সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : সচিন তেন্ডুলকরের (Sachin Tendulkar) দখলে থাকা এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের একটি দীর্ঘস্থায়ী নজির আর থাকল না। ২২ বছরেরও বেশি সময় ধরে এক দিনের ক্রিকেটে সক্রিয় থাকার রেকর্ডকে পিছনে ফেলে নতুন বিশ্বরেককর্ড গড়লেন জ়িম্বাবোয়ের ব্রেন্ডন টেলর (Brendan Taylor)। হারারেতে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে এক দিনের সিরিজের প্রথম ম্যাচে মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গেই টেলরের আন্তর্জাতিক ওয়ান ডে কেরিয়ারের মেয়াদ পৌঁছে গেল ২২ বছর চার মাসে। আর সেই মুহূর্তেই সচিনের দীর্ঘদিনের রেকর্ড চলে গেল জ়িম্বাবোয়ের ৪০ বছর বয়সি উইকেটরক্ষক-ব্যাটারের দখলে। এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় খেলার রেকর্ড এত দিন ছিল সচিনের নামে। ১৯৮৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ওয়ান ডে অভিষেক হয়েছিল ভারতের কিংবদন্তী ব্যাটারের। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে এক দিনের ক্রিকেটে ৪৬৩টি ম্যাচ খেলেছেন সচিন। ২০১২ সালের ১৮ মার্চ পাকিস্তানের বিরুদ্ধেই শেষ ওয়ান ডে ম্যাচ খেলেন সচিন। প্রথম ম্যাচ থেকে শেষ ম্যাচ পর্যন্ত সময়ের হিসাবে তাঁর এক দিনের আন্তর্জাতিক কেরিয়ার ছিল ২২ বছর তিন মাস। দীর্ঘ সময় ধরে এই নজির অক্ষত ছিল।
কিন্তু সময়ের সেই হিসাবকে পিছনে ফেলে দিলেন টেলর। জিম্বাবোয়ের হয়ে ২০০৪ সালের ২০ এপ্রিল শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে তিনি প্রথম এক দিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছিলেন। তার পর থেকে আন্তর্জাতিক ওয়ান ডে ক্রিকেটের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক একাধিক ওঠাপড়ার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। মঙ্গলবার অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে মাঠে নামার মুহূর্তে সেই সম্পর্ক ২২ বছর চার মাসের গণ্ডি পার করে যায়। অর্থাৎ সচিনের ২২ বছর তিন মাসের রেকর্ডকে টপকে এক দিনের ক্রিকেটে দীর্ঘতম কেরিয়ারের নতুন নজির তৈরি করেন টেলর।
টেলরের এই রেকর্ডের আরও একটি দিক রয়েছে। সচিন যেখানে ৪৬৩টি এক দিনের ম্যাচ খেলেছেন, টেলর নিজের ২০৮তম ওয়ান ডে ম্যাচে এই কীর্তি গড়লেন। ম্যাচের সংখ্যায় দুই ক্রিকেটারের মধ্যে বড় পার্থক্য থাকলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সক্রিয় থাকার সময়ের বিচারে টেলর এখন সবার উপরে। ক্রিকেটের পরিসংখ্যানে তাই নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত হল জিম্বাবোয়ের এই তারকার নামে। টেলরের আন্তর্জাতিক কেরিয়ার অবশ্য শুধু দীর্ঘ সময় মাঠে থাকার জন্যই উল্লেখযোগ্য নয়। জ়িম্বাবোয়ের ক্রিকেট ইতিহাসে ব্যাট হাতে তাঁর অবদানও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। দেশের হয়ে এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১১টি শতরান করেছেন তিনি। জিম্বাবোয়ের কোনও ক্রিকেটারের ওয়ান ডে-তে সর্বাধিক শতরানের তালিকায় টেলর এখনও শীর্ষে। অর্থাৎ শুধু দীর্ঘ কেরিয়ার নয়, দলের হয়ে রান করার ক্ষেত্রেও নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন টেলর।
২০০৪ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখার সময় জিম্বাবোয়ের ক্রিকেট অন্য রকম পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। সেই সময় থেকে টেলরকে দেশের ব্যাটিং ও উইকেটরক্ষক দুই দায়িত্বই সামলাতে হয়েছে। দলের প্রয়োজন অনুযায়ী কখনও উইকেটের পিছনে গ্লাভস হাতে দাঁড়িয়েছেন, আবার কখনও ব্যাট হাতে ইনিংস গড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে একাধিক প্রজন্মের ক্রিকেটারের সঙ্গে খেলেছেন তিনি। সেই ধারাবাহিকতারই ফল হিসেবে এখন সচিনের মতো কিংবদন্তির নামের পাশে তাঁর নাম উঠে এল একটি বিশ্বরেকর্ডে। টেলরের কেরিয়ারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, তিন ধরনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেই তাঁর উপস্থিতি। জিম্বাবোয়ের হয়ে তিনি ৩৭টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন। এক দিনের ক্রিকেটে তাঁর ম্যাচের সংখ্যা ২০৮। পাশাপাশি দেশের হয়ে ৫৯টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচেও মাঠে নেমেছেন। ফলে জিম্বাবোয়ের ক্রিকেটে তাঁর অবদান শুধু একটি নির্দিষ্ট ফরম্যাটে সীমাবদ্ধ নয়।
সচিনের রেকর্ড টপকানো অবশ্য টেলরের কাছে নিছক একটি পরিসংখ্যানের ঘটনা নয়। সচিনের আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের ব্যাপ্তি আর সাফল্য ক্রিকেট ইতিহাসে আলাদা মর্যাদা পেয়েছে। ২৪ বছরেরও বেশি সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা সচিন টেস্ট এবং ওয়ান ডে দুই ফরম্যাটেই দীর্ঘ সময় শীর্ষ পর্যায়ে ছিলেন। কিন্তু এখানে যে রেকর্ডটির কথা বলা হচ্ছে, সেটি নির্দিষ্ট ভাবে এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সক্রিয় থাকার সময়ের হিসাব। সেই জায়গাতেই টেলর তাঁর নাম লিখিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, ক্রিকেটে দীর্ঘ কেরিয়ার ধরে রাখার বিষয়টি সহজ নয়। চোট, ফর্মের ওঠানামা, দলের পরিবর্তন, নির্বাচকদের সিদ্ধান্ত এবং ক্রিকেটের ধরনে বদল, সবকিছুর সঙ্গে তাল মিলিয়েই একজন ক্রিকেটারকে এগোতে হয়। টেলরও তাঁর দীর্ঘ কেরিয়ারে নানা পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। এক সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে সরে যাওয়ার পর আবার ফিরে আসার ঘটনাও তাঁর কেরিয়ারের অংশ। ফলে ২২ বছর চার মাসের এই সময়সীমা তাঁর দীর্ঘ ক্রিকেটজীবনের ধারাবাহিকতাকেই তুলে ধরছে।
অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে হারারের ম্যাচটি তাই টেলরের জন্য আরও একটি কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকল। ম্যাচের ফল বা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের বাইরে তাঁর মাঠে নামাটাই তৈরি করল ক্রিকেটের পরিসংখ্যানে নতুন নজির। ৪০ বছর বয়সে এখনও এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাঠে নেমে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় টিকে থাকার লড়াই কতটা কঠিন। টেলরের রেকর্ডের ক্ষেত্রে আর একটি বিষয় নজরে আসে। তিনি সচিনের চেয়ে ২৫৫টি কম ওয়ান ডে ম্যাচ খেলেও দীর্ঘ সময়ের বিচারে ভারতীয় কিংবদন্তিকে পিছনে ফেলেছেন। কারণ সচিনের সময়কার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যালেন্ডার এবং বর্তমান সময়ের ক্রিকেট সূচির মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। একটি ক্রিকেটার কত ম্যাচ খেলেছেন এবং কত বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সক্রিয় ছিলেন, দু’টি আলাদা পরিসংখ্যান। টেলরের নতুন রেকর্ডটি দ্বিতীয় হিসাবের উপর নির্ভরশীল।
জিম্বাবোয়ের ক্রিকেটে টেলরের গুরুত্ব বোঝার জন্য তাঁর ওয়ান ডে শতরানের সংখ্যাটিও যথেষ্ট। ১১টি শতরান নিয়ে তিনি দেশের হয়ে এই ফরম্যাটে সর্বোচ্চ শতরানকারী ক্রিকেটারদের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন। দীর্ঘ কেরিয়ারে দলের হয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেছেন তিনি। উইকেটরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ব্যাটিং অর্ডারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়াও তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সচিনের রেকর্ড হাতছাড়া হওয়ার খবর ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছেও তাই অন্য রকম একটি পরিসংখ্যানগত ঘটনা। কারণ সচিনের নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক দিনের ক্রিকেটের অসংখ্য নজিরের মধ্যে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের এই রেকর্ডটিও বহু বছর ধরে আলোচনায় ছিল। এবার সেই জায়গায় উঠে এলেন জ়িম্বাবোয়ের ব্রেন্ডন টেলর।
ক্রিকেটের রেকর্ডের খাতা অবশ্য সময়ের সঙ্গে বদলাতেই থাকে। কোনও নজির বছরের পর বছর টিকে থাকে, আবার কোনওটি নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটার এসে ভেঙে দেন। টেলরের ক্ষেত্রে ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তাঁর সামনে এখনও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সক্রিয় থাকার আরও সুযোগ রয়েছে। ফলে ২২ বছর চার মাসের এই ব্যবধান ভবিষ্যতে আরও বাড়বে কি না, সেটিও নজরে থাকবে। হারারেতে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে মাঠে নামার দিন তাই ব্রেন্ডন টেলরের কেরিয়ারে নতুন একটি সংখ্যা যোগ হল। ২০০৪ সালের ২০ এপ্রিল শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা ২২ বছর চার মাসের গণ্ডি পেরিয়ে এখন এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘতম কেরিয়ারের বিশ্বরেকর্ডে পৌঁছেছে। সচিন তেন্ডুলকরের ২২ বছর তিন মাসের নজির পিছনে পড়েছে। ২০৮ ম্যাচে জ়িম্বাবোয়ের এই ক্রিকেটার এখন ওয়ান ডে ইতিহাসের সেই বিশেষ তালিকার শীর্ষে, যেখানে এক সময় একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল সচিনের।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন :llAsia Cup 2025, Gautam Gambhir | ‘সুযোগ কাজে লাগাও…’, এশিয়া কাপের আগে টিম ইন্ডিয়াকে অনুপ্রেরণা দিলেন গৌতম গম্ভীর




