সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর প্রথম রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বেরিয়েই তীব্র আক্রমণের মুখে পড়লেন তৃণমূল কংগ্রেস -এর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে (Sonarpur) নিহত দলীয় কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে পথে বিক্ষোভ, ডিম-জুতো ছোড়া, এমনকী শারীরিক হেনস্থার অভিযোগ ঘিরে তুমুল উত্তেজনা ছড়িয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতর।
উল্লেখ্য, শনিবারের কর্মসূচীর আগে থেকেই উত্তেজনার আবহ তৈরি হয়েছিল। ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে নিহত তৃণমূল কর্মীদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে বেলেঘাটা (Beleghata) ও সোনারপুরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন অভিষেক। সেই মতো প্রথমে তিনি বেলেঘাটায় গিয়ে নিহত কর্মী বিশ্বজিৎ পট্টনায়েক (Bishwajit Pattnaik) -এর পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে কিছুক্ষণ কাটানোর পরই তাঁর সোনারপুর যাওয়ার কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। এরই মধ্যে তাঁর হরিশ মুখার্জি রোড (Harish Mukherjee Road) -এর বাসভবনে পৌঁছে যায় রাজ্য সিআইডি (CID) -এর একটি দল। সূত্রের খবর, একটি নথি সংক্রান্ত বিতর্কে তদন্তের জন্যই এই অভিযান চালানো হয়। তবে সেই সময় অভিষেক বাড়িতে না থাকায় তাঁরা ফিরে যান। পরে এই ঘটনার প্রসঙ্গে অভিষেক বলেন, ‘আমি বহুদিন ধরে ওই বাড়িতে থাকি না, তা সত্ত্বেও সেখানে অভিযান চালানো হচ্ছে।’
সোনারপুরের পথে যাত্রা শুরু করার পর থেকেই বিক্ষোভের মুখে পড়েন তৃণমূল নেতা। পথে পথে কালো পতাকা হাতে বিক্ষোভকারীদের দেখা যায়। তাঁদের মুখে ‘গো ব্যাক’ থেকে ‘চোর’ স্লোগান ওঠে। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন অভিষেকের কনভয়ের দিকে ডিম, জুতো ও ইট ছোড়া শুরু হয়। সোনারপুরে ঢোকার মুখে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। যে রাস্তায় তাঁকে যেতে হচ্ছিল, সেখানে বড় গাড়ি ঢুকতে না পারায় তিনি বাইকে চেপে এগোন। তখনই শুরু হয় আরও তীব্র বিক্ষোভ। প্রত্যক্ষদর্শীদের কথায়, ‘হঠাৎ করেই চারদিক থেকে ডিম ও ইট ছোড়া শুরু হয়।’ নিজেকে বাঁচাতে মাথায় হেলমেট পরেন অভিষেক, কিন্তু তাতেও আক্রমণ থামেনি। সূত্রের খবর, এক পর্যায়ে তাঁকে ঘিরে ধরে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়। চড়, ঘুষি, ধাক্কাধাক্কির মধ্যে দিয়ে এগোতে হয় তাঁকে। তাঁর সাদা পোশাক ডিমে ভিজে যায়, চশমা ভেঙে যায়। তবুও তিনি কর্মসূচী বাতিল না করে নিহত তৃণমূল কর্মী সঞ্জু কর্মকার (Sanju Karmakar) -এর বাড়িতে পৌঁছন।
সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা কাটানোর পর তিনি বাইরে বেরিয়ে আসেন পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তায়। এরপর তাঁকে দ্রুত একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের ভিতরে তাঁকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে নিয়ে যেতে দেখা যায় বলে উল্লেখ। পরে মিন্টো পার্ক -এর আরেকটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এই ঘটনার পর তৃণমূল নেত্রী তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, ‘ওকে স্যালাইন চলা অবস্থাতেই বাড়ি নিয়ে আসতে হয়েছে। সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।’ তাঁর অভিযোগ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ভয় দেখানো হয়েছে, যার ফলে চিকিৎসা প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে।
অন্যদিকে অভিষেক নিজেও তীব্র ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, ‘আমাকে খুন করার চেষ্টা হয়েছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘বহিরাগত লোক এনে পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে।’ তাঁর অভিযোগের তির বিজেপির (BJP) দিকে। তবে, বিজেপির তরফে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) বলেন, ‘এটি সাধারণ মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, এতে দলের কোনও ভূমিকা নেই।’ একই সঙ্গে তিনি হিংসা পরিহারের আহ্বান জানিয়েছেন।
ঘটনাটি নিয়ে অন্যান্য রাজনৈতিক দলও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। কংগ্রেস (Congress) -এর সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে (Mallikarjun Kharge) এই হামলার নিন্দা করে বলেন, ‘একজন জনপ্রতিনিধির উপর এই ধরনের আক্রমণ গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক।’ সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব (Akhilesh Yadav) পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সিপিএম (CPM) -এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম (Mohammed Salim) বলেন, ‘এই ধরনের ঘটনা কোনও ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ যদিও তিনি রাজনৈতিক আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
পুরো ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রশাসনের ভূমিকা, রাজনৈতিক সংঘর্ষ, নিরাপত্তা এসব কিছু নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। অভিষেক জানিয়েছেন, তিনি এই ঘটনার বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হবেন। উল্লেখ্য, ঘটনার পর সোনারপুর এবং সংলগ্ন এলাকায় পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক উত্তাপ এখনও কমেনি। এই ঘটনা আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee election allegation | ‘২০ দিন মুখ বুজে সহ্য করেছি’ : ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে বিস্ফোরক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, নিশানায় শুভেন্দু অধিকারী



