স্টকহোম, ৯ অক্টোবর ২০২৫: বিশ্বসাহিত্যের সর্বোচ্চ সম্মান নোবেল পুরস্কার (Nobel Prize in Literature 2025) এবছর পেলেন হাঙ্গেরির ঔপন্যাসিক ও চিত্রনাট্যকার লাসজলো ক্রাজনাহোরকাই (Laszlo Krasznahorkai)। বৃহস্পতিবার সুইডেনের রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস (Royal Swedish Academy of Sciences) ঘোষণা করে জানায়, ৭১ বছর বয়সী এই লেখককে দেওয়া হচ্ছে ২০২৫ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার তাঁর “মনোমুগ্ধকর এবং দূরদর্শী সাহিত্যিক কর্মের” জন্য, যা “বিশ্বের অন্ধকারতম সময়েও শিল্পের অদম্য শক্তিকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করে।”

এটি হাঙ্গেরির ইতিহাসে দ্বিতীয় সাহিত্য নোবেল। এর আগে ২০০২ সালে হাঙ্গেরিয়ান লেখিকা ইমরে কের্তেস (Imre Kertész) এই পুরস্কার পান।
দক্ষিণ-পূর্ব হাঙ্গেরির ছোট শহর গিউলাতে (Gyula) জন্মগ্রহণ করেন লাসজলো ক্রাজনাহোরকাই। ১৯৭০-এর দশকে কমিউনিস্ট শাসনের সময়ে বড় হওয়া ক্রাজনাহোরকাইয়ের সাহিত্যজীবন শুরু হয় এক গভীর সামাজিক এবং অস্তিত্ববাদী বাস্তবতার অভিজ্ঞতা থেকে। তিনি বলেন, “আমার লেখার উৎস হল মানব অস্তিত্বের সীমান্তে দাঁড়িয়ে দেখা, যেখানে আলো আর অন্ধকার, আশা আর পাগলামি এক হয়ে যায়।” ১৯৮৭ সালে তিনি ফেলোশিপ পেয়ে পশ্চিম বার্লিনে (West Berlin) যান। সেই প্রথম বিদেশ সফর তাঁর লেখার দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে দেয়। ইউরোপ, এশিয়া ও আমেরিকার বহু দেশে ঘুরে বেড়ানো এই লেখক তাঁর প্রতিটি উপন্যাসে ‘অস্তিত্বের ভাঙন’ ও ‘সময়ের অন্তহীনতা’ নিয়ে অনন্য সাহিত্যিক জগত তৈরি করেছেন।
লাসজলো ক্রাজনাহোরকাই-এর : বাস্তবতার পাগলামির এক দীর্ঘ যাত্রা
লাসজলো ক্রাজনাহোরকাইয়ের লেখাকে প্রায়ই তুলনা করা হয় দস্তয়েভস্কি ও কাফকার (Dostoevsky and Kafka) সঙ্গে। তবে তাঁর লেখার ভাষা এবং গঠন এতটাই অনন্য যে তা একেবারে নিজের মতো। দীর্ঘ বাক্য, প্রায় নিঃশ্বাসহীন বর্ণনা, আর একটানা চিন্তার স্রোত, এই হচ্ছে তাঁর গদ্যের বৈশিষ্ট্য। তাঁর নিজস্ব ভাষায়, “আমার সাহিত্য বাস্তবতাকে পাগলামির পর্যায়ে পরীক্ষা করে।” তাঁর অনুবাদক ও খ্যাতনামা কবি জর্জ সির্তেস (George Szirtes) বলেন, “ক্রাজনাহোরকাই এমন একজন লেখক যিনি পাঠককে হিপনোটাইজ করেন। তাঁর নির্মিত জগৎ আপনার ভেতরে ঢুকে যায়, এবং একসময় তা আপনার নিজের ভেতরের বিশৃঙ্খলার প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে।”
Stantango থেকে বিশ্বজয়
ক্রাজনাহোরকাইয়ের প্রথম উপন্যাস “Satantango” (স্যাটানট্যাংগো) ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় এবং সঙ্গে সঙ্গেই ইউরোপীয় সাহিত্যে আলোড়ন তোলে। পরবর্তীতে এই উপন্যাসটি হাঙ্গেরীয় চলচ্চিত্র পরিচালক বেলা তার (Bela Tarr) সিনেমা হিসেবে রূপ দেন, যা চলচ্চিত্র ইতিহাসে ‘মাস্টারপিস’ হিসেবে স্থান পায়। এরপর আসে তাঁর আরেক বিখ্যাত কাজ “The Melancholy of Resistance” (দ্য মেলানকোলি অফ রেজিস্ট্যান্স) যা সমাজব্যবস্থার ভাঙন, ক্ষমতা ও মানব দুর্বলতার এক দার্শনিক প্রতিচ্ছবি। এই উপন্যাসটিও পরে চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়, নাম ছিল Werckmeister Harmonies। তাঁর অন্যান্য বিখ্যাত কাজের মধ্যে রয়েছে “War and War”, “Seiobo There Below”, “The World Goes On”, এবং “Baron Wenckheim’s Homecoming” যেগুলি তাঁকে ইউরোপীয় আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কণ্ঠে পরিণত করেছে।
সুইডিশ অ্যাকাডেমির স্থায়ী সম্পাদক অ্যান্ডার্স ওলসন (Anders Olsson) এক বিবৃতিতে বলেন, “লাসজলো ক্রাজনাহোরকাই আমাদের শেখান যে, সাহিত্য কেবল গল্প বলার শিল্প নয়, এটি এক আত্মিক সাধনা। তাঁর কাজগুলো একাধারে ভীতিকর, মগ্নকর এবং আশাব্যঞ্জক।” অ্যাকাডেমি আরও উল্লেখ করেছে যে ক্রাজনাহোরকাইয়ের রচনাশৈলী “মানবজীবনের বিশৃঙ্খলার মাঝেও সৌন্দর্যের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার এক অবিরাম প্রচেষ্টা।”
সাহিত্যের সীমানা ছাড়িয়ে এক অন্য জগৎ
ক্রাজনাহোরকাই শুধুমাত্র সাহিত্যিক নন, তিনি দার্শনিক ভাবনাতেও গভীরভাবে প্রভাবিত। তাঁর লেখায় বারবার উঠে আসে ধর্ম, ইতিহাস ও রাজনীতির সংঘাত। অনেক সাহিত্য সমালোচকের মতে, তিনি “একবিংশ শতাব্দীর ইউরোপের বিবেক।”

হাঙ্গেরির প্রখ্যাত সাহিত্য সমালোচক ইস্তভান বোলোগ (István Balogh) বলেন, “ক্রাজনাহোরকাই আমাদের এমন এক জগতে নিয়ে যান যেখানে মানুষ নিজের ভেতরেই হারিয়ে যায়। তাঁর লেখা আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়, আমরা আসলে কে?”
বিশ্বসাহিত্যের মঞ্চে লাসজলো ক্রাজনাহোরকাই -এর অবদান
ক্রাজনাহোরকাইয়ের বই বর্তমানে ৩০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। জার্মানিতে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়, কারণ তাঁর বহু কাজ প্রথম জার্মান অনুবাদেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছিল। তিনি ২০১৫ সালে ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার (Man Booker International Prize) পান তাঁর সারাজীবনের সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ। সেই সময় বিচারকরা তাঁকে “গদ্যের মিস্টিক মাস্টার” বলে আখ্যা দেন।
নোবেল পুরস্কারের মূল্য ও অর্থ
এবারের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের আর্থিক মূল্য ১.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১০ কোটি টাকা)।
এই সম্মান পাওয়ার পর ক্রাজনাহোরকাই যোগ দিলেন এক গৌরবময় তালিকায়—যেখানে আছেন টনি মরিসন (Toni Morrison), আর্নেস্ট হেমিংওয়ে (Ernest Hemingway), কাজুও ইশিগুরো (Kazuo Ishiguro) এবং অরহান পামুক (Orhan Pamuk)– প্রমুখ এর মতো কিংবদন্তী সাহিত্যিক। উল্লেখ্য, গত বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালের সাহিত্যে নোবেল পান দক্ষিণ কোরিয়ার লেখিকা হান কাং (Han Kang)। তাঁকে সম্মান জানানো হয় “মানব জীবনের ভঙ্গুরতা ও ইতিহাসের ট্র্যাজেডি নিয়ে গভীর কাব্যিক গদ্যের জন্য।” এবছর ক্রাজনাহোরকাইয়ের পুরস্কার প্রমাণ করে, সাহিত্যের শক্তি এখনও সীমান্ত ও ভাষার ঊর্ধ্বে।
ক্রাজনাহোরকাই একবার বলেছিলেন, “আমি কখনও পাঠককে আরাম দিতে চাই না। আমি চাই তারা আমার লেখার মধ্যে হারিয়ে যাক, তারপর নিজেরাই সেই গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসুক।” তাঁর গদ্য কঠিন, ঘন এবং প্রায়ই মনস্তাত্ত্বিক চাপে পূর্ণ। তবু তাঁর পাঠকসংখ্যা ক্রমে বেড়েই চলেছে, কারণ তাঁর লেখায় পাঠক খুঁজে পান এক গভীর মানবিক সত্য, জীবন যতই অনিশ্চিত হোক, শিল্পই আমাদের একমাত্র নোঙর। অন্যদিকে, পুরস্কার ঘোষণার পর ইউরোপের বিভিন্ন সাহিত্য সংস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অভিনন্দন বার্তা আসতে শুরু করে। ফ্রান্সের সাহিত্যিক প্যাট্রিক মদিয়ানো (Patrick Modiano) বলেন, “লাসজলো ক্রাজনাহোরকাই এমন এক লেখক যিনি সময়ের বিরুদ্ধে লিখছেন, তাঁর গদ্য আমাদের শেখায়, ধৈর্য মানেই সাহিত্যের আত্মা।”এদিকে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান (Viktor Orban) টুইট করে লেখেন, “ক্রাজনাহোরকাই আমাদের জাতির সাংস্কৃতিক শক্তির প্রতীক। তাঁর এই সম্মান পুরো হাঙ্গেরির জন্য গর্বের।” আবার নোবেল ঘোষণার পরই হাঙ্গেরি ও জার্মানির বইয়ের দোকানে ক্রাজনাহোরকাইয়ের উপন্যাস বিক্রিতে রেকর্ড বৃদ্ধি দেখা যায়। প্রকাশক Magvető Press জানায়, “মাত্র ২৪ ঘণ্টায় আমাদের অনলাইন বিক্রি ৭০০% বেড়েছে। পাঠকরা তাঁর পুরনো বই পুনরায় খুঁজে নিচ্ছেন।” অনেক সাহিত্যবোদ্ধার মতে, ক্রাজনাহোরকাইয়ের পুরস্কার পাওয়া কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি আধুনিক ইউরোপীয় সাহিত্যেরও জয়। কারণ তাঁর লেখায় প্রতিফলিত হয় রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যক্তিগত বেদনা ও মানবতার অন্তহীন অনুসন্ধান।
ছবি: সংগৃহীত



