সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন মোড়। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর অবশেষে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার আসনে বসলেন তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (Ritabrata Banerjee)। স্পিকার রথীন্দ্র বসু (Rathindra Bose) তাঁর স্বীকৃতি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার জন্য নির্দিষ্ট ঘর খুলে দেওয়া হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে চাবি তুলে দেওয়া হয় ঋতব্রতের হাতে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, তৃণমূল কংগ্রেসের (All India Trinamool Congress) টিকিটে জয়ী বিধায়কদের বড় অংশ তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘এই মুহূর্তে ৫৮ জন আমাদের সঙ্গে রয়েছেন। আরও দু’জন বিধায়ক বাইরে আছেন, তাঁদের সমর্থনও রয়েছে। সব মিলিয়ে সংখ্যা ৬০-এ পৌঁছবে।’ তাঁর এই দাবি ঘিরে রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন তৈরি হয়েছে, কারণ বিধানসভায় সংখ্যার নিরিখে এই সমর্থন বিরোধী শিবিরের ভিত মজবুত করতে পারে।
নতুন বিরোধী দলনেতা জানান, বিধানসভায় তাঁরা শক্তিশালী বিরোধীর ভূমিকা নিতে প্রস্তুত। তাঁর বক্তব্য, ‘সরকারের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়াই করব, আবার কোনও ইতিবাচক উদ্যোগ নিলে তা স্বীকারও করব।’ একই সঙ্গে তিনি জানান, এই লড়াই ব্যক্তি নির্ভর নয়, বরং সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এগোবে। ‘আমি “বস” নই, আমরা মিলে সিদ্ধান্ত নেব’ এই বার্তা দেন তিনি। ঋতব্রত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইঙ্গিত দেন। তিনি তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Mamata Banerjee) তাঁদের পরিষদীয় দলের পরামর্শদাতা হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘দলনেত্রী হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা আমাদের কাজে লাগবে।’ যদিও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) -এর সঙ্গে তাঁদের দূরত্বের কথাও উল্লেখ করেন ঋতব্রত, যা দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণের দিকে ইঙ্গিত করে।
এই নতুন পরিষদীয় দলে একাধিক পদে দায়িত্ব বণ্টনও করা হয়েছে। মুখ্যসচেতক হিসেবে আখরুজ্জামান (Akhruzzaman) -এর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি ডেপুটি লিডার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন জাভেদ আহমেদ খান (Javed Ahmed Khan), সাবিনা ইয়াসমিন (Sabina Yasmin), শিউলি সাহা (Shiuli Saha) এবং সন্দীপন সাহা (Sandipan Saha)। তাঁদের সমর্থনের চিঠি ইতিমধ্যেই স্পিকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঋতব্রত। ঘটনার প্রেক্ষাপটে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক ‘সই-কাণ্ড’ -এর প্রসঙ্গও। শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে (Sovandeb Chattopadhyay) বিরোধী দলনেতা করার প্রস্তাব ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার জেরেই এই বিভাজন তীব্র হয়। অভিযোগ ওঠে, একটি প্রস্তাবপত্রে একাধিক বিধায়কের সই নকল করা হয়েছে। এই অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়।
ঋতব্রত এবং সন্দীপন সাহাই প্রথম এই অনিয়মের বিষয়টি সামনে আনেন বলে জানা যায়। পরে বিষয়টি নিয়ে হেয়ার স্ট্রিট থানায় এফআইআর দায়ের হয় এবং তদন্ত শুরু করে সিআইডি (CID)। ইতিমধ্যেই একাধিক বিধায়কের সঙ্গে কথা বলেছে তদন্তকারী দল। এই ঘটনার পরই রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে এবং তৃণমূলের ভিতরে ভাঙন আরও প্রকট হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পিকারের কাছে চিঠি দিয়ে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আবেদন জানান। তিনি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক নজির তুলে ধরে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তবে শেষ পর্যন্ত স্পিকার ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কেই স্বীকৃতি দেওয়ায় নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নবান্নে একটি প্রশাসনিক বৈঠক ডাকেন, যেখানে বিরোধী বিধায়কদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়। ঋতব্রত সেই বৈঠকে উপস্থিত থাকার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘বিরোধীদের ডেকে আলোচনা করা ইতিবাচক পদক্ষেপ।’ তিনি জানান, কলকাতা, হাওড়া এবং উত্তর ২৪ পরগনার একাধিক বিরোধী বিধায়ক সেই বৈঠকে অংশ নেন।
বুধবার যখন বিধানসভায় ঋতব্রত তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করছিলেন, সেই সময় কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠকে বসেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh) এবং চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য (Chandrima Bhattacharya)। এই সমান্তরাল বৈঠক রাজনৈতিক জল্পনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এই পরিবর্তন রাজ্যের বিরোধী রাজনীতিতে নতুন দিশা দিতে পারে। সংখ্যার লড়াই, নেতৃত্বের প্রশ্ন এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা এখন নতুন সমীকরণের দিকে এগোচ্ছে। আগামী দিনে এই পরিবর্তন কী প্রভাব ফেলবে, তা নজরে রাখছেন রাজনৈতিক মহল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee Suvendu Adhikari, Dharmatala protest | ধর্মতলার ধর্না নিয়ে বিতর্ক, মমতাকে কটাক্ষ শুভেন্দুর ‘দলটা ফলতার মতো’




