সাশ্রয় নিউজ স্পোর্টস ডেস্ক ★ মুম্বাই : ব্যাট হাতে বিশ্ব ক্রিকেটে একের পর এক নজির গড়েছেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর রান, শতরান ও দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতা তাঁকে কিংবদন্তির আসনে বসিয়েছে। অথচ অধিনায়ক হিসেবে সেই সাফল্যের প্রতিফলন দেখা যায়নি সচিন তেন্ডুলকরের (Sachin Tendulkar) কেরিয়ারে। কেন নেতৃত্বের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি মাস্টার ব্লাস্টার? এত দিন পর সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে মুখ খুলে ভারতীয় ক্রিকেটের নব্বইয়ের দশকের প্রশাসনিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করলেন। জানান, অধিনায়ক হয়েও নিজের পছন্দমতো দল নির্বাচনের স্বাধীনতা তাঁর হাতে ছিল না। বর্তমান ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (BCCI) সঙ্গে সেই সময়ের কাজের ধরনেও ছিল বিস্তর পার্থক্য। শুধু নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা নয়, ভারতীয় ক্রিকেটের কঠিন একটি দিক নিয়েও স্মৃতিচারণ করেছেন সচিন। তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে ক্রিকেট মহলে।
সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে অনুরাগীদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নিয়েছিলেন সচিন। সেখানেই একজন অনুরাগী তাঁর অধিনায়কত্বের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চান। উত্তরে নিজের নেতৃত্বের সময়কার নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক। সচিনের কথায়, দেশের হয়ে অধিনায়কত্ব করা যে কোনও ক্রিকেটারের কাছে অত্যন্ত সম্মানের। তাঁর কাছেও বিষয়টি ছিল গর্বের। কিন্তু অধিনায়কের দায়িত্ব পাওয়ার অর্থ সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার পাওয়া নয়। তাঁর ক্ষেত্রে দল নির্বাচন থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে স্বাধীনতার অভাব ছিল। সচিনের বক্তব্য, অধিনায়ক হিসেবে নিজের পছন্দ অনুযায়ী দল সাজানোর সুযোগও তিনি সব সময় পাননি। ক্রিকেটে অধিনায়কের ভূমিকা কেবল মাঠে টস করা কিংবা বোলার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দলের ভারসাম্য তৈরি, কোন ক্রিকেটারকে কোন পরিস্থিতিতে খেলানো হবে, নতুন খেলোয়াড়কে সুযোগ দেওয়া ও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কৌশল নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সঙ্গে অধিনায়কের নেতৃত্ব জড়িত। অথচ তাঁর অধিনায়কত্বের সময় দল নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা ছিল না বলে জানিয়েছেন মাস্টার ব্লাস্টার।
বর্তমান বিসিসিআইয়ের সঙ্গে নব্বইয়ের দশকের বোর্ডের কাজের পদ্ধতির তুলনা করেও নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন সচিন। তাঁর মতে, বর্তমানে ভারতীয় ক্রিকেট প্রশাসন অনেক বেশি পেশাদার। ক্রিকেটারদের সুযোগ-সুবিধা, দল পরিচালনা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যে ধরনের কাঠামো এখন তৈরি হয়েছে, নব্বইয়ের দশকে তা ছিল না। সেই সময়ের পরিস্থিতিতে অধিনায়ক হিসেবে নিজের পরিকল্পনা কার্যকর করা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়ত। ফলে মাঠের পারফরম্যান্সের দায়ভার অধিনায়কের কাঁধে থাকলেও সব ক্ষেত্রে তাঁর হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকত না। সচিনের অধিনায়কত্বের সময় ভারতীয় ক্রিকেট একাধিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে ম্যাচ গড়াপেটার অভিযোগ ভারতীয় ক্রিকেটের ভাবমূর্তিকে বড় ধাক্কা দেয়। ক্রিকেটের মাঠের বাইরের নানা বিতর্ক ও প্রশাসনিক অস্থিরতা নিয়ে তখন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল। সেই সময়ের পরিস্থিতিকে ভারতীয় ক্রিকেটের ‘অন্ধকার সময়’ বলে উল্লেখ করেছেন সচিন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, ওই পর্বে জাতীয় দলের নেতৃত্ব দেওয়া মোটেই সহজ কাজ ছিল না। একজন অধিনায়ককে শুধু প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করলেই চলত না, দলের বাইরের পরিস্থিতির চাপও সামলাতে হত।
উল্লেখ্য, সচিন দু’দফায় ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথমবার ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তাঁর হাতে নেতৃত্বের দায়িত্ব ছিল। সেই সময় ব্যাটার হিসেবে তিনি ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের জায়গা তৈরি করে ফেলেছিলেন। কিন্তু অধিনায়ক হিসেবে দলের কাছ থেকে প্রত্যাশিত ফল আদায় করতে পারেননি। ১৯৯৭ সালে তাঁকে সরিয়ে মহম্মদ আজহারউদ্দিনকে (Mohammad Azharuddin) আবার ভারতীয় দলের অধিনায়ক করা হয়। এর পর ১৯৯৯ সালের এক দিনের বিশ্বকাপের পর ফের নেতৃত্বের দায়িত্ব পান সচিন। দ্বিতীয় দফায় অধিনায়কত্ব করতে গিয়েও সচিন সাফল্যের মুখ দেখেননি। শেষ পর্যন্ত ২০০০ সালে দায়িত্ব ছেড়ে দেন। তাঁর জায়গায় ভারতীয় দলের অধিনায়ক হন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় (Sourav Ganguly)।
পরবর্তী সময়ে সৌরভের নেতৃত্বে ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন পর্ব শুরু হয়। বিদেশের মাটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মানসিকতা, তরুণ ক্রিকেটারদের সুযোগ দেওয়া ও শক্তিশালী দল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু, অধিনায়ক হিসেবে সচিনের পরিসংখ্যানও তাঁর নেতৃত্বের সময়কার কঠিন বাস্তবতার পরিচয় দেয়। ভারতের হয়ে ২৫টি টেস্টে অধিনায়কত্ব করেছিলেন সচিন। তার মধ্যে মাত্র চারটি ম্যাচে জয় পেয়েছিল ভারত। ন’টি টেস্টে পরাজয়ের মুখ দেখতে হয়েছিল দলকে। বাকি ১২টি ম্যাচ ড্র হয়েছিল। একদিনের ক্রিকেটেও অধিনায়ক হিসেবে তাঁর জয়-পরাজয়ের অনুপাত খুব একটা ভাল ছিল না। মোট ৭৩টি এক দিনের ম্যাচে ভারতকে নেতৃত্ব দিয়ে ২৩টিতে জয় এনে দিয়েছিলেন সচিন। অন্যদিকে, ৪৩টি ম্যাচে পরাজিত হয়েছিল ভারতীয় দল।
এই পরিসংখ্যানের বাইরে অধিনায়কত্বের সময়কার প্রশাসনিক পরিবেশ নিয়েও সচিনের মন্তব্য নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছে। কারণ, কোনও দলের অধিনায়কের সাফল্য নির্ভর করে শুধু তাঁর ক্রিকেটীয় দক্ষতার উপর নয়। দল নির্বাচনের ক্ষেত্রে মতামতের গুরুত্ব, বোর্ডের সহযোগিতা, ক্রিকেটারদের সঙ্গে সমন্বয় ওভ দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ। সচিনের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর সময় এই বিষয়গুলির ক্ষেত্রে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। ফলে অধিনায়ক হিসেবে তাঁর সাফল্যের বিচার করতে গেলে তৎকালীন পরিস্থিতিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। সম্প্রতি অনুরাগীদের সঙ্গে কথোপকথনে সচিনকে তাঁর পছন্দের অধিনায়কের নামও জানতে চাওয়া হয়েছিল। উত্তরে তিনি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ও মহেন্দ্র সিংহ ধোনির (MS Dhoni) নাম উল্লেখ করেন। দু’জনের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে রাজি হননি। ভারতীয় ক্রিকেটে এই দুই অধিনায়কের অবদান যে আলাদা ধরনের, তা তাঁর উত্তরের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে।
সৌরভের নেতৃত্বে ভারতীয় দল বিদেশের মাটিতে লড়াই করার নতুন আত্মবিশ্বাস পেয়েছিল। অন্যদিকে, ধোনির নেতৃত্বে ভারত একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় শিরোপা জেতে। ২০০৭ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ২০১১ সালের একদিনের বিশ্বকাপ ও ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়ের পিছনে ধোনির নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পরবর্তী সময়ে রাহুল দ্রাবিড় (Rahul Dravid) ও ধোনির হাত ধরে ভারতীয় ক্রিকেট আরও সাফল্য অর্জন করে। অধিনায়কত্বের দায়িত্বে বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন এলেও ভারতীয় দলের শক্তি ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি ক্রমশ বেড়েছে। সেই পরিবর্তনের ধারায় সচিনের অধিনায়কত্বও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ব্যাটার হিসেবে তাঁর কৃতিত্ব নিয়ে কোনও প্রশ্ন না থাকলেও নেতৃত্বের সময়কার ব্যর্থতা নিয়ে এত দিন আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এবার তাঁর নিজের বক্তব্যে সামনে এসেছে সেই সময়ের প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার বিষয়টি। উল্লেখ্য যে, সচিনের সাম্প্রতিক মন্তব্যে সরাসরি কাউকে দায়ী করার প্রবণতা নেই।
সচিন নিজের অভিজ্ঞতা ও তৎকালীন ক্রিকেট প্রশাসনের সঙ্গে তিনি বর্তমান ব্যবস্থার পার্থক্য তুলে ধরেছেন। তাঁর কথায়, অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পালন করলেও সব সময় নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ পাননি। ফলে নব্বইয়ের দশকে ভারতীয় ক্রিকেটের পরিবেশ কতটা কঠিন ছিল, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যে ক্রিকেটার ব্যাট হাতে দেশের হয়ে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত তৈরি করেছেন, তাঁর নেতৃত্বের সময়কার অভিজ্ঞতার এই দিকটি এত বছর পর প্রকাশ্যে আসায় ক্রিকেটপ্রেমীদের আগ্রহ বেড়েছে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sourav Ganguly, Delhi Capitals | অমিত মিশ্রকে স্পিন কোচ করলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়



