শোভনা মাইতি, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুম্বাই : শাহরুখ খানের সঙ্গে ‘ডাঙ্কি’-তে অভিনয়ের পর বদলে যাবে বলিউডে তাঁর জায়গা এমন প্রত্যাশা হয়ত ছিল তাপসী পান্নুর (Taapsee Pannu)। ২০২৩ সালে রাজকুমার হিরানি (Rajkumar Hirani) পরিচালিত ছবিতে শাহরুখ খানের (Shah Rukh Khan) বিপরীতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। ছবিটি ‘পাঠান’ (Pathaan) বা ‘জওয়ান’ (Jawan) -এর মতো বিপুল ব্যবসা না করলেও, তাপসীর কর্মজীবনে এখনও পর্যন্ত অন্যতম বড় বাণিজ্যিক সাফল্য হিসাবে জায়গা করে নিয়েছে ‘ডাঙ্কি’। কিন্তু সেই ছবির পরেও বলিউডের একাধিক বড় বাজেটের মূলধারার ছবিতে কেন তাঁকে দেখা গেল না? এ বার সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ইন্ডাস্ট্রির প্রচলিত সমীকরণ নিয়েই মুখ খুললেন অভিনেত্রী।

আরও পড়ুন : Aamir Khan Lalkara | ৬১-তে ২৫ বছরের যুবক আমির খান! ‘লালকারা’-র জন্য ফের বড় শারীরিক বদল
বিষয়ভিত্তিক ও অভিনয়নির্ভর ছবিতে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন তাপসী। ‘পিঙ্ক’ (Pink), ‘থাপ্পড়’ (Thappad), ‘রশ্মি রকেট’ (Rashmi Rocket), ‘মুল্ক’ (Mulk), ‘মনমর্জিয়াঁ’ (Manmarziyaan)-এর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে। অন্য দিকে, ‘ডাঙ্কি’ -এর মতো বড় তারকার ছবিতে কাজ করে বাণিজ্যিক ছবির দুনিয়াতেও নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার পরেও বড় মূলধারার ছবিতে নিয়মিত কাজের সুযোগ না পাওয়ার কারণ হিসাবে নিজের অভিনয় ক্ষমতার অভাবকে দায়ী করছেন না অভিনেত্রী। বরং তাঁর মতে, বাণিজ্যিক ছবিতে কোনও অভিনেত্রীকে নেওয়ার ক্ষেত্রে অভিনয় দক্ষতার পাশাপাশি আরও বেশ কিছু বিষয় বিবেচনা করা হয়। সাম্প্রতিক একটি সাক্ষাৎকারে তাপসী জানান, মূলধারার ছবিতে অভিনেতা-অভিনেত্রী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বাজারদর, জনপ্রিয়তা, পরিচিতি ও ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সম্পর্কের মতো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে মহিলা চরিত্রের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, অনেক বাণিজ্যিক ছবিতে নায়িকার চরিত্র এমন ভাবে লেখা হয় না, যেখানে নির্দিষ্ট কোনও অভিনেত্রীকে ছাড়া সেই চরিত্র কল্পনা করা যায়। ফলে সেখানে কে অভিনয় করছেন, তার চেয়ে অভিনেত্রীর বাজারমূল্য অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পায়।
তাপসীর কথায়, ‘আমার মনে হয়, প্রত্যেক অভিনেতাই বদলযোগ্য। এমন নয় যে, কোনও একটি চরিত্র নির্দিষ্ট একজন ছাড়া আর কেউ করতে পারবেন না। প্রত্যেকে নিজের মতো করে চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতে পারেন।’ অভিনেত্রীর এই বক্তব্যে তাঁর দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন রয়েছে। তাঁর মতে, একটি চরিত্রকে একাধিক অভিনেতা নিজেদের অভিনয়শৈলীতে ফুটিয়ে তুলতে পারেন। তাই শুধু অভিনয় প্রতিভার ভিত্তিতে বড় ছবিতে সুযোগ পাওয়ার রাস্তা সব সময় সহজ হয় না। বিশেষ করে বাণিজ্যিক ছবির ক্ষেত্রে নায়িকাদের নিয়ে এই প্রবণতা আরও বেশি বলে মনে করেন তাপসী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও কোনও ছবিতে মহিলা চরিত্রের গুরুত্ব এমন পর্যায়ে থাকে না যে, সেই চরিত্রে ঠিক কোন অভিনেত্রী অভিনয় করছেন, সেটিই ছবির অন্যতম প্রধান সিদ্ধান্ত হয়ে উঠবে। সেখানে প্রযোজকের কাছে অভিনেত্রীর জনপ্রিয়তা, দর্শকের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা এবং ছবির বাজারে তাঁর প্রভাব বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
নিজের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতা রয়েছে বলে মেনে নিয়েছেন তাপসী। অভিনেত্রীর মতে, ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি অভিনয়। কিন্তু বাজারদর বা ইন্ডাস্ট্রির অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের ক্ষেত্রে তিনি অন্য অনেকের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছেন। তাপসীর কথায়, ‘আমি যে জায়গায় এগিয়ে আছি, তা হল আমার অভিনয়ের প্রতিভা।’ অর্থাৎ নিজের অভিনয় দক্ষতা নিয়ে তাঁর আস্থা থাকলেও, বড় বাজেটের ছবিতে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু সেই যোগ্যতাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন অভিনেত্রী। ‘ডাঙ্কি’-তে সুযোগ পাওয়ার প্রসঙ্গে তাই পরিচালক রাজকুমার হিরানির সিদ্ধান্তের কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছেন তাপসী। তাঁর দাবি, হিরানি তাঁর আগের ছবিগুলির কাজ দেখেই তাঁকে ‘ডাঙ্কি’-র জন্য বেছে নিয়েছিলেন। অন্য কোনও হিসাবের পরিবর্তে পরিচালকের নিজের সিদ্ধান্তই সেখানে মুখ্য ছিল বলে জানিয়েছেন অভিনেত্রী। তাপসীর কথায়, ‘রাজু স্যার আমার ব্যাপারে নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।’ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বলিউডে এমন পরিচালক খুব বেশি নেই, যাঁরা কোনও অভিনেত্রীকে শুধুমাত্র তাঁর অভিনয়ের ভিত্তিতে একটি বড় ছবির জন্য বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। ‘ডাঙ্কি’-তে কাজের সুযোগ পাওয়াকে তাই নিজের অভিনয়জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসাবেই দেখছেন তাপসী।

তাপসীর বক্তব্যে উঠে এসেছে বলিউডের তারকা-নির্ভর ছবির আর্থিক সমীকরণও। তাঁর মতে, একটি ছবির বাজেট, অভিনেতা-অভিনেত্রীর পারিশ্রমিক ও তাঁদের বাজারমূল্য, এসবকিছুর মধ্যে একটা ভারসাম্য রাখতে হয়। কোনও অভিনেত্রী যদি প্রযোজকের হিসাব অনুযায়ী ছবির বাজেটের মধ্যে মানানসই হন এবং তাঁর নিজস্ব বাজার থাকে, তা হলে তাঁকে বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। শুধু অভিনয় দক্ষতা দিয়ে সেই জায়গা তৈরি করা কঠিন। অভিনেত্রীর বক্তব্য, কোনও পরিচালক যদি একটি চরিত্রের জন্য শুরু থেকেই নির্দিষ্ট কোনও অভিনেত্রীকে ভাবেন, তখন পরিস্থিতি আলাদা হয়। কিন্তু এমন ঘটনা খুব বেশি দেখা যায় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ছবির বাণিজ্যিক দিক, অভিনেত্রীর পরিচিতি এবং দর্শকের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতার মতো বিষয়গুলি বিবেচনায় আসে। ফলে অভিনয়ে দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও কোনও অভিনেত্রীর বড় বাজেটের ছবিতে নিয়মিত জায়গা পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে না।
তাপসীর নিজের কর্মজীবনও সেই দ্বৈত বাস্তবতার উদাহরণ। এক দিকে তিনি ধারাবাহিক ভাবে অভিনয়কেন্দ্রিক ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে কাজ করেছেন। অন্য দিকে, বড় তারকার সঙ্গে ‘ডাঙ্কি’-র মতো ছবিতে কাজ করার সুযোগও পেয়েছেন। কিন্তু একটি বড় বাণিজ্যিক ছবিতে সাফল্য পেলেই পর পর একই ধরনের ছবির দরজা খুলে যায়, এমন ধারণার সঙ্গে তিনি একমত নন। ‘ডাঙ্কি’-তে শাহরুখের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাপসীর কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলেও, তার পরে তাঁর ছবি নির্বাচনের ধারা পুরোপুরি বদলে যায়নি। বরং অভিনয়কে কেন্দ্র করে তৈরি ছবির প্রতিই তাঁর আগ্রহ বেশি থেকেছে। সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘গান্ধারী’ (Gandhari) ছবিতেও সেই প্রবণতা দেখা গিয়েছে। ছবিতে এক মায়ের লড়াইকে কেন্দ্র করে গল্প এগিয়েছে। মেয়েকে অপহরণ করার পরে তাকে ফিরে পাওয়ার জন্য মায়ের মরিয়া চেষ্টা, প্রতিশোধ এবং আত্মত্যাগের দিকটি ছবির কাহিনির মূল জায়গা দখল করেছে। তবে ‘গান্ধারী’ দর্শক এবং সমালোচকদের কাছ থেকে একরকম প্রতিক্রিয়া পায়নি। ছবিটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি নেতিবাচক মতও সামনে এসেছে। ফলে ‘ডাঙ্কি’-র পর তাপসীর বাণিজ্যিক ছবির যাত্রা যে প্রত্যাশামতো গতি পায়নি, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

তাপসীর বক্তব্য অবশ্য শুধু নিজের সুযোগ না পাওয়ার আক্ষেপে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর কথায় বলিউডের ছবিতে মহিলা অভিনেত্রীদের জায়গা এবং তাঁদের গুরুত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠে এসেছে। একটি বড় বাজেটের ছবিতে পুরুষ তারকার চরিত্রকে কেন্দ্র করে যখন গোটা বিপণন পরিকল্পনা তৈরি হয়, তখন মহিলা চরিত্রের ক্ষেত্রে অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত বাজারমূল্যকে কী ভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে আসে। অভিনেত্রীর মতে, তাঁর নিজের সবচেয়ে বড় সম্পদ অভিনয় করার ক্ষমতা। সেই জায়গাতেই তিনি ভরসা রাখেন। বড় ছবির ক্ষেত্রে বাজারদর বা পরিচিতির সমীকরণ তাঁর পক্ষে সব সময় অনুকূল না হলেও, নিজের কাজের মাধ্যমে জায়গা তৈরি করার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন বলেই তাঁর বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত মিলেছে।
‘ডাঙ্কি’-র মতো বড় ছবিতে শাহরুখ খানের বিপরীতে কাজ করার পরে তাপসীর হাতে কেন একের পর এক বড় বাজেটের মূলধারার ছবি আসেনি, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অভিনেত্রী কার্যত বলিউডের প্রচলিত কাস্টিং ব্যবস্থার দিকেই আঙুল তুলেছেন। তাঁর মতে, প্রতিভা থাকলেই সব দরজা খুলে যায় না। বাজার, পরিচিতি এবং ইন্ডাস্ট্রির সমীকরণও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। আর সেই কারণেই ‘ডাঙ্কি’-র মতো বড় সাফল্যের পরেও তাঁর কর্মজীবনে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি, এমনটাই মনে করছেন তাপসী পান্নু।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Taapsee Pannu Belly Fat Statement | ফ্ল্যাট স্টমাক নয়, তলপেটের চর্বিই স্বাভাবিক, তাপসী পান্নুর বার্তা ভাইরাল




