প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : এই সময়ে দাঁড়িয়ে সৌন্দর্যের সংজ্ঞা যেন আগের থেকে অনেক বেশি স্পষ্ট, আবার একই সঙ্গে অনেক বেশি কঠোর। মুখের কোথায় ভাঁজ পড়বে, ঠোঁট কতটা মোটা হবে, নাকের বাঁক কতখানি, ভ্রু কতটা ধারাল, এসব কিছুর যেন ‘নির্দিষ্ট নকশা’ তৈরি হয়ে গিয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির হাত ধরে সেই নকশা বাস্তবায়ন করাও এখন খুব একটা কঠিন নয়। টাকা থাকলেই সম্ভব। আর সেই সুযোগের নাম, বোটক্স। বলিউড থেকে টলিউড, ছোট পর্দা থেকে সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার, এই ট্রিটমেন্ট আর গোপন কোনও বিষয় নয়। অনেকের কাছেই তা সৌন্দর্যচর্চার স্বাভাবিক অঙ্গ হয়ে উঠেছে। ঠিক এই প্রবণতার মাঝেই একেবারে আলাদা সুরে কথা বললেন অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক (Koel Mallick)।

বোটক্স আসলে কী? মুখের পেশিতে বোটুলিনাম টক্সিন নামে এক ধরনের নিউরোটক্সিক প্রোটিন প্রয়োগ করা হয়, যার ফলে পেশি ও স্নায়ুর মধ্যে যোগাযোগ সাময়িক ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এর ফলেই মুখের পেশির স্বাভাবিক সঞ্চালন কমে আসে, ত্বক টানটান দেখায়, বলিরেখা বা ভাঁজ কমে যায়। বিজ্ঞান বলছে, এটি সাময়িক। কিন্তু সমাজ বলছে, এটাই যেন যৌবনের চাবিকাঠি। তাই পোশাক বদলানোর মতো করেই আজ অনেকেই চেহারা বদলে নিচ্ছেন ঠোঁট, নাক, থুতনি, চোয়াল, এমনকী চোখের চারপাশও।

তবে, এই প্রবণতা আর শুধু তারকাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পার্লার, ক্লিনিক, শপিং মল, সর্বত্র ত্বকের নানা ট্রিটমেন্টের বিজ্ঞাপন। যৌবনের চৌকাঠ পেরিয়ে নিজের মুখে সময়ের ছাপ পড়ছে, এই বাস্তবতা মেনে নিতে না পেরে অনেকেই কৃত্রিম পথে হাঁটছেন।
আবার অভিনেত্রীদের ক্ষেত্রে বাড়তি চাপ। ক্যামেরার সামনে ‘নিখুঁত’ দেখাতে হবে, এই প্রত্যাশা তাঁদের আরও বেশি করে ঠেলে দিচ্ছে ছুরি-কাঁচি কিংবা ইনজেকশনের দিকে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, কোনও অভিনেত্রী যদি বোটক্স না করান, তা হলে অনেক সময়েই সেই কথা বিশ্বাস করা হয় না।

বলিউডে অনুষ্কা শর্মা (Anushka Sharma), প্রিয়াঙ্কা চোপড়া (Priyanka Chopra), মৌনী রায় (Mouni Roy) -এর মতো তারকারা চেহারায় পরিবর্তনের কথা প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন। আবার অনেকে গুজব বলে উড়িয়েও দিয়েছেন। টলিউডেও এই চর্চা অজানা নয়। তবে খুব কম মানুষই তা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেন। ঠিক এই জায়গাতেই ব্যতিক্রম কোয়েল মল্লিক। সম্প্রতি একটি বিশেষ সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কোয়েল স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিনি কখনও বোটক্স করাননি এবং কৃত্রিম উপায়ে নিজের মুখমণ্ডল বদলানোর চেষ্টাও করেননি। তাঁর মতে, সৌন্দর্যের যে মাপকাঠি তৈরি হয়েছে, সেটির সঙ্গে তিনি একেবারেই সহমত নন। কোয়েলের কথায়, ‘ছোট ছোট খুঁত নিয়েই তো মানুষ সুন্দর হয়। প্রতিটি মানুষ নিজের মতো করে সুন্দর। গায়ের রং, চোখ, নাক, ঠোঁট, থুতনি সমস্ত কিছু নির্দিষ্ট রকমের হলেই যে সৌন্দর্য, এই ধারণাটাকেই আমি ঠিক বলে মনে করি না।’

উল্লেখ্য যে, ‘নিখুঁত’ শব্দটির সংজ্ঞাই যেখানে স্পষ্ট নয়, সেখানে নিখুঁত হওয়ার দৌড়ে ছুটে চলার কোনও মানে খুঁজে পান না এই অভিনেত্রী। তবে যাঁরা বোটক্স করাতে চান বা করিয়েছেন, তাঁদের সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনও মন্তব্য করতেও নারাজ তিনি।
কোয়েলের মতে, নিজের শরীর ও মুখ নিয়ে কী করবেন, সেটা একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়। ‘আমি কাউকে বিচার করতে চাই না,’ এমনই তাঁর অবস্থান।

সৌন্দর্যচর্চার এই নতুন যুগে শুধু বোটক্সই নয়, নেল আর্ট বা কৃত্রিম নখ বসানোর প্রবণতাও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে। রাস্তার ধারের স্টল থেকে শুরু করে নামী পার্লার, সর্বত্রই এখন রঙিন, চকচকে, নিখুঁত নখের ছড়াছড়ি। কিন্তু সেই ট্রেন্ডেও নিজেকে ভাসাননি কোয়েল। মা হওয়ার পর সন্তানদের কথা ভেবে কৃত্রিম নখ ব্যবহার করতে তিনি নারাজ। যদিও এক সময় নখ সাজানোর শখ ছিল তাঁর। তখন নেল আর্ট করিয়েছেন বহুবার। তবে ইদানীং নখ নিয়ে যে ধরনের অতিরিক্ত পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে, তা থেকে নিজেকে দূরেই রেখেছেন অভিনেত্রী।

আসলে কোয়েল মল্লিকের এই অবস্থান বর্তমান দিনে দাঁড়িয়ে অনেক বড় প্রশ্ন তুলে দেয়। সৌন্দর্য কী সত্যিই এক রকম দেখতে হওয়ার নাম? নাকি নিজের স্বাভাবিক সত্তাকে গ্রহণ করাই আসল সৌন্দর্য? বোটক্সের যুগে দাঁড়িয়ে যেখানে ‘যৌবন ধরে রাখা’ যেন এক সামাজিক বাধ্যবাধকতা, সেখানে কোয়েলের মতো তারকারা অন্য পথে হাঁটার সাহস দেখাচ্ছেন। সেই সাহসই হয়তো নতুন প্রজন্মকে ভাবতে শেখাবে, চেহারা বদলানো সহজ, কিন্তু নিজেকে গ্রহণ করা আরও জরুরি।
সব ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Koel Mallick Gives Of A Baby Girl : কন্যাসন্তানের জন্ম দিলেন কোয়েল মল্লিক




