সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নন্দীগ্রাম, পূর্ব মেদিনীপুর : নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর দুই কেন্দ্রেই উপনির্বাচনের দামামা বেজে গিয়েছে। ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই জমে উঠছে রাজনৈতিক তরজা। তার মধ্যেই সংখ্যালঘু ভোটারদের উদ্দেশ্যে সরাসরি রাজনৈতিক আবেদন রাখলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। নন্দীগ্রামের মাটিতে দাঁড়িয়ে তাঁর বক্তব্য, সরকারের সঙ্গে থাকতে চাইলে এবার ভোটের ময়দানেই নিজেদের অবস্থান জানানোর সুযোগ রয়েছে। আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে উপনির্বাচন। তার আগে শুভেন্দুর এই বক্তব্য ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। দলীয় কর্মীদের সঙ্গে নন্দীগ্রামে প্রচারে গিয়ে শুভেন্দু বলেন, সংখ্যালঘু ভোটারদের সামনে এবার নিজেদের সিদ্ধান্ত জানানোর সময় এসেছে। তাঁর কথায়, ‘সরকার ও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে থাকতে চাইলে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। ৬ অক্টোবর সেই পরীক্ষার দিন।’
একইসঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী বলেন নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের সংখ্যালঘু ভোটারদের উদ্দেশ্যে সিদ্ধান্ত তাঁদের হাতেই ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেন। তাঁর দাবি, ভোটের ফলাফলে বিজেপির জয় নিয়ে তিনি নিশ্চিত ও নন্দীগ্রামে জয়ের ব্যবধান এমন হতে পারে, যা অনেকের ধারণার বাইরে। অন্যদিকে, নন্দীগ্রামের উপনির্বাচন অবশ্য শুধুমাত্র একটি বিধানসভা আসন ধরে রাখার লড়াই নয়। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর দুই কেন্দ্র থেকেই জয়ী হয়েছিলেন। পরে ভবানীপুর আসনটি ধরে রেখে নন্দীগ্রাম ছেড়ে দেন তিনি। সেই কারণেই এই কেন্দ্রে উপনির্বাচন হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের সূচি অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর ভোটগ্রহণ এবং ৯ অক্টোবর গণনা হবে।
এবার নন্দীগ্রামে বিজেপির প্রার্থী হয়েছেন হাসিরাণী রথ (Hasirani Rath), যিনি দলের প্রয়াত নেতা চন্দ্রনাথ রথের (Chandranath Rath) মা। চন্দ্রনাথ ছিলেন শুভেন্দুর আপ্তসহায়ক। তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে এবং ঘটনার তদন্ত করছে সিবিআই (CBI)। ফলে হাসিরাণীকে প্রার্থী করার মধ্যেও রাজনৈতিক সমীকরণ ও আবেগ, দুই দিকই কাজ করছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। এই পরিস্থিতিতে শুভেন্দুর সংখ্যালঘু ভোটারদের উদ্দেশে করা বক্তব্যের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ নন্দীগ্রামের নির্বাচনী সমীকরণে সংখ্যালঘু ভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০২৬ সালের ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নন্দীগ্রামে সম্পূরক তালিকা থেকে বাদ পড়া ২,৮২৬ জন ভোটারের মধ্যে প্রায় ২,৭০০ জন মুসলিম ভোটার ছিলেন। অর্থাৎ বাদ পড়া নামের প্রায় ৯৫.৫ শতাংশই মুসলিম ভোটার বলে ওই তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছিল।
এই তথ্যকে ঘিরে ভোটের আগে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছিল। তবে ভোটার তালিকায় নাম বাদ পড়ার কারণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হলেও, নির্বাচনী ফলের ক্ষেত্রে এর কী প্রভাব পড়বে তা আগে থেকে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। এখন উপনির্বাচনের প্রচারে সেই ভোটব্যাঙ্কই যে রাজনৈতিক দলগুলির অন্যতম লক্ষ্য, শুভেন্দুর বক্তব্যে তার ইঙ্গিত মিলেছে। নন্দীগ্রামে বিজেপির মূল শক্তি হিন্দু ভোটের একটি বড় অংশ, এমন দাবি দলের তরফে দীর্ঘদিন ধরে করা হয়েছে। অন্যদিকে সংখ্যালঘু ভোটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কোন দিকে যায়, তার উপর ব্যবধান কতটা হবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে হিসাব-নিকাশ। শুভেন্দু নিজেও তাঁর বক্তব্যে ভোটের ব্যবধানের কথা তুলে ধরে সংখ্যালঘু ভোটারদের উদ্দেশ্যে সরাসরি আবেদন করেছেন। তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক লক্ষ্য তাই শুধু জয় নয়, বড় ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করা।
রেজিনগরের সমীকরণ আরও আলাদা। মুর্শিদাবাদের এই বিধানসভা কেন্দ্রে সংখ্যালঘু ভোটারদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রেজিনগর থেকে জয় পেয়েছিলেন হুমায়ুন কবীর (Humayun Kabir)। তিনি বিজেপি প্রার্থীকে ৫৮,৮৭৬ ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছিলেন বলে প্রদত্ত নির্বাচনী হিসেবে উল্লেখ। এবার সেই আসনেই নতুন লড়াই। ফলে রেজিনগরে সংখ্যালঘু ভোট কোন দিকে যায়, তা নির্বাচনী ফলাফলের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নিতে পারে। শুভেন্দুর বক্তব্যে তাই নন্দীগ্রামের পাশাপাশি উঠে এসেছে রেজিনগরের নামও। তাঁর বক্তব্য, দুই কেন্দ্রের সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছেই নিজেদের অবস্থান জানানোর সুযোগ রয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, বিজেপি ভোট করতে জানে এবং ভোট করাতেও জানে। তাঁর কথায়, নন্দীগ্রামে এমন ব্যবধানে বিজেপি জিতবে, যা ‘কেউ কল্পনা করতে পারবে না’। এই দাবি অবশ্য তাঁর রাজনৈতিক পূর্বাভাস, নির্বাচনের ফল নয়।
উপনির্বাচনের আগে বিজেপির প্রচারে একদিকে যেমন নন্দীগ্রামের স্থানীয় রাজনৈতিক আবেগকে সামনে আনা হচ্ছে, অন্যদিকে সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টাও বাড়ছে। সাম্প্রতিক বক্তব্যে শুভেন্দু উন্নয়নমূলক প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার প্রসঙ্গও তুলেছেন। তাঁর দাবি, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করা হয় না ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বহু পরিবারও বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় এসেছে। বিজেপির প্রচারে এই বক্তব্যের মাধ্যমে সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে দল সম্পর্কে ধারণা বদলানোর চেষ্টা হচ্ছে। উল্লেখ্য, নন্দীগ্রামের রাজনীতিতে শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত প্রভাবও এই উপনির্বাচনের অন্যতম বড় বিষয়। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Mamata Banerjee) হারিয়ে জাতীয় রাজনীতিতেও তিনি নন্দীগ্রামের নাম সামনে এনেছিলেন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ফের এই কেন্দ্র থেকে জয় পান। এবার অবশ্য তিনি নিজে প্রার্থী নন। তাঁর জায়গায় বিজেপির প্রার্থী হাসিরাণী রথ। ফলে এই ভোটকে অনেকে শুভেন্দুর রাজনৈতিক প্রভাবের পরীক্ষাও হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরও নিজেদের মতো করে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নন্দীগ্রামে বামফ্রন্টের তরফে সন্তিগোপাল গিরি ও কংগ্রেসের তরফে মিলন প্রধান প্রার্থী হয়েছেন। রেজিনগরেও একাধিক রাজনৈতিক দলের প্রার্থী থাকায় ভোটের লড়াই একমুখী নয়। ফলে সংখ্যালঘু ভোটের ভাগাভাগি, বিরোধী ভোটের বিভাজন এবং স্থানীয় সংগঠন, সবকিছুর উপরই ফলাফল নির্ভর করতে পারে। তার মধ্যেই ৬ অক্টোবরের ভোটকে সামনে রেখে শুভেন্দুর ‘পরীক্ষা’র বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সংখ্যালঘু ভোটারদের উদ্দেশ্যে তাঁর এই আহ্বান মূলত বিজেপির পক্ষে ভোট টানার প্রচারের অংশ। তিনি একদিকে সরকারের সঙ্গে থাকার কথা বলেছেন, অন্যদিকে ভোটের ফলাফলের মাধ্যমে সেই সমর্থনের প্রকাশ দেখতে চেয়েছেন। ফলে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে ভোটের লড়াই এখন শুধু প্রার্থী বনাম প্রার্থীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; কোন সম্প্রদায়ের কত ভোট কোন দিকে যায়, সেই হিসাবও প্রচারের অন্যতম কেন্দ্রে চলে এসেছে।
৬ অক্টোবরের ভোটে শেষ পর্যন্ত সংখ্যালঘু ভোটারদের বড় অংশ কোন সিদ্ধান্ত নেন, নন্দীগ্রামে বিজেপির জয়ের ব্যবধান কত হয় ও রেজিনগরে ২০২৬-এর ফলের পুনরাবৃত্তি হয় কি না, এই তিন প্রশ্নের উত্তর মিলবে গণনার দিন। তার আগে শুভেন্দু অধিকারীর ‘সুযোগ’ এবং ‘পরীক্ষা’র মন্তব্য দুই কেন্দ্রের ভোটের প্রচারে যে নতুন রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তা নিয়ে আর কোনও সংশয় নেই।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Vande Mataram mandatory in schools, Suvendu Adhikari decision | স্কুলে বাধ্যতামূলক ‘বন্দে মাতরম’: সোমবার থেকেই নতুন নিয়ম, শুভেন্দু অধিকারী -এর ঘোষণায় জোর চর্চা রাজ্যে




