সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বহুদিনের জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে কলকাতার মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দিলেন ফিরহাদ হাকিম (Firhad Hakim)। শুক্রবার কলকাতা পুরসভা ভবনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান। দীর্ঘ সাড়ে সাত বছরের দায়িত্ব সামলে মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক মাস আগেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মহলে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। কলকাতা পুরসভার চেয়ারম্যান মালা রায় (Mala Roy) -এর কাছে আনুষ্ঠানিক ভাবে ফিরহাদ হাকিম পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বলে উল্লেখ।
২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর কলকাতার মেয়র পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন ফিরহাদ হাকিম (Firhad Hakim)। তার পর থেকে টানা প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলেছেন। তবে হঠাৎ কেন এই সিদ্ধান্ত? সাংবাদিক বৈঠকে তিনি বলেন, ‘দাপটের সঙ্গে কাজ করেছি। মানুষের সমস্যা সমাধান করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। এখন সেই ভাবে কাজ করতে পারছি না। চেয়ারের সম্মান রাখতে না পারলে সেখানে বসে থাকা ঠিক নয়।’ তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত। তিনি আরও বলেন, ‘চেয়ার ধরে বসে থাকলাম অথচ কিছুই করতে পারছি না, তা আমি চাই না। তাই সসম্মানে সরে দাঁড়াচ্ছি।’ এই মন্তব্য রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে নানা ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসনিক কাঠামোর ভিতরে কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছিল, যার জেরেই এই সিদ্ধান্ত।
ফিরহাদ হাকিম (Firhad Hakim) তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রায় তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) -এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাকে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য নেত্রীকে ধন্যবাদ জানাই।’ পদত্যাগের আগে দলের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, ‘আমি অনুমতি চেয়েছিলাম। সসম্মানে সরে যেতে চেয়েছি। উনি বলেছেন ঠিক আছে।’ রাজ্যের নতুন প্রশাসনিক নেতৃত্বের উদ্দেশ্যে তাঁর বার্তা, ‘পুরসভা স্বচ্ছ ভাবে চালাতে হবে। মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করাই প্রধান কাজ হওয়া উচিত।’ এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, ভবিষ্যতের প্রশাসনিক দিকনির্দেশনা নিয়ে তাঁর স্পষ্ট মত রয়েছে।
ফিরহাদ হাকিম (Firhad Hakim) -এর রাজনৈতিক যাত্রা দীর্ঘদিনের। কলকাতা পুরসভার ৮২ নম্বর ওয়ার্ড থেকে একাধিকবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০০, ২০০৫ এবং ২০১০ সালে টানা তিনবার জয়ী হন। ২০১৫ সালে তিনি পুরভোটে অংশ নেননি। সেই সময় ওই ওয়ার্ড থেকে প্রণব বিশ্বাস (Pranab Biswas) নির্বাচিত হন। পরে ২০১৮ সালে শোভন চট্টোপাধ্যায় (Sovan Chatterjee) -এর পর মেয়র পদে দায়িত্ব নেওয়ার পর উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে ফের পুরসভায় ফিরে আসেন ফিরহাদ। ২০২১ সালে আবারও একই ওয়ার্ড থেকে জয়ী হন। তাঁর পদত্যাগের সঙ্গে সঙ্গেই কলকাতা পুরসভার প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, এই পদত্যাগের ফলে পুরসভার ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। ছোট লালবাড়ি নামে পরিচিত পুরসভা ভবনে দীর্ঘদিনের শাসন কাঠামোতেও নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
গত কয়েক দিন ধরেই তাঁর পদত্যাগ নিয়ে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh) দাবি করেছিলেন, ফিরহাদ আগেই নেত্রীকে পদ ছাড়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। যদিও সেই সময় ফিরহাদ নিজে জানিয়েছিলেন, ‘এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নিইনি।’ ফলে পরিস্থিতি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল। অবশেষে শুক্রবার সেই অনিশ্চয়তার অবসান হল। রাজনৈতিক মহলেও এই পদত্যাগ নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া সামনে আসছে। কেউ এটিকে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন, এর পিছনে বৃহত্তর প্রশাসনিক কারণ থাকতে পারে। যদিও ফিরহাদ হাকিম (Firhad Hakim) নিজে তাঁর বক্তব্যে বিষয়টিকে ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
কলকাতার নাগরিক পরিষেবার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ সময় মেয়র থাকার ফলে শহরের উন্নয়ন, পরিকাঠামো এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাঁর ছাপ রয়েছে। তাঁর আমলে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে বলে দাবি তৃণমূলের একাংশের। কিন্তু তাঁর বিদায়ের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কে হবেন পরবর্তী মেয়র? কলকাতা পুরসভার প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা কীভাবে বজায় থাকবে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও অজানা। কিন্তু, ফিরহাদ হাকিম (Firhad Hakim) -এর পদত্যাগ কলকাতার রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তাঁর সিদ্ধান্ত শহরের প্রশাসনিক কাঠামোয় কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal opposition leader Ritabrata Banerjee | বিধানসভায় পালাবদল: বিদ্রোহীদের সমর্থনে বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত



