প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, মুম্বাই : মাতৃত্বের আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় কর্মরত নারীদের। সন্তানের জন্মের পর আবার কর্মক্ষেত্রে ফেরা এই সিদ্ধান্ত যতটা প্রয়োজনের, ততটাই মানসিক টানাপড়েনের। একদিকে অফিসের ডেডলাইন, শুটিং বা মিটিংয়ের চাপ, অন্য দিকে সদ্যোজাত সন্তানকে বাড়িতে রেখে আসার অসহ্য কষ্ট, এই দ্বন্দ্বে প্রতিদিনই পুড়তে হয় অসংখ্য মাকে। এই অভিজ্ঞতা কেবল সাধারণ কর্মজীবী নারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বলিউডের প্রথম সারির অভিনেত্রীদেরও একই লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে মা হওয়ার পর কাজের জগতে ফিরে আসার অভিজ্ঞতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন অভিনেত্রী ইয়ামি গৌতম (Yami Gautam)। তাঁর কথায় উঠে এসেছে অনুতাপ, অপরাধবোধ, ক্লান্তি এবং সেই সঙ্গে পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার কঠিন বাস্তবতা।

সম্প্রতি একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেয়েছে ইয়ামি গৌতম অভিনীত ছবি ‘হক’। এই ছবির শুটিং চলাকালীনই শুরু হয়েছিল তাঁর মাতৃত্ব-পরবর্তী কর্মজীবনের নতুন অধ্যায়।
ইয়ামি জানিয়েছেন, শুরুতে তিনি ভেবেছিলেন ছেলেকে শুটিং লোকেশনে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। অভিনেত্রীর কথায়, ‘আমার স্বামী আদিত্য আমায় বলেছিল, আগে লোকেশনে গিয়ে দেখে আসতে, জায়গাটা আদৌ শিশুর জন্য নিরাপদ কি না।’ স্বামী আদিত্য ধর (Aditya Dhar) -এর পরামর্শ মেনে তিনি একাই বিমানে করে লোকেশনে পৌঁছন। সেখানে গিয়েই জানতে পারেন, শুটিংয়ের জায়গা হোটেল থেকে প্রায় দু’ঘণ্টার দূরত্বে, তাও আবার একেবারে প্রত্যন্ত এলাকায়। ইয়ামির মতে, এতটা দুর্গম জায়গায় ছোট শিশুকে নিয়ে যাওয়া কোনও ভাবেই নিরাপদ বা বাস্তবসম্মত ছিল না। এই উপলব্ধিই তাঁর মনে গভীর অনুতাপের জন্ম দেয়। সন্তানের কাছ থেকে দূরে থাকার যন্ত্রণা যেন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

ইয়ামি জানিয়েছেন, ছেলের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য তিনি পরিচালকের কাছে সপ্তাহে অন্তত একটি দিনের ছুটি চেয়ে নেন। কিন্তু সেই ছুটিও আদতে বিশ্রামের ছিল না। অভিনেত্রী বলেন, ‘সপ্তাহের শুটিং শেষ করেই আমি পরের দিন ভোরবেলার বিমানে চড়তাম। তার জন্য আমাকে ভোর পাঁচটায় উঠতে হত। বাড়ি পৌঁছে সন্তানের সঙ্গে কিছু সময় কাটানোর পর আবার পরের দিনই বিমানে চড়ে সরাসরি শুটিং লোকেশনে চলে যেতাম।’ এই লাগাতার যাতায়াত, ঘুমের অভাব এবং মানসিক চাপ তাঁর জীবনের স্বাভাবিক ছন্দকে ভেঙে দিয়েছিল।

ইয়ামির অভিজ্ঞতা আসলে হাজার হাজার কর্মরত মায়ের প্রতিচ্ছবি। কাজ সামলাতে গিয়ে সন্তানের জীবনের অনেক ছোট কিন্তু মূল্যবান মুহূর্ত : প্রথম হাসি, প্রথম কথা বলা, প্রথম হাঁটার চেষ্টা, এসবের সাক্ষী হতে পারেন না অনেক মা।

সেই জায়গা থেকেই জন্ম নেয় অপরাধবোধ। মনে হয়, ‘আমি কি ঠিক করছি? সন্তানের যত্নে কি আমি কোথাও কমতি রাখছি?’ আবার উল্টো দিকে অন্য এক ভয়ও কাজ করে ‘সন্তানের জন্য কেরিয়ার থেকে পিছিয়ে পড়ছি না তো?’ এই দ্বন্দ্বে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েন অনেকে। মনোবিদদের মতে, এই অপরাধবোধ দীর্ঘদিন জমে থাকলে অবসাদ তৈরি হতে পারে। নিজের জীবনের মান খারাপ হলে তার প্রভাব পড়ে সন্তানের উপরও। ইয়ামিও বুঝেছেন, এই পাপবোধে ডুবে থাকলে সমস্যার সমাধান হয় না। পাশাপাশি পরিস্থিতিকে বাস্তবসম্মত ভাবে গ্রহণ করাই একমাত্র পথ। অভিনেত্রী মনে করেন, মাতৃত্ব আর কেরিয়ার দু’টোকেই একসঙ্গে সামলাতে গেলে নিখুঁত হওয়া সম্ভব নয়। কোথাও না কোথাও ফাঁক থেকে যাবেই, আর সেটাকে মেনে নেওয়াটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

ইয়ামির অভিজ্ঞতা থেকে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উঠে আসে, সাহায্য চাইতে কুণ্ঠা করা যাবে না। অফিস, বাড়ি, সম্পর্ক এবং মাতৃত্ব এতগুলো দায়িত্ব একা কাঁধে তুলে নিলে যে কোনও মানুষই ক্লান্ত হয়ে পড়বে। তাই দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। প্রয়োজনে মা-বাবা দু’জনেই সন্তানের দায়িত্ব ভাগ করে নিতে পারেন। ঠাকুরমা, দিদিমা বা পরিবারের অন্য সদস্যদের সাহায্য নেওয়াতেও কোনও লজ্জা নেই। ইয়ামির মতে, সহমর্মী মানুষদের পাশে পেলে এই কঠিন সময় অনেকটাই সহজ হয়ে ওঠে। তবে সাহায্য নেওয়ার অর্থ এই নয় যে মা হিসেবে নিজের ভূমিকা থেকে সরে যাওয়া। সন্তানের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকাটাই সবচেয়ে জরুরি। সময় কম হলেও সেই সময়ের গুণগত মান যেন বজায় থাকে, এই ভাবনাটাই ইয়ামির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, মাতৃত্ব কোনও দুর্বলতা নয়, তা একজন নারীকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। কাজের জায়গায় ফিরে গিয়ে যে অপরাধবোধ বা অনুতাপ তৈরি হয়, তা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই অনুভূতিকে অতিক্রম করে নিজের মতো করে ভারসাম্য খুঁজে নেওয়াই আসল সাফল্য। মা হওয়ার পর কর্মক্ষেত্রে ফেরা নিয়ে ইয়ামি গৌতমের এই খোলামেলা স্বীকারোক্তি অনেক কর্মরত মায়ের কাছেই আশ্বাসের মতো। বলিউডের ঝলমলে পর্দার আড়ালেও যে একই বাস্তব লড়াই চলে, সেটাই যেন তাঁর কথায় আরও একবার স্পষ্ট হয়ে উঠল।
সব ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Yami Gautam Haq performance | ‘হক’ -এর সাফল্যের মাঝেই অতীতের ক্ষতচিহ্ন সামনে আনলেন ইয়ামি গৌতম, ইন্ডাস্ট্রিতে অবাঞ্ছিত হওয়ার যন্ত্রণার স্মৃতি ফের চর্চায়




