তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ তিরুবন্তপুরম : কেরালা অ্যাসেম্বলি আন্তর্জাতিক বইমেলা (Kerala Assembly International Book Festival) -এর মঞ্চ থেকে সাহিত্যের গভীর তাৎপর্য নিয়ে আবেগঘন বক্তব্য রাখলেন বুকার পুরস্কারজয়ী লেখক বানু মুস্তাক (Banu Mushtaq)। পাঠক, লেখক ও প্রকাশকদের উপস্থিতিতে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, বই শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বই মানুষের শোনার ক্ষমতা বাড়ায়, গভীরভাবে ভাবতে শেখায় এবং নিজের জীবনবৃত্তের বাইরে থাকা মানুষের অভিজ্ঞতাকে বুঝতে সাহায্য করে। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও চিন্তার স্বাধীনতার প্রশ্ন, যা সমকালীন সমাজে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। কেরালার সাহিত্য ও পাঠসংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী এই আন্তর্জাতিক বইমেলায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে বানু মুস্তাক বলেন, ‘একটি ভাল বই আমাদের কেবল কথা বলতে শেখায় না, পাশাপাশি মন দিয়ে শুনতেও শেখায়।’ তাঁর মতে, শোনা মানে শুধু শব্দ গ্রহণ করা নয়, শোনা মানে অন্যের জীবনের ভেতরে প্রবেশ করা, তাদের আনন্দ-বেদনা অনুভব করা এবং নিজের পূর্বধারণাকে প্রশ্ন করার সাহস অর্জন করা। এই কারণেই বই পড়ার অভ্যাস মানুষকে আরও সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। বুকার পুরস্কার (Booker Prize) প্রাপ্তির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বানু মুস্তাক জানান, এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়েও বড় করে দেখিয়েছে বহুভাষিক সাহিত্য ও প্রান্তিক কণ্ঠস্বরের গুরুত্ব। তিনি বলেন, ‘সাহিত্য তখনই সত্যিকারের শক্তি হয়ে ওঠে, যখন তা নিঃশব্দ মানুষের কথাও তুলে ধরে।’ তাঁর লেখালেখির কেন্দ্রবিন্দুতে বরাবরই সাধারণ মানুষের জীবন, বিশেষত নারীর অভিজ্ঞতা, সামাজিক বৈষম্য ও নৈতিক দ্বন্দ্ব। বইমেলার মঞ্চে সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বই আমাদের শেখায় কীভাবে ভিন্ন বাস্তবতাকে সম্মান করতে হয়।
কেরালা অ্যাসেম্বলি আন্তর্জাতিক বইমেলা প্রসঙ্গে বক্তৃতায় বানু মুস্তাক প্রশংসা করেন এই উদ্যোগের। তাঁর মতে, এমন বইমেলা কেবল বই কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক কথোপকথনের ক্ষেত্র। তিনি বলেন, ‘যেখানে মানুষ বইয়ের মাধ্যমে একে-অপরের সঙ্গে কথা বলে, সেখানে বিভাজন কমে আসে।’ পাঠসংস্কৃতি বজায় রাখতে এই ধরনের আয়োজন যে কতটা জরুরি, তা তিনি বারবার উল্লেখ করেন। ডিজিটাল যুগে যখন দ্রুত তথ্যের স্রোত মানুষকে গভীর মনোযোগ থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে, তখন বইই পারে মননশীলতার জায়গা তৈরি করতে। বক্তব্যে তিনি তরুণ প্রজন্মের দিকেও দৃষ্টিপাত করেন। বানু মুস্তাক বলেন, আজকের তরুণরা নানা মাধ্যমে প্রচুর তথ্য পাচ্ছে, কিন্তু তথ্য আর জ্ঞান এক নয়। বই পড়ার মধ্য দিয়ে যে গভীর উপলব্ধি তৈরি হয়, তা অন্য কোনও মাধ্যমে সম্ভব নয়। তাঁর কথায়, ‘বই আমাদের ধীরে ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং নিজের সঙ্গে তর্ক করতে শেখায়।’ এই অভ্যাসই গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি মজবুত করে।
সাহিত্যের সামাজিক ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, লেখক কখনও সমাজের ওপরে দাঁড়িয়ে কথা বলেন না, তাঁরা সমাজের ভেতর থেকেই সত্য অনুসন্ধান করেন। বানু মুস্তাকের মতে, পাঠক ও লেখকের সম্পর্ক একমুখী নয়; পাঠকও লেখাকে নতুন অর্থ দেয়। এই পারস্পরিক বিনিময়ের মধ্য দিয়েই সাহিত্য বেঁচে থাকে। কেরালা অ্যাসেম্বলি আন্তর্জাতিক বইমেলার মতো মঞ্চ সেই বিনিময়কে আরও সমৃদ্ধ করে। প্রসঙ্গত, বইমেলায় উপস্থিত বিভিন্ন ভাষার লেখক ও পাঠকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ভাষার ভিন্নতা কখনও ভাবনার সীমা হতে পারে না। অনুবাদ ও বহুভাষিক সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে এক ভাষার অভিজ্ঞতা অন্য ভাষার মানুষের কাছেও পৌঁছে যায়। বুকার পুরস্কার প্রাপ্তির পর তাঁর রচনাগুলি যে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছেছে, সেটিকে তিনি এই বহুভাষিক সংযোগের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বানু মুস্তাক আরও বলেন, যতদিন মানুষ বইয়ের দিকে ফিরবে, ততদিন সমাজে সহমর্মিতা ও কথা বলার জায়গা থাকবে। বই আমাদের শুধু গল্প শোনায় না, আমাদের মানুষ করে তোলে। কেরালা অ্যাসেম্বলি আন্তর্জাতিক বইমেলার মঞ্চ থেকে উচ্চারিত এই বার্তা নিঃসন্দেহে সমগ্র সাহিত্যপ্রেমী সমাজের জন্য শক্তিশালী অনুপ্রেরণা হয়ে রইল।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Narges Mohammadi Iran Arrest | নোবেলজয়ীর কণ্ঠ রুখতেই কি ফের হাতকড়া? ইরানে গ্রেপ্তার মানবাধিকারকর্মী নার্গিস মোহাম্মদি, বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দা




