সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: ভারতীয় নারী ক্রিকেটের অন্যতম উজ্জ্বল মুখ স্মৃতি মান্ধানা (Smriti Mandhana) আবারও শিরোনামে। তবে এবার কোনও রেকর্ড বা ম্যাচজয় নয়, বরং তাঁর নিজের খেলা ও মানসিকতা নিয়ে অকপট মন্তব্য ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘আমি ব্যাটার হিসেবে বেশ অহং রাখি।’ তাঁর এই স্বীকারোক্তি যেমন চমক জাগিয়েছে, তেমনই তুলে ধরেছে একজন শীর্ষ ক্রীড়াবিদের অন্তর্লোক, যেখানে সাফল্যের পাশাপাশি থাকে আত্মবিশ্বাস, লড়াই আর নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার অদম্য তাগিদ। মহারাষ্ট্রের সাংলি (Sangli) শহরের মাটিতে দাঁড়িয়ে তৈরি হওয়া এই ক্রিকেটার আজ বিশ্বমঞ্চে পরিচিত নাম। মাঠে তাঁর ব্যাট যতটা ধারালো, মাঠের বাইরে ততটাই স্বাভাবিক জীবনযাপন তাঁকে আলাদা করে দেয়। সাংলির আখের খেত, শান্ত বিকেল আর পরিচিত মানুষের মাঝে তিনি যেন অন্য এক মানুষ, সেখানে তিনি আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার নন, বরং একেবারে সাধারণ ‘স্মৃতি’।

আরও পড়ুন : মোবাইল রিচার্জের দাম ঊর্ধ্বমুখী: ভারতে বাড়ছে ডিজিটাল খরচের চাপ, বিপাকে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার
সাম্প্রতিক এক শুটিংয়ের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, স্থানীয় এক স্কুলছাত্রী তাঁর সামনে এসে আবেগে পা ছুঁয়ে প্রণাম করে। মুহূর্তটি শুধু ভক্তি নয়, প্রজন্মের স্বপ্নকেও প্রতিফলিত করে। স্মৃতি নিজে সেই আবেগকে সম্মান জানিয়ে মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেন। এই দৃশ্য যেন বুঝিয়ে দেয়, তাঁর সাফল্য কেবল পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং অনেকের কাছে তিনি এক বড় প্রেরণা হয়ে উঠেছেন। গত কয়েক বছরে স্মৃতি মন্ধানার কেরিয়ার নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ভারতের হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের সাফল্য, উইমেন্স প্রিমিয়ার লিগে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুকে (Royal Challengers Bengaluru) শিরোপা এনে দেওয়া, আইসিসি (ICC) র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষস্থানে ফেরা ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাঁকে বিশ্বসেরা ব্যাটারদের মধ্যে স্থায়ী জায়গা করে দিয়েছে। পাশাপাশি বিসিসিআই -র (BCCI) সেরা আন্তর্জাতিক নারী ক্রিকেটারের সম্মান একাধিকবার জেতা তাঁর সাফল্যের ধারাকে আরও দৃঢ় করেছে।

কিন্তু এত কিছুর মাঝেও তাঁর জীবনযাত্রার কেন্দ্রবিন্দু রয়ে গেছে সাংলি। তিনি নিজেই বলেন, ‘আমি সাংলির মতোই, শান্ত আর নির্লিপ্ত।’ ছোট শহরের সহজ-সরল জীবনযাপন তাঁর ব্যক্তিত্বে গভীর প্রভাব ফেলেছে। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, প্রিয় খাবারের দোকানে যাওয়া, এই সবকিছুই তাঁকে মাটির কাছাকাছি রাখে। তাঁর বেড়ে ওঠার গল্পও কম আকর্ষণীয় নয়। ছোটবেলায় একাধিক ভাড়া বাড়িতে থাকতে হয়েছে তাঁদের পরিবারকে। সেই সময়েই ঘরের ভিতরে ঝুলন্ত বল দিয়ে অনুশীলন করতে গিয়ে দেয়ালে দাগ পড়ে যেত, যা নিয়ে মা বিরক্ত হতেন। সেই স্মৃতি মনে করে স্মৃতি বলেন, ‘মাকে বলতাম, কেঁদো না, আমি একদিন নিজের বাড়ি কিনে দেব।’ পরে তিনি সত্যিই নিজের উপার্জনে পরিবারের জন্য বাড়ি কিনে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করেন।
ক্রিকেটে তাঁর পথচলা সহজ ছিল না। শতাধিক ছেলের মধ্যে একমাত্র মেয়ে হিসেবে অনুশীলনের সুযোগ পাওয়াও ছিল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু তাঁর কোচেরা তাঁকে সবসময় সমর্থন করেছেন। নতুন বলে অনুশীলনের সুযোগ দেওয়া থেকে শুরু করে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সবই তাঁকে তৈরি করেছে আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার হিসেবে। তাঁর ভাই শ্রাবণ মন্ধানার (Shravan Mandhana) কথায়, ‘ওর মধ্যে শুরু থেকেই আলাদা এক ক্ষুধা ছিল।’ সেই ক্ষুধাই তাঁকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। স্মৃতি নিজেও স্বীকার করেন, ‘আমি খুব সহজ স্বভাবের মানুষ, কিন্তু ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে একটু পাগল।’ তাঁর কথায়, ‘আমি বাইরে শান্ত থাকি, কিন্তু ভিতরে খুব আগ্রাসী। আমি ব্যাটার হিসেবে অহং রাখি। নেটে কেউ আমাকে হারিয়ে দিলে সেটা আমার ভাল লাগে না।’
এই মানসিকতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। ক্রিকেট তাঁর কাছে শুধু খেলা নয়, বরং এক ধরনের নির্ভরতা। তিনি বলেন, ‘ক্রিকেট নয়, ব্যাটিং এটাই আমার সবকিছুর সমাধান, যেন ওষুধ।’ তাঁর কাছে ব্যাট হাতে নেওয়া মানেই নিজের সঙ্গে লড়াই, নিজের সীমা অতিক্রম করার চেষ্টা। আন্তর্জাতিক স্তরে খেলার চাপও কম নয়। বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে ব্যর্থতা মানসিকভাবে নাড়া দেয়। এক ম্যাচে হারের পর তিনি নিজেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘আমি কোথায় ভুল করছি?’ সেই সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় কটাক্ষও শুনতে হয়েছে। কিন্তু তিনি চাপকে গ্রহণ করতে শিখেছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘আমরা তো চেয়েছিলাম মানুষ আমাদের খেলা দেখুক, সমর্থন করুক। তাহলে সমালোচনাও মেনে নিতে হবে।’

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রস্তুতির ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। আগে শুধু ব্যাটিং অনুশীলনেই জোর থাকলেও এখন ফিটনেস, ডায়েট এবং রিকভারি সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। ব্যক্তিগত শেফ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে সফরে যান, যাতে খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রিত থাকে। মাঠে নামার আগে মানসিক প্রস্তুতির জন্যও তিনি বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করেন। মহাভারতের কিছু অংশ শোনা এবং একটি ছোট গীতা সঙ্গে রাখা, এই অভ্যাস তাঁকে স্থির থাকতে সাহায্য করে। তাঁর কথায়, ‘আমি আমার অনেক প্রশ্নের উত্তর এখানেই খুঁজে পাই।’
সাফল্যের সঙ্গে এসেছে জনপ্রিয়তা এবং নজরদারি। বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ড, এমনকি তাঁর আদলে তৈরি পুতুল, এসব মিলিয়ে তিনি এখন আন্তর্জাতিক আইকন। তবে এই পরিচিতির সঙ্গে আসে সমালোচনাও। তাঁর শরীরচর্চার ফলে গড়ে ওঠা পেশী নিয়েও সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা মন্তব্য হয়েছে। কিন্তু তিনি তা হালকাভাবেই নেন। মুচকি হেসে বলেন, ‘এই বাইসেপসই ভারতের হয়ে ম্যাচ জেতায়, আমার কাছে তো বেশ ভালই লাগে।’ বর্তমানে তাঁর সাংলির বাড়িও আলোচনায়। সেখানে অনুশীলনের জন্য আলাদা উইকেট, জিম, সুইমিং পুল, সবই রয়েছে। একটি বিদেশি ক্রীড়াবিদের বাড়ি দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এখানে তাঁর প্রশিক্ষণ ও বিশ্রাম, দুটোই সমান গুরুত্ব পায়।
তাঁর লক্ষ্য শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নারী ক্রিকেটকে আরও শক্তিশালী করে তোলাই তাঁর অন্যতম উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, ‘আমরা ছোটবেলায় নিজেদের খেলার উদাহরণ পাইনি। আমি চাই আগামী প্রজন্ম যেন আমাদেরকেই উদাহরণ হিসেবে দেখে।’ আজকের দিনে দাঁড়িয়ে স্মৃতি মন্ধানা কেবল একজন ক্রিকেটার নন, বরং এক নতুন যুগের প্রতীক। তাঁর সাফল্য, মানসিকতা এবং স্বপ্ন, এসব মিলিয়ে তিনি তৈরি করছেন এমন এক পথ, যা অনুসরণ করবে আগামী দিনের ক্রীড়াবিদরা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Smriti Mandhana relationship news, Palash Muchhal viral video | ভাইরাল ভিডিয়ো ঘিরে নতুন জল্পনা: আবার কি কাছাকাছি স্মৃতি মন্ধানা ও পলাশ মুচ্ছল? বিয়ের সম্ভাবনা নিয়ে জোর চর্চা



