করছে, ভারত ও চিন একসঙ্গে কাজ করলে উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বাড়তে পারে। বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে সমন্বয়ের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছে চিন। কিন্তু, ভারত-চিন সম্পর্কের সামনে এখনও একাধিক কঠিন প্রশ্ন রয়েছে। সীমান্ত সমস্যার পূর্ণ সমাধান হয়নি। বাণিজ্য ঘাটতি, বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক আস্থার মতো বিষয়গুলিও দুই দেশের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ। তাই একটি বৈঠকের পরেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে গিয়েছে, এমন ধারণা করার সুযোগ নেই। বরং সাম্প্রতিক বৈঠককে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার নতুন পর্বের সূচনা হিসেবে দেখাই বেশি যুক্তিসঙ্গত। বেজিং অবশ্য এই সম্পর্ককে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভাষা ব্যবহার করছে। চিনা বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্যে উল্লেখ, দুই দেশের সম্পর্ক এক সময়ের নিম্নগতি থেকে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়ে এখন ‘নতুন উচ্চতায়’ যাওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। চিনের দাবি, সম্পর্কের উন্নতি সহজে আসেনি, তাই এই অগ্রগতিকে ধরে রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভারত-চিনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বদলে অংশীদার হিসেবে দেখার ধারণাকে সামনে রাখা হয়েছে।
ভারতের দিক থেকেও সম্পর্ক উন্নয়নের দরজা খোলা রাখার ইঙ্গিত মিলেছে। তবে নতুন দিল্লি একই সঙ্গে সীমান্তে শান্তি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছে। ফলে সামনে যে পথ, তা নিঃসন্দেহে সহজ নয়। কিন্তু সরাসরি আলোচনা, সীমান্তে স্থিতিশীলতা ও বহুপাক্ষিক মঞ্চে সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে দুই দেশ সম্পর্কের নতুন কাঠামো তৈরি করতে পারে। শি জিনপিং দিল্লি ছাড়ার পর ওয়াং ই -এর ‘অংশীদার’ মন্তব্য তাই কূটনৈতিক মহলে যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে। একদিকে চিন চাইছে ভারতকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযোগী হিসেবে দেখাতে; অন্যদিকে ভারতও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে, যদিও সীমান্ত এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছে। এখন দেখার বিষয়, দিল্লির বৈঠকের এই রাজনৈতিক বোঝাপড়া আগামী দিনে বাণিজ্য, সীমান্ত, যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে কতটা বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয়। কারণ কূটনীতিতে একটি বৈঠক নতুন দরজা খুলতে পারে, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে দুই দেশ কতটা দূর একসঙ্গে হাঁটবে, তার উত্তর মিলবে পরবর্তী পদক্ষেপেই।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India Asia Cup Trophy, Harmanpreet Kaur Mohsin Naqvi | এশিয়া কাপ জিতেও ট্রফি হাতে উঠল না ভারতের! নকভির হাত থেকে পুরস্কার নিলেন না হরমনপ্রীতেরা, ফের সেই একই ছবি




