মেধা পাল, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : প্রেম কিংবা দাম্পত্য শুরুর দিকে সব সম্পর্কেই (Relationship) থাকে উষ্ণতা, যত্ন আর উচ্ছ্বাস। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই উজ্জ্বলতা ফিকে হয়ে যেতে পারে। দু’জন মানুষ এক ছাদের নিচে থেকেও যদি অনুভব করেন নিঃসঙ্গতা, তাহলে বুঝে নিতে হবে, সম্পর্কে কোথাও যেন সূক্ষ্ম ফাটল ধরেছে। অনেক সময় সম্পর্ক ভাঙে না, কিন্তু বন্ধন আলগা হয়ে যায়। বাহ্যিকভাবে সব ঠিক থাকলেও, ভেতরে তৈরি হয় গভীর দূরত্ব। মনস্তত্ত্ববিদরা বলছেন, সম্পর্কের এই পরিবর্তন নিঃশব্দে ঘটে, কিন্তু তার ইঙ্গিত স্পষ্টভাবেই পাওয়া যায়, যদি চোখে দেখার মতো মন থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যাঁরা স্বভাবে চুপচাপ, তাঁরা ঝগড়া বা বিতর্ক না করে সম্পর্ক থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে সরিয়ে নিতে শুরু করেন। মনোবিদ ড. অনন্যা ঘোষ বলছেন, ‘মানুষ যখন মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে, তখন তার আচরণ বদলে যায়। সে কথা কম বলে, নিজের জীবনের অংশীদারি কমায়, আর একসময় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায় যোগাযোগ।’

প্রথম লক্ষণ হিসেবে ধরা যায়, আগে যে মানুষটি দিনের ছোট ছোট আনন্দ বা সমস্যার গল্প আপনার সঙ্গে ভাগ করতেন, এখন তিনি হয়তো নীরব। আপনি জিজ্ঞেস করলে মুচকি হেসে বলেন, ‘কিছু না’। কিন্তু সেই কিছু না-র মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অনেক কিছু। নিজের কথা না বলার মানে, তিনি হয়তো মনে করছেন আপনি আর তাঁকে বুঝবেন না। এটাই মানসিক দূরত্বের শুরু।
দ্বিতীয়ত, আপনি রাগ করলে বা অভিমান প্রকাশ করলে, তিনি তাতে কোনও প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন না, না রাগ, না ভালবাসা, না উদ্বেগ। সম্পর্ক তখন যান্ত্রিক হয়ে যায়। একসঙ্গে থাকা যেন শুধু একটা অভ্যাস। এই পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, কারণ এতে দু’জনই নিঃশব্দে নিজেদের মধ্যে দেওয়াল তুলে দেন।
তৃতীয় লক্ষণ, সঙ্গীর আগ্রহহীনতা। আগে যিনি নিয়মিত ফোন করতেন, বার্তা পাঠাতেন, এখন তাঁর খোঁজখবর নেওয়াই যেন অচেনা ব্যাপার। হয়ত আপনি ভাবছেন, কাজের চাপ বা ক্লান্তি, কিন্তু মনোবিদরা সতর্ক করছেন, এই উদাসীনতাই হতে পারে মানসিক বিচ্ছেদের সঙ্কেত।
এবার আসি চতুর্থ দিকটায়, দৈনন্দিন ঝগড়া। ভালবাসার সম্পর্কে মতবিরোধ থাকবেই, কিন্তু যখন তা নিয়মিত হয়, এবং কোনও কথাই সমাধানে পৌঁছয় না, তখন সেই সম্পর্ক ক্লান্তির দিকে এগোয়। ‘দু’জনের মধ্যে যদি বারবার অসমাপ্ত আলাপ জমে থাকে, তাহলে সম্পর্ক ভারী হয়ে ওঠে। সেখানেই প্রবেশ করে বিরক্তি,’ জানাচ্ছেন সম্পর্কবিশেষজ্ঞ সৌরভ দে।আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হল, শারীরিক সম্পর্কে অনীহা। দাম্পত্যে যৌনতা কেবল শারীরিক বিষয় নয়, এটি আবেগেরও প্রকাশ। যখন মন দূরে সরে যায়, তখন শরীরও অনাগ্রহী হয়ে ওঠে। যদি সঙ্গী দীর্ঘদিন ধরে আপনাকে এড়িয়ে চলেন বা ঘনিষ্ঠতার মুহূর্ত এলে অজুহাত খোঁজেন, বুঝে নিন সম্পর্কের ভেতরে আবেগের অভাব তৈরি হয়েছে।
এরপর, আসে গোপনীয়তা। আগে আপনার সঙ্গে সব পাসওয়ার্ড শেয়ার করা মানুষটি হঠাৎ এখন ফোন লক রাখছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমিত তথ্য দিচ্ছেন, এটাও এক রকম মানসিক বিচ্ছিন্নতার চিহ্ন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে খোলামেলা যোগাযোগ সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি। স্বচ্ছতা হারিয়ে গেলে, বিশ্বাসও ভেঙে পড়ে। তবে সব সম্পর্কের দূরত্বের মানে বিচ্ছেদ নয়। অনেক সময় এই নীরবতা আসে চাপ, হতাশা বা আত্মবিশ্বাসের অভাব থেকে। তাই প্রথমেই কাউকে দোষারোপ না করে, সৎভাবে কথা বলাটাই জরুরি। বিশেষ করে দীর্ঘ সম্পর্কে, যোগাযোগই পারে হারিয়ে যাওয়া সেতু পুনর্গঠন করতে। মনোবিদ ড. অনন্যা ঘোষ বলেন, ‘নিজের অনুভূতি স্পষ্ট করে বলুন, তবে অভিযোগ নয়, সহানুভূতির সঙ্গে। মানুষ যখন বোঝে, তার অনুভূতি বিচার করা হচ্ছে না, তখনই সে খুলে কথা বলে।’
একটি সম্পর্ক একদিনে দূরে সরে যায় না। কিন্তু চুপচাপ ভাঙতে ভাঙতে একদিন ফাঁকা হয়ে যায়। তাই যদি অনুভব করেন, প্রিয়জনের হাসি আর আগের মতো উষ্ণ নয়, তার চোখে আপনাকে খুঁজে পান না, তাহলে আজই সময়, নীরবতার দেয়াল ভাঙার। কারণ, প্রেমের সবচেয়ে সুন্দর দিক হল, যোগাযোগ। কথা হারিয়ে গেলে, ভালবাসাও নিঃশব্দে হারিয়ে যায়।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : how to know someone loves you, relationship time importance | সময়ই ভালবাসার আসল মাপকাঠি? প্রিয় মানুষের টান বোঝার সহজ সূত্রে বদলাতে পারে সম্পর্কের সমীকরণ



