তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : আমরা সবাই জানি, মন ভাল থাকলে মানুষ হাসে। কিন্তু কখনও ভেবে দেখেছেন, হাসলে কি মন ভাল হতে পারে? এই প্রশ্নই এখন মনোবিজ্ঞানের এক আশ্চর্য তত্ত্বের কেন্দ্রে, ‘ফেসিয়াল ফিডব্যাক হাইপোথিসিস’ (Facial Feedback Hypothesis)। শতাব্দীরও বেশি সময় আগে চার্লস ডারউইন (Charles Darwin) প্রথম বলেছিলেন, মুখের অভিব্যক্তি শুধু মনের প্রকাশ নয়, মনের অবস্থাকেও প্রভাবিত করে। অর্থাৎ, মুখে যদি হাসি থাকে, মস্তিষ্ক সেই হাসিকেই সত্যি ধরে নেয়, ফলে শরীরে এমন হরমোন নিঃসৃত হয়, যা আনন্দের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।

তত্ত্বটির মূল ভাবনা একেবারেই সহজ: মুখের পেশিগুলি যখন হাসি, বিস্ময় বা রাগের মতো অভিব্যক্তি তৈরি করে, তখন মস্তিষ্কে তার বার্তা যায়। ব্রেন সেটাকে আবেগ হিসেবে ব্যাখ্যা করে এবং তার ভিত্তিতেই রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া ঘটে। ফলে মস্তিষ্ক ধরে নেয়, আপনি খুশি বা উত্তেজিত বা দুঃখিত। মনোবিদ অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, ‘থেরাপি হিসেবে এই পদ্ধতি খুব বেশি ব্যবহৃত না হলেও, এটা মনোবিজ্ঞানে বিশেষ গুরুত্ব রাখে। অনেক সময় বিষণ্ণতার (Depression) সময়ে রোগীদের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাসার অনুশীলন করানো হয়। জোর করেই হাসলেও দেখা যায়, কয়েক মিনিটের মধ্যে মস্তিষ্কে সেরোটোনিন (Serotonin) ও ডোপামাইন (Dopamine) -এর মাত্রা বাড়ে, মন হালকা লাগে। এখান থেকেই লাফিং ক্লাব (Laughing Club) -এর ধারণা এসেছে।’
এই তত্ত্বের শিকড় ডারউইনের পর্যবেক্ষণেই নিহিত ছিল। পরে মনোবিজ্ঞানী সিলভান এস. টমকিন্স (Silvan S. Tomkins) এবং ক্যারল ইজার্ড (Carroll Izard) এই ধারণাকে আরও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁরা বলেন, শরীরের প্রতিক্রিয়া যেমন মুখের পেশির নড়াচড়া, চোখের কোণে টান, ঠোঁটের বাঁক, এসবই মনের ভেতরের বার্তা তৈরি করে। এই ধারনাটি জেমস-ল্যাঞ্জ (James-Lange) তত্ত্বের সঙ্গেও সম্পর্কিত, যেখানে বলা হয়েছিল, ‘আমরা দুঃখিত বলেই কাঁদি না, বরং কাঁদি বলেই দুঃখিত হই।’ আধুনিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মুখভঙ্গি সত্যিই আবেগকে প্রভাবিত করে। যদিও বিজ্ঞানীরা একমত নন যে এটি একমাত্র কারণ। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, মুখের অভিব্যক্তি সরাসরি আবেগ সৃষ্টি না করলেও তা আবেগের তীব্রতা বাড়াতে বা কমাতে সক্ষম। যেমন, কেউ রাগে মুখ শক্ত করলে রক্তচাপ বাড়ে, আবার হাসলে স্নায়ু শান্ত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, মুখের অভিব্যক্তি থেকে বার্তা যায় মস্তিষ্কের ‘ব্রেনস্টেম’ (Brainstem) -এ, যা আবেগ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখান থেকেই শরীরে নিঃসৃত হয় এন্ডোরফিন (Endorphin) ও সেরোটোনিন- এই দুই রাসায়নিকই মানসিক চাপ কমায়, মনোভাব হালকা করে, এমনকী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ায়।অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায় আরও বলছেন, ‘এই পদ্ধতি একা যথেষ্ট নয়। কিন্তু এটি একটি পরিপূরক উপায়, যা মানসিক স্বাস্থ্যচর্চায় সাহায্য করে। যেমন, ধ্যান বা যোগের মতোই হাসি বা প্রশান্ত মুখভঙ্গি মস্তিষ্কে ইতিবাচক সংকেত পাঠায়। আপনি যদি গভীর শ্বাস নিয়ে হালকা হাসি রাখেন, তা স্নায়ু শান্ত করে, উদ্বেগ কমায়।’
মনোবিজ্ঞানীরা তাই বলেন, মুখের ভঙ্গির সঙ্গে শরীরের ভঙ্গিও মনের উপর প্রভাব ফেলে। যেমন সোজা হয়ে দাঁড়ালে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। মাথা নত করে থাকলে মস্তিষ্ক তা দুঃখ বা ব্যর্থতার সঙ্গে সংযুক্ত করে। হাসি, আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি, গভীর শ্বাস—সবই মনের ওপর সূক্ষ্ম প্রভাব ফেলে। এখানেই ‘Facial Feedback Hypothesis’ -এর আসল শক্তি। আপনি যদি নিজের মনের অবস্থা বদলাতে চান, মুখ থেকেই শুরু করতে পারেন। মন ভাল না থাকলেও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটু হাসুন। হয়ত জোর করেই শুরু করতে হবে, কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই শরীর-মনের সংযোগে পরিবর্তন আসবে। সাম্প্রতিক গবেষণায়ও দেখা গিয়েছে, এই প্রভাব শুধু সাময়িক নয়। ‘Psychological Science’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, নিয়মিত হাসি ধরে রাখলে মস্তিষ্কের ‘amygdala’ অংশে চাপের প্রতিক্রিয়া কমে যায়। ফলে, যাঁরা নিয়মিত হাসেন বা লাফিং থেরাপি নেন, তাঁদের কর্টিসল (Cortisol) লেভেল তুলনামূলক কম থাকে।
তাই বর্তমান মানসিক চাপভরা জীবনে হয়তো ছোট্ট একটুখানি হাসিই হতে পারে বড় ওষুধ। বিশেষত বিষণ্ণতা বা উদ্বেগের সময়, হাসি মুখে মস্তিষ্ককে বলে দেওয়া যায়, ‘সব ঠিক আছে।’ আর মস্তিষ্ক যখন তা বিশ্বাস করে, তখন শরীরও সাড়া দেয়। আসলে, ‘হাসলে মন ভাল হয়’ -এ শুধু প্রবাদ নয়, বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত সত্যও বটে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Yami Gautam motherhood experience | মা হওয়ার পর কাজে ফেরার কঠিন সিদ্ধান্ত, অনুতাপ আর অপরাধবোধের লড়াই : নিজের অভিজ্ঞতায় মাতৃত্বের বাস্তব ছবি তুলে ধরলেন ইয়ামি গৌতম



