সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ রাজকোট : গুজরাতের (Gujarat) রাজকোট (Rajkot) জেলায় টানা ভূমিকম্পে উদ্বেগ ছড়াল। একবার বা দু’বার নয়, মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে ন’বার কেঁপে উঠেছে এই অঞ্চল। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত অল্প সময়ের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া এই ধারাবাহিক কম্পনে আতঙ্কিত হয়ে বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। কোথাও কোথাও সতর্কতামূলক ভাবে বাড়ি খালি করানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। প্রশাসন ও বিজ্ঞানীদের বক্তব্যে আশ্বাস থাকলেও, একই দিনে বারবার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, আসলে কী ঘটছে রাজকোটের মাটির নিচে?
স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে উল্লেখ, প্রথম কম্পনটি অনুভূত হয় বৃহস্পতিবার রাত ৮টা ৪৩ মিনিট নাগাদ। তার পর থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা ৩৪ মিনিট পর্যন্ত আরও সাত বার কম্পন রেকর্ড করা হয়েছে। অর্থাৎ মোট ন’বার কেঁপেছে মাটি। প্রতিটি কম্পনই মৃদু প্রকৃতির হলেও, ধারাবাহিকতার কারণেই আতঙ্ক বেড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। অনেক বাসিন্দা রাতভর ঘুমোতে পারেননি বলে জানিয়েছেন। তাঁদের কথায়, ‘এক বার হলে মানা যায়, কিন্তু বারবার কাঁপলে মনে ভয় ধরেই যায়।’ ভূমিকম্পগুলির উৎসস্থল ছিল উপলেটার (Upleta) উত্তর-পশ্চিমে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে। উপলেটা মূলত কচ্ছ (Kutch) অঞ্চলের অন্তর্গত, যা ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবেই পরিচিত। ইতিহাস বলছে, কচ্ছ অঞ্চলে অতীতেও একাধিক বড় মাপের ভূমিকম্প হয়েছে। সেই স্মৃতি এখনও অনেকের মনে তাজা। ফলে উৎসস্থল কচ্ছের কাছাকাছি হওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে রাজকোটবাসীর মধ্যে।
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, ন’টি কম্পনের মধ্যে সর্বোচ্চ কম্পনের মাত্রা ছিল ৩.৮ এবং সর্বনিম্ন ছিল ২.৯। ভূমিকম্পের মাত্রা যদি ৩ থেকে ৩.৯-এর মধ্যে থাকে, তা হলে সেটিকে মৃদু কম্পন হিসেবে ধরা হয়। আর ৩-এর নিচে হলে সেটি অতি মৃদু। অর্থাৎ এই কম্পনগুলির কোনওটিই বড়সড় ক্ষতির পর্যায়ে পড়ে না। অল্প সময়ের মধ্যে এত বার কম্পন সচরাচর অনুভূত হয় না। আতঙ্ক জনজীবনে। গান্ধীনগরের (Gandhinagar) ইনস্টিটিউট অফ সিসমোলজিক্যাল রিসার্চ (Institute of Seismological Research) -এর বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তাঁদের বক্তব্য, ‘ভূমিকম্পের মাত্রা যদি ৪-এর নিচে থাকে, তা হলে সাধারণত বড় কোনও ক্ষতির আশঙ্কা থাকে না।’ তবে একই সঙ্গে তাঁরা এটাও স্বীকার করেছেন যে, এত কম সময়ের ব্যবধানে ন’বার কম্পন হওয়াটা নজরে রাখার মতো বিষয়। একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘রাজকোট সরাসরি কোনও প্রধান চ্যুতিরেখার উপর পড়ে না। তা হলে কেন এই ধারাবাহিক কম্পন, সেটি খতিয়ে দেখা জরুরি।’
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বর্ষার মরসুমের পরে এই ধরনের মৃদু ভূমিকম্প হওয়া একেবারে অস্বাভাবিক নয়। মাটির নীচে জলস্তরের পরিবর্তন, চাপের হেরফের, এসব কারণেও মৃদু কম্পন হতে পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কম্পনের সংখ্যা। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, ‘একটি বা দু’টি মৃদু কম্পন হলে বিষয়টি তেমন ভাবনার নয়। কিন্তু একই এলাকায় বারবার কম্পন হলে তার পেছনের ভূ-তাত্ত্বিক কারণ বিশ্লেষণ করা দরকার।’ উল্লেখ্য, এই পরিস্থিতিতে রাজ্য প্রশাসন সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে সতর্কবার্তা জারি করেছে। অযথা আতঙ্কিত না হতে বলা হয়েছে, পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে কী করণীয় সে সম্পর্কেও নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে। এক প্রশাসনিক কর্তা জানান, ‘আমরা পরিস্থিতির উপর নজর রাখছি। কোনও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর নেই। তবুও মানুষকে সচেতন থাকতে বলা হচ্ছে।’
আরও পড়ুন : Koel Mallick : বাংলা সিনেমার রাজকন্যা কোয়েল মল্লিক
রাজকোট শহরের বিভিন্ন এলাকায় শুক্রবার সকাল পর্যন্ত আতঙ্কের ছবি দেখা গিয়েছে। অনেক পরিবার রাতেই বাড়ির বাইরে খোলা জায়গায় আশ্রয় নেন। কেউ কেউ আবার আত্মীয়ের বাড়িতে চলে যান। এক বাসিন্দা বলেন, ‘মাঝরাতে হঠাৎ বিছানা কেঁপে উঠল। বাচ্চাদের নিয়ে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। এমন অভিজ্ঞতা আগে কখনও হয়নি।’
গুজরাতের ভূমিকম্প ইতিহাসে কচ্ছ অঞ্চলের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০০১ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প এখনও রাজ্যের মানুষের স্মৃতিতে দগদগে ক্ষত হয়ে রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার কারণেই ছোট কম্পন হলেও মানুষ ভয় পান। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মানসিক আতঙ্কও স্বাভাবিক। তবে, রাজকোটে ১২ ঘণ্টায় ন’বার ভূমিকম্প কোনও তাৎক্ষণিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত না দিলেও, বিষয়টি যে হালকা ভাবে নেওয়ার নয়, তা স্পষ্ট। বিজ্ঞানীরা আরও তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের উপর জোর দিচ্ছেন। প্রশাসনও প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে। এখন সকলের নজর একটাই প্রশ্নে, এই মৃদু কম্পন কি এখানেই থামবে, না কি ভবিষ্যতে আরও বড় কোনও ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দিচ্ছে?
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Gujarat dairy sector development, Amul cooperative success | গুজরাটের দুগ্ধ বিপ্লব: প্রতিটি ফোঁটা দুধে বদলাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি, সমৃদ্ধির পথে পশুপালক সমাজ




