অভিরাজ চক্রবর্তী ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, গুয়াহাটি : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর যুগে হিউম্যান ক্যাপিটালকে কীভাবে আরও দক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বাস্তবমুখী করে তোলা যায়, সেই লক্ষ্যেই গুয়াহাটিতে সম্পন্ন হল হিউম্যান কর্মগোষ্ঠীর দ্বিতীয় দিনের বৈঠক। ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক (Ministry of Electronics and Information Technology), ইন্ডিয়া এআই মিশন (IndiaAI Mission), অসম সরকার (Government of Assam) এবং আইআইটি গুয়াহাটির (IIT Guwahati) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মূলত আঞ্চলিক ভাষাভিত্তিক এআই অবকাঠামো, এআই শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্কল্পনা এবং ভাষিনী প্ল্যাটফর্মের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে গভীর আলোচনা হয়।
বৈঠকের কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্য ছিল হিউম্যান ক্যালিটাল সংক্রান্ত ভাবনাকে নীতিগত আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে একটি মাপযোগ্য ও কার্যকর কাঠামোয় রূপ দেওয়া। দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় ভাষা-অভিগম্যতা, জাতীয় ভাষা অনুবাদ মিশন বা এনএলটিএম (National Language Translation Mission – NLTM) এবং এআই-সক্ষম শিক্ষা ব্যবস্থার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।দিনের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ‘জাতীয় ভাষা অনুবাদ মিশনের কাঠামো’ বিষয়ক আলোচনার মাধ্যমে। এই অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন এআই৪ভারত (AI4Bharat) -এর প্রধান এবং আইআইটি মাদ্রাজ (IIT Madras) -এর অধ্যাপক মিতেশ খাপরে (Mitesh Khapre)। তিনি গত চার বছরে এই মিশনের অগ্রগতির কথা তুলে ধরে জানান, ভারতের বিপুল ভাষাগত বৈচিত্র্যের জন্য নিজস্ব এআই ও ভাষা প্রযুক্তি গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। তাঁর কথায়, ‘সংবিধান স্বীকৃত ২২টি ভারতীয় ভাষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রায় ৯৯ শতাংশ জনগোষ্ঠীর কাছে প্রযুক্তির সুফল পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাপী ইংরেজি-কেন্দ্রিক এআই ব্যবস্থার আধিপত্য থাকলেও, ভারতীয় ভাষাগুলি যাতে বৈশ্বিক এআই পরিকাঠামোয় পিছিয়ে না পড়ে, সেটাই এই মিশনের অন্যতম লক্ষ্য।
পরবর্তী অধিবেশনে উত্তর-পূর্ব ভারতের ভাষাগত বাস্তবতা এবং প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন আইআইটি গুয়াহাটির (IIT Guwahati) ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ এবং সেন্টার ফর লিঙ্গুইস্টিক্স অ্যান্ড টেকনোলজির (Centre for Linguistics and Technology) অধ্যাপক রোহিত সিনহা (Rohit Sinha)। তিনি বলেন, ‘ভারতের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ মানুষ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বসবাস করলেও এখানে প্রায় ২০০টি ভাষা প্রচলিত।’ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আঞ্চলিক স্তরে তথ্য সংগ্রহ, মাতৃভাষীদের মাধ্যমে ভাষার নথিভুক্তিকরণ এবং মেশিন অনুবাদ, অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন, স্বয়ংক্রিয় বাক্সনাক্তকরণ ও টেক্সট-টু-স্পিচ প্রযুক্তি উন্নয়নে কেন্দ্রীয় উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, অসমিয়া ও মিজো-র মতো কম সম্পদযুক্ত এবং অসূচিবদ্ধ ভাষার উপর কাজ করে শিক্ষা, প্রশাসন ও ডিজিটাল পরিষেবায় প্রবেশাধিকার সহজ করা সম্ভব হচ্ছে। ভাষা প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের ডিজিটাল ইন্ডিয়া ভাষিনী বিভাগের উত্তর-পূর্ব ভারতের এনগেজমেন্ট ম্যানেজার জ্যোতিস্মিতা দেবী (Jyotismita Devi)। তিনি ভাষিনী (Bhashini) উদ্যোগের লক্ষ্য ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘ভাষিনীর ধ্বনি-ভিত্তিক পদ্ধতি এমন মানুষদেরও ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করছে, যাঁদের সাক্ষরতা বা ইন্টারনেট ব্যবহারের দক্ষতা সীমিত।’ তাঁর মতে, ভাষা মানুষের পরিচয়ের একটি মৌলিক অংশ এবং ভয়েস-ভিত্তিক এআই সরকারি পরিষেবা, শিক্ষা এবং জনপরিসরে প্রবেশাধিকারকে আরও সহজ ও মানবিক করে তুলতে পারে। রিয়েল-টাইম অনুবাদ, কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে ফর্ম পূরণ এবং ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপে সহজ ব্যবহার, এই সব ক্ষেত্রেই ভাষিনী ইতিমধ্যেই কার্যকর ভূমিকা পালন করছে বলে তিনি জানান।
এদিন অধিবেশনে আলোচনার বিষয় ছিল ‘এআই শিক্ষায় রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতি’। এই অধিবেশন পরিচালনা করেন আইআইটি গুয়াহাটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক অমিত আভেকর (Amit Awarekar)। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘এআই শুধু ব্যবহার শেখার বিষয় নয়, বরং এর ভিতরের গঠন ও নৈতিক প্রয়োগ বোঝাটাই আসল।’ তাঁর মতে, শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই সমস্যা সমাধান, কৌতূহল এবং সিস্টেম-স্তরের চিন্তাভাবনা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। নথিভুক্তিকরণ, ডিবাগিং এবং নৈতিক পরিনিয়োগের মতো বিষয়গুলিতে জোর দিয়ে ভবিষ্যতের এআই দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
সমাপনী বক্তব্যে আইআইটি গুয়াহাটির কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর লিঙ্গুইস্টিক্স অ্যান্ড টেকনোলজির প্রধান ড. সনসম রণবীর সিং (Dr. Sansam Ranbir Singh) বৈঠকের সাফল্যের জন্য কেন্দ্র ও অসম সরকারের আধিকারিক, শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষার্থীদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘এই ধরনের আলোচনা ভারতের এআই ভবিষ্যতের জন্য মানব পুঁজিকে আরও শক্তিশালী করার পথে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত এই মানব পুঁজি কর্মগোষ্ঠীর বৈঠক একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সাফল্য। এটি আগামী ১৫ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬-এ নতুন দিল্লিতে (New Delhi) অনুষ্ঠিতব্য ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬ (India AI Impact Summit 2026) -এর একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। এই বৈঠক থেকে উঠে আসা সুপারিশ ও অভিজ্ঞতা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে এআই সংক্রান্ত আলোচনাকে নতুন দিশা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, এআই যুগের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক, বাস্তবসম্মত এবং ভবিষ্যৎ-উপযোগী মানব পুঁজি গঠনের পথে ভারতের অঙ্গীকার আরও দৃঢ় হল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mukhyamantri Mahila Udyamita Abhiyan, Himanta Biswa Sarma | বজালীতে নারীর ক্ষমতায়নের নতুন অধ্যায়, ২৮ হাজারের বেশি উপভোক্তাকে চেক প্রদান শুরু করলেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা




